sudipta Biswas

🌍মা / সুদীপ্ত বিশ্বাস

স্বর্গ বলে যদি কিছু থাকে তো সে এই মাটির পৃথিবীটাই।প্রকৃত বন্ধু বলে যদি কেউ থেকে থাকে তো সেই বন্ধু মা বাবাই।দেবতা বলে যদি কিছু থেকে থাকে তো তাও সেই মা বাবাই।মা বাবার চেয়ে বড় বন্ধু, বড় দেবতা আর কেউ হতে পারে না।তাদের হাত ধরেই আমরা এই মাটির পৃথিবীতে এসেছি।তাদের স্নেহে লালিত হয়েছি।তাদের দান করা প্রাণশক্তিটাকেই বহন করে নিয়ে চলেছি কোনও এক অনন্তের পথে।আমাদের আসা যাওয়া, বেঁচে থাকা, চাওয়া পাওয়া, দু:খ সুখ, আনন্দ বেদনা, সব কিছুই মা বাবাকে কেন্দ্র করে।তাদেরকে কেন্দ্র করেই আমাদের এই ক্ষুদ্র জীবন। পরম স্নেহে, পরম মমতায় মা বাবা আমাদের আগলে রাখেন।মৃত্যুর পরেও তারা ছায়ার মত থাকেন আমাদের পাশে পাশে। মা ফিস ফিস করে বলেন, ‘ভয় কি রে? আমি তো আছি।’কোনও ঠাকুর কোনও বিগ্রহ, কোনও প্রতিমা মা বাবার চেয়ে পবিত্র হতে পারে না।মা বাবাকে পুজো করলে অন্য কোনও ঠাকুর দেবতাকে পুজো না করলেও চলে।ছোট্ট শিশু থাকে মায়ের কোলে।এক মুহূর্তও মাকে ছাড়া তার চলে না।সেই শিশুও একদিন বড় হয়ে ওঠে। কিন্তু সে যত বড়ই হোক না কেন মায়ের স্নেহ মমতা ছাড়া সে বাঁচতে পারে না।মায়ের কাছে সে চিরদিনই সেই ছোট্ট খোকা।মায়ের থেকে একটু দূরে গেলেই সবার মনটা ছটফট করতে থাকে।রবি ঠাকুর কবিতাতে লিখেছেন, ‘ মা বলিতে প্রাণ করে আনচান।’ আমরা যখন বাড়ি থেকে বেশ কয়েকদিনের জন্য বাইরে যাই, তখন কথাটার সত্যতা বুঝতে পারি।বাড়িতে ফিরেই প্রাণ খুলে কয়েকবার ‘মা, মা’ বলে না ডাকলে মনে শান্তিই পাওয়া যায় না।
মা যেন এক ম্যাজিশিয়ান। দু:খ ভ্যানিশ করার জাদুকাঠিটা তার হাতে।আর বাবা? ফল্গু ধারার মত তার ভালবাসাটা।কোথাও উচ্ছ্বাস নেই, তরঙ্গের ছলছল কলকল নেই, কিন্তু প্রবাহমান, অদ্ভুত শান্ত আর স্থির ভাবে।বটগাছের ছায়ার মত পরম স্বস্তি আর বিশ্বাসের একটি যায়গা। বাবা না থাকলে আমরা সবাই দিগম্বর হয়ে পড়ি।মাথার উপর থেকে ছাতাটি হারিয়ে গেলে আকাশটিই একমাত্র অবশিষ্ট থাকে।আকাশের ঝড় ঝাপটা, রোদ জল সব সোজাসুজি এসে পড়ে মাথাতে।বাবা বুক দিয়ে সব আগলে রাখেন। যখন বাবা খুব দূর্বল খুব ক্ষীন হয়ে যান, যখন বুকে তার পেসমেকার, চোখে পুরু কাচের চশমা তখনও ছাতাটি তার হাতে শক্ত… খুব শক্ত করে ধরা।ধনুকভাঙ্গা পণ তার, যেন কিছুতেই না ভেজে তার সন্তান।
দধীচির মত নিজের পাঁজরের হাড় দিয়ে বজ্র তৈরি করে তিনি প্রস্তুত যে কোনও শত্রুর সঙ্গে মোকাবিলার জন্য।অসম সমরে সন্তানের জন্য তার প্রাণ উৎসর্গীত।শেষ রক্তবিন্দু দিয়েও লড়ে যান তিনি।তাকে পৌঁছে দিতেই হবে তার অপত্যকে কোনও এক অনন্তের দিকে।অমৃতের সন্ধানে। ঈশ্বর এই মাটির পৃথিবীতে আমাদের অনেক কিছু দিয়েছেন।সকালবেলার সূর্য, তেষ্টার জল,মিষ্টি বাতাস, পাখির গান,রাতের চাঁদ, তারাভরা আকাশ।সবই তার উপহার। কিন্তু তার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ উপহার হল মা-বাবা।আর সব কিছু দিয়েও যদি ঈশ্বর মা বাবাকে না দিতেন, তাহলে আমরা একদম নি:স্ব হয়ে পড়তাম। ছোটবেলার সেই গল্পটার কথা মনে পড়ে।একটি বাচ্চা মেয়ে গেছে মেলাতে।মেলার বাঁশি, রঙিন পুতুল, পাপড় ভাজা সব কিছুই তার খুব ভাল লাগে।সে মায়ের কাছে সব জিনিসের জন্যই বায়না করে।দু:খি মা তার সব বায়না মেটাতে পারে না।এরপর ভিড়ের মধ্যে সে হারিয়ে ফেলে তার মা কে।খুব কাঁদতে থাকে বাচ্চাটি।সবাই তাকে শান্ত করার জন্য বাঁশি, পুতুল, পাঁপড়ভাজা নিয়ে আসে।কিন্তু বাচ্চা মেয়েটি সে সব ফেলে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে থাকে শুধুই মায়ের জন্য।সত্যি, মা থাকলে তবেই অন্যান্য জিনিসের তাৎপর্য থাকে।মা না থাকলে কোনও কিছুরই কোনও মূল্য থাকে না।আমাদের যে কোনও সুখ দু:খ মায়ের বুকে যেমন বাজে, তেমনটি আর কারও বুকে বাজে না।উপনিষদ এর সেই তত্ত্বমসি মহাবাক্যকে একমাত্র মা-ই সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেন।তত্ত্বমসি অর্থাৎ তৎ -তম-অসি, তুমিই সেই।আমি নই- আমার নিজের সুখে কোনও সুখ নেই, তোমার সুখ, তোমার সুখেই আমার সুখ। তোমার আনন্দেই আমার আনন্দ। তোমার দু:খেই আমার দু:খ।সন্তানের জন্য মায়ের এই যে অনুধাবন, উপলব্ধি এর কোনও তুলনা নেই দুনিয়ায়। মা ও সন্তানকে এক অদ্ভুত বাঁধনে কে যেন বেঁধে দিয়েছে।মায়ের নাওয়া নেই, খাওয়া নেই, ঘুম নেই, শুধু এক চিন্তা, সন্তান আর সন্তান। কিছুই চাওয়া নেই তার সন্তানের থেকে। সব উজাড় করে দেওয়াতেই তার আনন্দ। তার সমস্ত অন্তঃকরণ এক সঙ্গে বলে ওঠে,- ‘আমায় যে সব দিতে হবে।’
নিজের সবটুকু নিংড়ে দেওয়ার পরেও মায়ের মনে থেকে যায় আক্ষেপ। আরও অনেক কিছু যেন দিতে বাকি।মা তখন আকুল হয়ে ভগবানকে ডাকেন। ‘ঠাকুর ওকে দেখো, ওকে রক্ষা কোরো।’এই যে মা, তার পা দুটো বুকে জড়িয়ে ধরলেও মনটা শান্ত হয় না।মাথার উপরে রাখলেও স্বস্তি পাওয়া যায়না।আরও উঁচুতে, আরও ভাল কোনও যায়গা তে রাখতে ইচ্ছে করে। হাউহাউ করে কাঁদতে ইচ্ছে করে মায়ের পা দুটি ধরে।কিন্তু মা কখনো চান না তার সন্তান কাঁদুক। কখনো চান না কোনও দু:খ কষ্ট স্পর্শ করুক তার সন্তানকে।সন্তানের সুখেই তার একমাত্র তৃপ্তি।সন্তানই তার আরাধ্য ঈশ্বর, তার পরম মোক্ষ।
মা আছে তাই ফুল পাখি চাঁদ তারা ভরা এই পৃথিবী এত সুন্দর লাগে।মায়ের হাত ধরেই আমরা এদেরকে দেখতে শিখেছি, চিনতে শিখেছি।মা আছে তাই বেঁচে থাকাতে এত আনন্দ। গোটা পৃথিবী জুড়েই শুধু মা আর মা।যেখানেই জীবজগৎ যেখানেই অপত্য, সেখানেই মা।সূর্যের তৃতীয় গ্রহ, এই মাটির পৃথিবী নিজেই পরম মাতৃ প্রকৃতির স্বরূপ। পরম স্নেহে, পরম মমতায় আমাদেরকে ধরে রেখেছে তার বুকে।আমরা তার বুকের উপর দিয়ে যত দ্রুতই হেঁটে যাই, যতই গর্ত খুঁড়ি, যতই শক্ত ইটের জঙ্গলে ছেয়ে ফেলি না কেন তাকে, তবুও সে নির্বাক।অসীম ধৈর্য নিয়ে সে পরম মমতায় লালন করে চলেছে আমাদের সকলকে। তার ওই যে ২৩.৫ ডিগ্রি কোণে হেলে নাটুকে নেচে নেচে চলা, ওই যে বাতাসের বলয়, ওই যে ওজোনের মালা, ওই যে গর্ভের জলস্তর, সবই তার সন্তান প্রতিপালনের জন্য।সন্তানের জন্যই তার জীবন আজ বিপন্নপ্রায়।তবু মাতৃস্বরূপ এই পৃথিবী সন্তান পালনে মগ্ন।সকলেই যাতে ঠিকঠাক সূর্যালোক পায়, তাই সে চব্বিশঘণ্টা ঘুরে চলেছে সূর্যের চারিদিকে। আমরা সবাই ঘুমিয়ে পড়লেও তার বিরাম নেই,বিশ্রাম নেই।উল্কাপিন্ডের আঘাত থেকে সন্তানকে বাঁচাতে সে অতন্দ্রপ্রহরী, সদা জাগ্রত।

সন্তানের জন্য মায়ের অদ্ভুত সহ্য শক্তি।যে মেয়ে একটুতেই রেগে ওঠে, সেই যখন মা হয়, তখন সে সব পারে।তার ধৈর্যের সীমা অসীম হয়ে যায়।মায়ের এই শক্তিকে বলে মাতৃশক্তি।ইস্ট্রোজেন হরমোনের অদ্ভুত ক্রিয়াতে প্রকৃতি মা কে এই শক্তি দান করে।মা সহনশীলতার সবচেয়ে বড় প্রতীক। মায়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে শিশুর যে আনন্দ, শিশুকে কোলে নিয়ে মায়ের আনন্দ তার চেয়ে অনেক গুন বেশি। মায়ের চোখে তার শিশু অদ্ভুত সুন্দর। তার হাত নাড়া, চলা ফেরা সবকিছুই স্বর্গীয় সুন্দর। মায়ের কাছে থাকে একটি জীবনদায়ী প্রদীপ। এই প্রদীপ থেকেই মা প্রোজ্জ্বলিত করেন সন্তানকে।আর সন্তানের জীবনদীপ যেন নিভে না যায় সে জন্য মা থাকেন সদা জাগ্রত। আসলে জীবন মানেই এই প্রদীপটাকে আগলে নিয়ে চলা।প্রদীপটি নিভে গেলেই মৃত্যু, অন্ধকার যার সীমানা।মৃত্যু নিষ্টুর, মৃত্যু অমোঘ, মৃত্যু কালজয়ী। কিন্তু তবু মায়ের সঙ্গে যুদ্ধে মৃত্যু আজ পর্যন্ত জয়লাভ করতে পারেনি।পারেনি বলেই জীবনের প্রবাহমানতা আজও বর্তমান। মানুষের তৈরি কোনও কিছুই নিজের প্রতিলিপি গঠনে সক্ষম নয়।একটি কম্পিউটার বা রোবট যতই বুদ্ধিমান হোক না কেন, নতুন কম্পিউটার বা রোবট তৈরি করতে পারে না নিজে থেকে।কিন্তু ঈশ্বর সৃষ্ট সমস্ত জীব মায়ের মাধ্যমে তাদের প্রতিলিপি তৈরিতে শুধু সক্ষমই নয়, বিবর্তনের ধারায় নিজের চেয়েও শ্রেষ্ঠ সন্তান জন্ম দেন মা।তাই তো সন্তান নিয়ে মায়ের এত আহ্লাদে আটখানা ভাব।সন্তানকে দেখে দেখে তার আর আশ মেটে না।একটু এদিক ওদিক ঘুরে এসে আবার সন্তানের মুখটা দেখা চাই ই চাই।সন্তান মুখ টিপে একটু হাসলেই তার সমস্ত অন্তঃকরণ হেসে ওঠে। সন্তানের জন্য মায়ের এই যে আত্মত্যাগ, তাই গৃহীকে করে তুলেছে সন্নাসীর চেয়েও মহান।সন্নাসী সব ত্যাগ করেছেন। তার ত্যাগের শক্তি তার নিঃস্পৃহতা। আর মায়ের ত্যাগের শক্তি সন্তানের প্রতি তার আদি ও অকৃত্রিম ভালবাসা। যেহেতু ভালবাসার চেয়ে শক্তিশালী আর কোনও অস্ত্র পৃথিবীতে নেই, সেই জন্যই মায়ের ত্যাগ এত জোরালো। নিজে ত্যাগ করে সংসারকে ভোগের জিনিস তুলে দিয়ে সন্নাসীর যে আনন্দ তার চেয়ে অনেক গুন বেশি আনন্দ পান মা তার মুখের খাবার সন্তানের মুখে তুলে দিয়ে।তাইতো বিশ্ববরেণ্য সন্নাসী আচার্য শঙ্কর, স্বামী বিবেকানন্দ মা বলতে অজ্ঞান ছিলেন। মা কে কষ্ট করে নদীর কাছে যেতে দেখে আচার্য শঙ্কর এত দু:খ পেয়েছিলেন যে, নদীকেই বলেছিলেন মায়ের কাছে আসতে।পথে ও প্রবাসে সর্বত্যাগী সন্নাসী বিবেকানন্দের আত্মাটি কেঁদে উঠত মায়ের জন্য।ঠাকুর তাকে ব্রহ্মশক্তিতে একটু ছুঁয়ে দিতেই তিনি আকুল হয়ে উঠেছেন – ‘ তুমি আমাকে এ কি করলে গো, আমার যে বাপ মা আছেন।’ উপনিষদ এর মতে- ‘আনন্দাদ্ধ্যেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে’, আনন্দ, শুধু আনন্দেই সৃষ্টি হয়েছে সমস্ত জীবকূল।সৃষ্টি সুখের আনন্দে মা বিভোর। আনন্দেই তার সৃষ্টি। সৃষ্টিই তার আনন্দ। মা হল সৃষ্টির একক বা পরমাণু স্বরূপ। তার সৃষ্টি সুখের আনন্দের ধারাটি জগৎজুড়ে প্রবাহিত। শুধুমাত্র এই মাটির পৃথিবীতে নয়, আমাদের আকাশগঙ্গা ছায়াপথের দশ হাজার কোটি নক্ষত্রলোকে… আরও দূরে এন্ড্রোমিডা ছায়াপথের জগতে… সমস্ত ছায়াপথকে ব্যপ্ত করে গোটা মহাবিশ্বেই এই মাতৃশক্তির আনন্দধারাটি বর্তমান। ব্রহ্মাণ্ডজুড়ে মাতৃশক্তির এই লীলাকে উন্মোচন করতেই সৃষ্টি হয়েছে বিজ্ঞানের এক নতুন শাখা – Panspermiea বা মহাপ্রাণবাদ।তারায় তারায় চলছে SETI (Search for Extraterrestrial Intelligence) অনুসন্ধান।অর্থাৎ মহাকাশে মাতৃত্বের খোঁজ।
শিশু একটু কেঁদে উঠলেই মায়ের বুকটা ডাক ছেড়ে কেঁদে ওঠে। শিশুর জন্য সারারাত একদিকে পাশ ফিরে শুয়ে থাকেন মা।ঘুমানো হয় না একটুও।তবু মুখে এতটুকু বিরক্তির ছাপ নেই। শিশুর জন্য ত্যাগেই তার আনন্দ। মায়ের এই বুকভরা স্নেহ আছে বলেই বেঁচে থাকাটা এত আশ্চর্য সুন্দর বলে মনে হয়।পরজন্ম বলে কিছু থাকলে আবার ফিরে ফিরে আসতে ইচ্ছে করে মায়ের মমতা মাখানো এই মাটির পৃথিবীতে…স্নেহময়ী মমতাময়ী মায়ের কোলে ….

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *