বলি — উমা ভট্টাচার্য্য

sahityalok.com

বিথির মনে আজ খুব আনন্দ, কাল সে মামা বাড়ি যাবে । মামা বাড়ি যাওয়ার নামে সবারই আনন্দ হয় ,তবে বিথির একটু বেশি আনন্দ হচ্ছে এই কারণে, বিথী জন্মের পরে এই প্রথমবার মামা বাড়ি যাচ্ছে।। বীথির মামাবাড়ি রানাঘাটে,মায়ের মুখে সে অনেক গল্প শুনেছে সেখানকার। মন ব্যাকুল হয়ে থাকতো মামা বাড়ি যাবার জন্য।তাই এবার যখন ওর বাবা বলল আমরা এক মাসের ছুটিতে তোর মামা বাড়ি যাব ,কালী পূজা দেখব। তাই শুনে বিথির আনন্দ আর দেখে কে।। বিশেষ করে এই কালীপুজোর কথা সে অনেকবার আছে শুনছে, এবার সামনাসামনি দেখবে।।
 
 
যাই হোক শেষ পর্যায়ে গোছগাছ চলছে, কাল ইভিনিং এ ফ্লাইট ওদের। সবার সাথেই নিয়মিত কথা হয় বিথির।ওর ছোট মামার মেয়ে রানু আর ওতো একই বয়সী, কত গল্প হয় ওদের। এবার সামনে থেকে দেখবে রানুকে,, খুব সুন্দর দেখতে রানু। রানুর জন্য অনেক অনেক গিফট কিনেছে নিজে, যদিও সবার জন্যই কিছু না কিছু গিফট কেনা হয়েছে।
 
 
পরদিন ওরা বেরিয়ে পরলো। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিথী রা পৌঁছে গেল রানাঘাট। ওদের দেখতে পেয়ে সবাই কি খুশি। ফ্রেশ হয়ে নিয়ে রাতে এক টেবিলে বসে খাবার সময় সবাই কত গল্প করল। বিথী অবাক দৃষ্টিতে সবাইকে দেখছিল আর মনে মনে ভাবতে লাগলো কত আনন্দ এখানে, কি বিশাল বাড়ি কত লোকজন আর আমি তো ওখানে কেমন একা থাকি। খাওয়া শেষে রানু বিথী কে নিজের ঘরে নিয়ে গেল। রানুর ঘরের দিকে যেতে গিয়ে বিথির নজর পড়লো উঠনে বাধা দুটি ছাগলছানার উপর। সামনে কাঁঠাল পাতা দেওয়া।
 
বিথী ছুটে গেল বাচ্চা দুটির কাছে।,বইয়ে ছবি দেখেছে, সামনে এই প্রথম দেখল। বিথী কাঁঠালপাতা মুখের সামনে ধরলে ওরা কচি কচি দাঁত দিয়ে চিবোতে লাগলো।  গায়ে হাত বুলোতে বুলোতে রানুকে জিজ্ঞেস করল,”কি কিউট,তোমরা  পোষো বুঝি?” রানু বলল ,,না গো গতকাল সেজ জ্যাঠা হাট থেকে নিয়ে এসেছে, পরশু ওদের বলি দেওয়া হবে মা কালীর সামনে। 
 
 
বিথী বলি কি ব্যাপার জানতো না, রানুর কাছ থেকে সব শুনে কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারলো না ব্যাপারটা। খুব দুঃখ পেল, বাচ্চা দুটিকে আদর  করতে করতে মনে মনে বলল আমি তোদের বাচাবইই দেখিস।  চুপচাপ রানুর সাথে ওদের ঘরে শুতে চলে গেল ও।রানু বলল, বিথী তুমি ক্লান্ত আছ, এখন ঘুমিয়ে পড়ো কাল অনেক গল্প করব আর গ্রাম ঘুরিয়ে দেখাবো তোমায়। রানু ঘুমিয়ে পড়ল কিন্তু বিথির ঘুম এলোনা সে শুধু ভাবতে লাগলো কি করে ছাগলছানা দুটিকে বাঁচানো যায়। পরদিন বিথির মুখ ভার দেখে সবাই জিজ্ঞেস করতে লাগলো ,”কি হয়েছে বিথী রানী , গ্রামের বাড়ি তে ভালো লাগছে না ?
 
 
এই প্রথমবার এলে তো ,তাই ওরকম মনে হচ্ছে, দেখবে কদিন থাকো ভালো লাগবে। ছোট মামার ছেলে পল্টু জিজ্ঞেস করল, “বিথী দিদি তোমাদের মুম্বাইয়ে এরকম বড় বড় গাছ আছে?” বিথী না উত্তর দিয়ে চুপ করে রইল ।তার মনে তখন অন্য চিন্তা তাড়া করে বেড়াচ্ছে যে। এভাবেই একটা দিন কেটে গিয়ে আজ সেই কালীপুজোর দিন। হঠাৎ বিথী লক্ষ্য করলো ছাগল ছানা দুটি নেই ,বিথী ভয় পেয়ে ছুটে রানুর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল রানু বাচ্চা দুটি কোথায় ?
 
 
রানু বলল আজি ওদের বলি দেওয়া হবে গনেশ দাদা তাই পুকুরে স্নান করাতে নিয়ে গেছে ।বিথী রানুকে বলল, আচ্ছা রানু তোমার কষ্ট হয় না ওদের জন্য? রানু বলল,  প্রথম প্রথম কষ্ট হতো, এখন আর কষ্ট হয়না ।এত প্রতি বছর ই হয় এটাই তো নিয়ম।
 
 
বীথি বলল নিয়ম? কে বানিয়েছে এই নিয়ম, ঠাকুর? হতেই পারে না। ও, ও তো কালি মার সন্তান তাহলে তাহলে আমাদের বাদ দিয়ে মা কেন ওকেই চাইবে? তাতো আমি জানিনা ভাই ছোটবেলা থেকে এটাই হয়ে আসছে বাড়িতে ।আচ্ছা রানু তুমি বাধা দাওনি কখনো ?
 
 
 
রানু বলল, বাধা? বাধা দিলে সেজ জ্যাঠা আর রক্ষে রাখবে না। বিথী আর কথা বাড়ালো না। মনে মনে বলল রানু আমি কংক্রিটের দেয়ালের ঘরে থাকি তবুও তোমাদের মত আমার মন এত কঠিন হয়ে যায়নি।
 
 
 
আস্তে আস্তে সন্ধ্যে হয়ে এল। মন্দির আলোতে ঝলমল করে উঠল ।সবাই কি সুন্দর সেজেছে কিন্তু রানুর কিছুই ভালো লাগছে না কেননা সেতো এখনো বাচ্চা দুটিকে বাঁচানোর কোন উপায় কি বার করতে পারলো না। এইসব ভাবছে, এমন সময় হঠাৎ খেয়াল করল এক মহিলা কেমন উদভ্রান্তের মত এসে মণ্ডপের সামনে ধপাস করে পড়ে গেল আর কি সব বলতে লাগলো মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে ।
বিথী রানুকে জিজ্ঞেস করলে রানু সব বুঝিয়ে বলল একে বলে ভর এ পড়া।
 
 
মানে স্বয়ং মা কালী আমাদের পাড়ার ওই জেঠিমার মধ্যে উপস্থিত হয়েছেন ।এখন উনি যা বলবেন , সবাই সত্যি মেনে নেবে ।বাড়ির বড়রা সবাই ওনার কথা মেনে চলবে। আস্তে আস্তে রাত বাড়লো। বলির সময় এগিয়ে আসছে বিথী বুঝল ,সেও সবার মত মন্ডপের সামনে বসল গিয়ে। হঠাৎ রানু আর সবাই লক্ষ্য করল বিথী কেমন আচরণ করছে ,অবিকল ওই ভর এ পড়া মহিলাটির মত ।
বড় মামা রানুর মাকে বলল “ওরে শ্যামলী তুই তো ভাগ্যবতী রে ।মা কালী স্বয়ং তোর মেয়ের মধ্যে উপস্থিত হয়েছেন ।”
 
 
 সবাই উলুধ্বনি দিচ্ছে আর শঙ্খ বাজাচ্ছে কিন্তু বিথী সজাগ তার অভিনয় নিয়ে। আর মনে মনে বলছে,,” হে মা কালী স্কুলে তো খেলাতে অনেক প্রাইজ পেয়েছি কিন্তু এখানে আমি প্রাইজ চাইনা। শুধু ওই ছানা দুটিকে যেন বাঁচাতে পারি দেখো মা।”
 বিথী এবার মাথা ঝাঁকিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগলো,” আমি পাঠা বলি চাইনা আমি এবার নরবলি চাই, নরবলি ।”
 
 
 
সবার মুখ শুকিয়ে গেল। বিথী অবস্থা বুঝতে পেরে সেজো মামার ছোট ছেলের হাত ধরে টেনে নিয়ে বলল আমি এর বলি চাই ।
শুনে সেজো মামী বীথির পা ধরে কাঁদতে লাগলো, মামা জ্ঞান হারালো ।
 
 
মায়ের আদেশ অমান্য করা যায় না কিন্তু এ কী করে সম্ভব। অবস্থা সিরিয়াস দেখে, বিথী শান্ত হয়ে ভারী গলায় হাঁপাতে হাঁপাতে বলল শোন আমি আর কোন বলি চাইনা এ বাড়িতে আর তোরা যদি এই গ্রামে বলি নিষিদ্ধ করতে পারিস আমি তাতেই খুশি হব। এই পর্যন্ত বলে বিথি আবার অজ্ঞানের অভিনয় করে মায়ের কোলে ঢোলে পরলো। তাড়াতাড়ি বীথিকে রানুদের ঘরে শুইয়ে দেওয়া হল। রাত্রিবেলা রানু এলে, বিথী জিজ্ঞেস করল ছাগলছানা দুটো কোথায় রানু,ওদের ছেড়ে দিয়েছে তো সেজো মামা ?
 
 
রানুর আর কিছু বুঝতে বাকি রইল না। তাই বিথীকে জড়িয়ে সে কানে কানে বললো,” না বাধা আছে যেখানে ছিল, তুই আদর করবি না ?”
কথা দিলাম বাড়ির কাওকে বলব না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *