রক্তদেবতার মন্দির পর্ব – ১৪ — সুৃব্রত মজুমদার

 
ভটচায মশাইয়ের কথা শেষ হতেই সেই তামার প্লেটটাতে মূর্তিগুলো বসাতে লাগল গ্রহ অনুসারে । সূর্য্যের মাতঙ্গী, চন্দ্রের কমলা, মঙ্গলের বগলামুখী, বৃহস্পতির তারা ও শুক্রের ভুবনেশ্বরী। তাহলে বাকি রইলো বুধ, শনি, রাহু আর কেতু। প্লেটে মূর্তিগুলো বসানোর সঙ্গে সঙ্গে একেবারে একাঙ্গীভূত হয়ে যাচ্ছে মূর্তিগুলো। বিক্রম প্লেটটা ব্যাগে ভরে রাখল। লোকদুটোকে আর দেখতে পাইনি, তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস ওরা আশেপাশেই কোথাও আছে আর আমাদের ফলো করছে। 
 
 
 
            ভটচায মশাই বললেন, “এখনো তিনটে মূর্তি পাওয়া বাকি। আমার মনে একটা থিওরি বাসা বেঁধেছে।” 
বিক্রম উদগ্রীব হয়ে বলল, “কি থিয়োরি ?”   ভটচায মশাই বললেন, “তিনটে গ্রহের তিনটে দেবীমূর্তি পেতে বাকি আছে। কি কি বাকি আছে ? বুধ, রাহু ও কেতু। এখন রাহু মানে তো শুধুই মাথা, আর মাথার প্রধান অঙ্গ চোখ। সুতরাং…. “
 
 
” তারাপীঠ যেতে হবে আমাদের। ” বগলা ভটচাযের কথা শেষ হবার আগেই অঘোরবাবু ফুট কাটলেন। ভটচায মশাই বললেন, “একদম ঠিক। এতদিনে তোমার বুদ্ধি খুলেছে বগলা। বাকি রইল বুধ আর রাহু। বুধের রং সবুজ। মল্লারপুর পেরিয়ে সবুজ অরণ্যের ভিতরে একটা মহাভারতের আমলের প্রাচীন শিব মন্দির আছে। ওখানেই মিলতে পারে। আর  মা দ্বারবাসিনীর কাছে মিলবে দেবী ছিন্নমস্তাকে। শনির দক্ষিণাকালি, কিন্তু সেটার ব্যাপারে আমার আন্দাজ কাজ করছে না। গোটাটাই আমার অনুমান। চলো একবার অনুমানে ভর করে….. কি হয় দেখি। “
 
 
 
                   নলহাটি হতে ট্রেনযোগে ফিরে এলাম রামপুরহাটে। এরপর অটোরিক্সা করে সোজা তারাপীঠ। ভটচায মশাই বললেন,” চলো এসেছি যখন তখন তারাপীঠে মায়ের পুজোটা দিয়েই যাই। পুজো দিয়ে খাওয়া দাওয়া করে হোটেলে আসতেই রাত এগারোটা মতো বেজে গেল। আমরা ভটচায মশাইকে চেপে ধরলাম তারাপীঠের ইতিহাস বলার জন্য। ভটচায মশাই শুরু করলেন ।
 
 
 
                     “মা তারা আসলে বৌদ্ধতান্ত্রিক দেবী । ইনি তিব্বতে ‘জেটসুন দোলমা’, চিনে ‘দৌলাও পূষা’ ও জাপানে ‘তারা বোসাতসু’ নামে পরিচিতা। হিন্দুদের দশমহাবিদ্যার অন্যতম ইনি। বজ্রযানে আট ধরনের তারার নাম পাওয়া যায়। এরা হলেন-  শুক্ল তারা, হরিৎ তারা, নীল তারা, রক্ত তারা, কৃষ্ণ তারা, খদিরবর্ণ তারা, চিত্তমণি তারা ও পীত তারা। আবার কোনো কোনো মতে তারা মোট একুশ রকমের। 
 
 
 
তান্ত্রিক তারার মন্ত্র হল  – ‘ওঁ তারে তুত্তারে তুরে স্বাহা’ । দেবী ভয়াল, খর্ব আকৃতি, সর্পোবীত ধারিনী । চতুর্ভুজা দেবীর চারটি হাতে যথাক্রমে খড়্গ, কাতি ( কাটারি ), খর্পর ও পদ্ম রয়েছে। 
 
 
আগেই বলেছি  ( ফুল্লরার ইতিহাস বলার  সময় ) বেদগর্ভের ছেলে বশিষ্ঠ রাজা আদিশূরের কাছ হতে সিদ্ধল গ্রাম উপহার হিসেবে পেয়েছিলেন। এই বশিষ্ঠই চিনে যান বৌদ্ধতন্ত্র শিক্ষার জন্য। সেখানে তিনি তৎকালীন প্রধান লামার দর্শন পান। যেহেতু বৌদ্ধধর্মে বড় বড় বিখ্যাত ধর্মগুরু বা লামাদের বুদ্ধহিসাবেই বিবেচনা করা হয় তাই মা তারার ইতিহাস বর্ণনায় বশিষ্ঠের সঙ্গে বুদ্ধজনার্দনের সাক্ষাৎকারের কথা আছে। 
 
 
যদিও এই তারাপীঠ শক্তিপীঠ হিসাবে স্বীকৃত নয় তবুও শিবচরিত অনুসারে  এখানে দেবীর বামনেত্র পড়েছিল। এখানে দেবী তারাতারিণী ও ভৈরব উন্মত্ত। 
 
‘তারাদ্যায়াং বামনেত্রং তারাখ্যাতারিণী পরা। 
উন্মত্ত ভৈরব স্তত্র সর্বলক্ষণ সংযুতঃ।।
 
 
                  রুদ্রযামলে বশিষ্ঠের গল্প আছে। এখন অট্টহাসের পিতা বশিষ্ঠের গল্প সত্য হলে রুদ্রযামল প্রক্ষিপ্ত বা অনেক পরের লেখা বলে ধরে নিতে হবে। তবে আদিশূর ও অট্টহাস ঐতিহাসিক ব্যক্তি, সুতরাং রুদ্রযামলের বশিষ্ঠ যে অট্টহাসের পিতা তা মেনে নিতে অসুবিধা হয় না। আবার ‘চিনাচার তন্ত্র’ অনুসারে – 
 
‘বক্রেশ্বরস্য ঐশান্যাং বৈদ্যানাথস্তু পূর্বতঃ।
দ্বারকায়াং পূর্বভাগে তত্র তারা অধিষ্ঠিত।। 
শিলাময়িতি তদ্দেবী নিবসন শাল্মলীমূলে।’ 
 
 
 
                 অর্থাৎ বক্রেশ্বরের ঈশানকোনে , বৈদ্যনাথের পূর্বে উত্তরবাহিনী দ্বারকার তীরে শিমুল গাছের তলায় দেবী তারা শিলাময়ী হয়ে অধিষ্ঠান করছেন। এই ব্রহ্মশিলায় মহাদেব কে স্তন্মপানরত দেবীর ছবি অঙ্কিত আছে। “
 
 
সকালবেলা শিবপাহাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। তারাপীঠ হতে একটা অটোরিক্সা ভাড়া করে নিয়েছি। অটোটা আটলা পেরোতেই প্লেটের মূর্তিগুলো জ্বলে উঠল। আমরা নেমে পড়লাম অটো হতে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর রাস্তার ধারে একটা পুকুরের ধারে দমের ভেতর মূর্তি পাওয়া গেল। 
 
 
 
           মূর্তিটি হাতে করে বগলা ভটচায বললেন, “এ তো ত্রিপুরাসুন্দরী মূর্তি, শঙ্করাচার্য্য ইনার ধ্যান করতেন। সম্পূর্ণ পান্নার তৈরি। ষোড়শবর্ষীয়া বালিকা, কৃষ্ণবর্ণা, ত্রিনয়না,  চতুর্ভুজা, রক্তাম্বর পরিহিতা, সর্বালঙ্কারভূষিতা এবং স্বর্ণসিংহাসনের উপর পদ্মাসনে উপবিষ্টা। ইনি বুধের অধিষ্ঠাত্রি দেবী ।” 
 
 
 
 
                  বিক্রম তামার প্লেটের ফাঁকা স্থানে দেবীমূর্তিকে সেট করে দিলেন। অটো এগিয়ে চলতে লাগল। মল্লারপুরের একটা জায়গায় এসে প্লেটের মূর্তিগুলো আবার জ্বলে উঠলো। আবার শুরু হল খোঁজাখুঁজি। খুঁজতে খুঁজতে এসে পৌঁছলাম মল্লেশ্বর শিবমন্দিরের কাছাকাছি। একটা গাছের কাছে ধুলোমাখা অবস্থায় পাওয়া গেল আরেকটি দেবীমূর্তি। মূর্তি টা দেখে ভটচায মশাই বললেন, “কেতুর অধিষ্ঠাত্রি দেবী মা ধুমাবতী। ক্যাটসআইয়ের তৈরি। দেবী কৃষ্ণাম্বরা, বৃদ্ধা,কাকবাহনা, বিধবা ও সূর্প বা সুপ মতান্তরে কুলো হাতে রথে উপবিষ্টা।” 
 
 
                সেই মূর্তিটিকেও প্লেটে সেট করে নিল বিক্রম। ভটচায মশাই বললেন, “চলো এতদূর যখন এসেছি তখন বাবা মল্লেশ্বর আর মা সিদ্ধেশ্বরীর দর্শন করে নিই। এই মন্দির চত্বরেই আছে বিখ্যাত সাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের জীবন্ত সমাধী। “
 
 
                    আমরা মন্দিরে প্রবেশ করলাম। মন্দিরটি জনৈক মল্লরাজার তৈরি। অনেকগুলি শিবমন্দিরের মাঝে মল্লেশ্বর শিবের মন্দির, আর তার পাশে মা  সিদ্ধেশ্বরীর মন্দির। এটিকে মন্দির না বলে মন্দির কমপ্লেক্স বলাই ভালো। প্রধান প্রবেশপথের চৌকাঠে পূর্ণকলস খোদিত করা। ওখানে প্রণাম করে প্রবেশ করতে হয়। ভটচায মশাই বললেন, “এই কারণেই দরজার চৌকাঠে পা দিতে নেই। এই মন্দিরটি অনেক প্রাচীন। মন্দিরের লিখন অনুসারে ১১৭২ শকাব্দে মন্দিরটির প্রতিষ্ঠা হয়। 
 
 
                 জনশ্রতি অনুসারে ভগবান শিবের বরপুত্র মল্লনাথ মহাদেবের বরে রাজ্যলাভ করেন। তিনিই মল্লেশ্বর শিবমন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন। তার রাজত্ব ধনরত্ন ও সম্পদে পরিপূর্ণ ছিল। নিকটবর্তী গোয়ালা গ্রামে ছিল রাজার গোয়াল, মহিষাকুড়ায় মহিষের বাথান, কাষ্ঠগড়ায় কাঠগড়া বা আদালত, মালুঞ্চিতে উদ্যান, হস্তিকাঁদায় হাতিশালা ছিল। শত্রু আক্রমণে পরাজিত রাজা সপরিবারে নৌকাডুবিতে নিহত হন। মনে করা হয় তার ধনসম্পদ এই মন্দিরের কোথাও লুকিয়ে রাখা আছে। প্রতিবছর নিকটবর্তী শিবপাহাড়ী হতে ঘট নিয়ে আসা হয় এই মন্দিরে, একে শিবানা বলে। “
 
 
 
চলবে   ———————
 
 
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *