বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ১৩ – সিদ্ধার্থ সিংহ

বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ১১ – সিদ্ধার্থ সিংহ – ক্লিক করুন
বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ১২ – সিদ্ধার্থ সিংহ – ক্লিক করুন

Bangla Sahitya
তার পর আবার কোনও খবর নেই। দেখতে দেখতে ছ’দিন কেটে গেল। ফের তাকে দেখা গেল ডায়মন্ড সোলস থেকে একটু দূরে কেপ লুকআউট লাইটশিপ পেরিয়ে যাচ্ছে ওটা। কেপফিয়ার লাইটশিপ থেকে কেপ লুকআউট লাইটশিপের দূরত্ব প্রায় আশি মাইল। এইটুকু আসতে তার ছ’দিন সময় লেগে গেল! আর যদি আসার পথে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েও সে এসে থাকে, তা হলে তাকে কেউ অন্যত্র কোথাও দেখতে পেল না কেন!
বসানো হল বোর্ড অব এনকোয়ারি। শুরু হল অনুসন্ধান। মার্কিন সরকারের ছ’-ছ’টি বিভাগ— নেভি, ট্রেজারি, স্টেট, নেভিগেশন, কমার্স এবং জাস্টিস, সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ল সত্য উদ্ঘাটনের জন্য। কিন্তু কেউ কিচ্ছু খুঁজে পেল না। শুধু নর্থ ক্যারোলিনা উপকূলে একটা বোতল পাওয়া গেল। বোতলের ভিতরে একটা চিঠি। তাতে লেখা— একটি ট্যাঙ্কার না সাবমেরিন, ঠিক বুঝতে পারছি না, আমাদের উপরে চড়াও হয়েছে। আমাদের নাবিকদের বেঁধে রেখেছে। হেড অফিসে এক্ষুনি খবর দাও। কিন্তু কোন হেড অফিসে! আর এই চিঠিটি লিখলেনই বা কে!
যদিও এ রকম চিঠি-সহ বোতল আগে এবং এখনও পৃথিবীর সর্বত্রই সমুদ্রের ধারে হামেসাই ভেসে আসতে দেখা যায়। যিনি এই বোতলটা কুড়িয়ে পেয়েছিলেন, তাঁর নাম ক্রিস্টোফার কলম্বাস গ্রে। তিনি বললেন, বোতলের চেহারা দেখে মনে হচ্ছে, এটা ডিয়ারিং জাহাজ থেকে নয়, নর্থ ক্যারোলিনা উপকূলের কোনও ছোটখাটো পাতি জেলেনৌকো থেকে ভাসানো হয়েছে।
কিন্তু ওয়ারমেলের স্ত্রী মিসেস ডাবলিউ বি ওয়ারমেল এবং এবং তাঁর মেয়ে লুলু ছাড়াও আরও তিন জন হ্যান্ডরাইটিং এক্সপার্ট মিলে ওই চিঠিটির হাতের লেখা শনাক্ত করেছিলেন। তাঁরা বলেছিলেন, ওই হাতের লেখাটা জাহাজের ইঞ্জিনিয়ার হেনরি বেটসের। ফলে মিসেস ওয়ারমেলের বদ্ধমূল ধারণা হল যে, হয় বলশেভিক পার্টির লোকেরা জাহাজ লুঠ করে তাঁর স্বামী-সহ জাহাজের সবাইকে বন্দি করে রাশিয়ায় চালান করে দিয়েছে। 
এত দিনে তাঁরা হয়তো ক্রীতদাসরূপে কোনও কারখানা কিংবা কোনও চাষের জমিতে কাজ করছেন। নয়তো জলদস্যুরা জাহাজ লুঠ করে জাহাজের আরোহীদের নির্মম ভাবে হত্যা করে মৃতদেহগুলো জলে ভাসিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তাঁর বাবাকে খুন করতে যাবে কে! তাঁর তো বয়স হয়েছিল। তেমন কোনও শত্রুও ছিল না তাঁর। কোনও দিন কোনও বিতর্কিত ঘটনার সঙ্গে জড়িয়েও পড়েননি তিনি। বরং সবার কাছেই ছিলেন অত্যন্ত শ্রদ্ধার মানুষ।
এ সব তাঁর মেয়ে ভাবতেই পারেন। সেটা বড় কথা নয়। কিন্তু এখানে একটা ছোট্ট প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, খোঁজখবর না-নিয়ে জলদস্যুরা কেন, অনামী সামান্য কোনও ডাকাতও কোনও দিন কোনও জাহাজে লুঠ করতে ওঠে না। আর ওই জাহাজটি ছিল একেবারে ফাঁকা। দামি কোনও মালপত্রও ছিল না। তা হলে ওরা হঠাৎ ওই জাহাজে চড়াও হল কেন! তা ছাড়া জাহাজটি মূল ভূখণ্ডের যেখানে ভাসছিল, সেখানে পুলিশি ব্যবস্থাও যথেষ্ট আঁটোসাটো। ও রকম কোনও জায়গায় কি জলদস্যুদের পক্ষে আক্রমণ চালানো সম্ভব!
কেউ কেউ বললেন, জাহাজ ছাড়বার কয়েক দিনের মধ্যেই ক্যাপ্টেন ও ফার্স্ট মেট অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ফেরার পথে নতুন কাপ্টেন বারবেডসও অসুস্থ হয়ে পড়েন। এটা থেকেই আন্দাজ করা যায় যে, ডিয়ারিং জাহাজে নিশ্চয়ই এমন কোনও মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ দেখা দিয়েছিল, যার কোনও চিকিৎসা নেই। পরে তা অন্যান্য আরোহীদের মধ্যেও হু হু করে ছড়িয়ে পড়েছিল। তাঁরা হয়তো চাননি, অমন একটা রোগ বহন করে এনে মনুষ্য সমাজে ছড়াতে। অন্যদের বিপদে ফেলতে। তাই তাঁরা সবাই মিলে একসঙ্গে আত্মহত্যা করেছিলেন।

যাতে ওই রোগ ওখানেই শেষ হয়ে যায়। ডাঙায় এসে না পৌঁছয়। সে তাঁরা করতেই পারেন। কিন্তু তা হলে এখানেও একটা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, আত্মহত্যা করলে সেই মৃতদেহগুলো কোথায় গেল, জাহাজেও তো নেই। জলেও ভাসতে দেখা যায়নি কারও দেহ। তা হলে! আর সর্বশেষ প্রশ্ন, জাহাজের লাইফবোর্ডগুলো কোথায় গেল! কেউ তার হদিশ দিতে পারলেন না।
দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যাক্ত অবস্থায় ভুতুড়ে জাহাজের মতো সমুদ্রের বুকে পড়ে থাকতে থাকতে ক্যারল এ ডিয়ারিং একেবারে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ব্যবহার করার আর কোনও উপায় ছিল না। কোস্টগার্ডরা ঠিক করলেন, জাহাজটা তাঁরা ভেঙে ফেলবেন। কিন্তু না, তাঁদের কষ্ট করে আর ভাঙতে হয়নি। হঠাৎ প্রবল এক ঝড়ে ভেঙে তছনছ হয়ে গেল জাহাজটা।
 স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে পর্যটকদের দেখানোর জন্য সেই জাহাজের কিছু কিছু টুকরো কেপ হ্যাটেরাসের বহু দোকানে এখনও সযত্নে রাখা আছে। আর স্বয়ং ক্যারল বাস করছেন মেন স্টেটের বাথ শহরে। কিন্তু আজও ওই রহস্যের কোনও কিনারা হয়নি। বার্মুদা ট্র্যাঙ্গেলের রহস্যজালে আটকে আছে এ রকম আরও অনেক অনেক জাহাজ। এরা কোথা থেকে মাঝে মাঝে উদয় হয়, কেন হয় এবং কেনই বা ফের অদৃশ্য হয়ে যায়, কেউই তা জানেন না।
যেমন জানেন না টিগেনমাথ ইলেকট্রন প্রমোদতরণীটির কী হল। এই প্রমোদতরণীটির মালিক ডোনাল্ড কাউহার্স্ট নিজেই ছিলেন একজন পৃথিবী বিখ্যাত ইয়ট চালক। প্রমোদতরণী কী ভাবে চালাতে হয় তা ছিল তাঁর নখদর্পণে।
বিলেতের একটি বিখ্যাত পত্রিকা সানডে টাইমস একবার একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল। ঘোষণা করা হয়েছিল, প্রমোদতরণী চেপে সব চেয়ে কম সময়ে যে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করতে পারবে, তাঁকে পাঁচ হাজার পাউন্ড দিয়ে পুরস্কৃত করা হবে। এই রেসের নাম দেওয়া হয়েছিল— গোল্ডেন গ্লোব রেস। আরও অনেক উৎসাহীর মতো কাউহার্স্টও তাতে নাম দিয়ে দিয়েছিলেন।
এক ঝাঁক ইয়টের মধ্যে থেকে উনি যে ভাবে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তাতে মনে হচ্ছিল, উনিই ফার্স্ট হবেন। কিন্তু উনিশশো ঊনষাট সালের এগারো জুলাই লন্ডন টাইমস থেকে জানা গেল, তাঁর প্রমোদতরণীকে সমুদ্রে ভাসতে দেখা গেলেও কাউহার্স্ট কিন্তু সেখানে নেই।
সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধারকারী দল ঝাঁপিয়ে পড়ল। সেই ইয়টে গিয়ে লকবুক উদ্ধার করে দেখল, পয়লা জুলাই পর্যন্ত তাতে নোট রয়েছে। অর্থাৎ তিনি ওই দিন অবধি ওই নৌকোয় ছিলেন। কিন্তু তার পর কী হল তাঁর! তাঁর খোঁজে অত্যম্ত ব্যয়বহুল নানা ধরনের অনুসন্ধান চালানো হল। সমুদ্রের গভীরে ডুবুরি নামিয়েও তল্লাশি করা হল। কিন্তু কোথাও তাঁর কোনও অস্তিত্ব পাওয়া গেল না। পরে অনেকে বললেন, ইংলন্ড ছেড়ে আটলান্টিক সমুদ্রের বেশ কিছুটা গিয়েওছিলেন কাউহার্স্ট।
তার পর দুই আমেরিকার মাঝ সমুদ্রে কী যে তাঁর মতিভ্রম হল, কে জানে! ওখানেই তিনি ঘোরাফেরা করতে লাগলেন। সে সময় বোধহয় তাঁর মাথায় কোনও দুষ্টু বুদ্ধি ভর করেছিল। তাই তার বশবর্তী হয়ে তিনি তাঁর শক্তিশালী ট্রান্সমিটার মারফত পৃথিবীর নানা বন্দরের নাম উল্লেখ করে, তিনি সেখানে বিপদে পড়েছেন বলে মিথ্যা রিপোর্ট পাঠাতে লাগলেন। তিনি যে মিথ্যা বলছিলেন, তার প্রমাণ, ঘণ্টায় ঘণ্টায় তিনি এমন এক-একটা বন্দরের নাম বলছিলেন, যে-বন্দর থেকে অন্য বন্দরে পৌঁছতে এক ঘণ্টা কেন, গোটা একটা দিনেও সম্ভব নয়।
নিয়ম ভেঙে তিনি নাকি ডাঙাতেও কাটিয়েছিলেন বেশ কিছুকাল। প্রতিযোগিতায় নেমে কেউ যে এমন কাণ্ড ঘটাতে পারেন, তা কাউহার্স্টের খামখেয়ালিপনা না দেখলে কেউ বিশ্বাসই করতে চাইবেন না। ওঁর নিজের উপরে এই অঘাত আস্থা আমাদের মনে করিয়ে দেয় খরগোশ আর কচ্ছপের দৌড়ের গল্প। উনি সবার থেকে এগিয়ে আছেন। সুতরাং তিনি ফার্স্ট হচ্ছেনই, তা হলে আর চিন্তা কীসের! একটু জিরিয়ে নেওয়া যাক। এটা ভেবে হয়তো উনি ডাঙায় গিয়ে কাটাচ্ছিলেন। ঠিক সময়ে এসে আবার নৌকোয় চেপে বসবেন। এবং ফের সবাইকে টপকে যাবেন।
এই আত্মবিশ্বাস প্রতিযোগীর যতই থাক না কেন, এটা কিন্তু নিয়ম বিরুদ্ধ। আর সেটা প্রথম ধরে ফেলেন, এই প্রতিযোগিতার অন্যতম বিচারক স্যার ফ্রান্সি চিকস্টার। যিনি নিজে এ কাজে একজন দক্ষ এবং অভিজ্ঞ ইয়টপ্রেমী। একবার তো নিজে একাই একটা প্রমোদতরণী নিয়ে গোটা পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেছিলেন। সমুদ্র ছিল তাঁর কাছে তাঁর ড্রয়িংরুমের মতো। সুতরাং তাঁর চোখকে ফাঁকি দেওয়া বড়ই মুশকিল। তাই ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে, লজ্জার হাত থেকে বাঁচতে, লোকের কাছে হাস্যকর হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে উনি হয়তো ভেবেছিলেন, মরে যাওয়া অনেক ভাল। তাই শেষপর্যন্ত তিনি বোধহয় আত্মহত্যার পথটাকেই বেছে নিয়েছিলেন। যদিও এটাকে অনেকেই মেনে নিতে পারলেন না।
মেনে নিতে পারেননি উনিশশো একান্ন সালে ভয়ঙ্কর অগ্নিকাণ্ডে ম্যাপল ব্যাঙ্ক নামে এক ব্রিটিশ জাহাজের ধ্বংস হয়ে যাওয়া। শোনা যায়, ওই জাহাজে নাকি প্রচুর বিস্ফোরক পদার্থ ছিল। আর অসাবধানতাবসত তারই জন্য নাকি একটার পর একটা বিষ্ফোরণ ঘটতে থাকে জাহাজে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন লেগে যায় তাতে। জাহাজে ছিলেন একশো তেষট্টি জন যাত্রী। বাঁচার জন্য তাঁরা আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকেন। লাইফবোর্ডের সামনে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। কিন্তু কোনও এক অজ্ঞাত কারণে আকাশ বিদীর্ণ শব্দ করে গোটা জাহাজটাই আচমকা ফেটে যায়। টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে সর্বত্র। মৃত যাত্রীদের পরিবারের হাতে ক্ষতিপূরণের টাকাও তুলে দেয় ইন্সিওরেন্স কোম্পানি।
এ রকম বহু জাহাজই ধ্বংস হয় সমুদ্রে। এ আর নতুন কথা কী! কিন্তু নতুন কথা হল, এর বেশ কয়েক বছর পরে পোর্ট অব স্পেনের কোস্টগার্ডরা তাঁদের দিকে হঠাৎ একটি জাহাজকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ভেসে আসতে দেখলেন। তাঁদের মনে সন্দেহ দানা বেঁধে উঠল। কারণ, ইন্টারন্যাশনাল নেভিগেশন অ্যাক্ট অনুযায়ী কোথাও কোনও জাহাজ গেলে তার আগাম সংবাদ সংশ্লিষ্ট বন্দরের কর্মকর্তাদের জানানো বাধ্যতামূলক। কিন্তু না, এই জাহাজের কোনও খবর বেতার-মারফত তাঁদের কাছে আসেনি। তা হলে! ওঁরা নৌকো নিয়ে ছুটে গেলেন জাহাজটার কাছে। গিয়ে তো একেবারে ভূত দেখার মতো অবস্থা। কারণ, জাহাজটার গায়ে জ্বলজ্বল করছে একটা নাম— ম্যাপল ব্যাঙ্ক।

ওঁরা জানতেন, এই নামের একটা জাহাজ কয়েক বছর আগেই অগ্নিদগ্ধ হয়ে শেষ হয়ে গেছে। তা হলে এটা আবার ফিরে এল কী করে! চোখে দূরবীন লাগিয়ে তাঁরা দেখলেন, জাহাজের ভেতরে কতগুলো মানুষ যেন ঘোরাফেরা করছে। আরও কাছে গিয়ে তাঁদের গলার আওয়াজও শুনতে পেলেন। সমুদ্রের বাতাসে ভর করে সে আওয়াজ ভেসে এল তাঁদের কাছে। মনে হল, ওই লোকগুলো হইহই করছেন। আস্তে আস্তে তাঁরা আরও কাছে এগিয়ে গেলেন। আর ঠিক তখনই ঘটে গেল এক অঘটন। কথা নেই বার্তা নেই, হঠাৎ ঘন কুয়াশার মধ্যে জাহাজটা ঢেকে গেল। কিছুই আর দেখা যাচ্ছে না। খানিক পরে যখন কুয়াশা কাটল, কোথায় জাহাজ আর কোথায় তার লোকজন! সবই ভোঁ ভা।
চলবে    ————–
বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ১১ – সিদ্ধার্থ সিংহ – ক্লিক করুন
বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ১২ – সিদ্ধার্থ সিংহ – ক্লিক করুন

সিদ্ধার্থ সিংহের পরিচিতি – ক্লিক করুন 


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *