রক্তদেবতার মন্দির – শেষ পর্ব – সুব্রত মজুমদার

বললাম,” শিবপাহাড়ী মানে সেই মহাভারতের জয়দ্রথের শিব তো। “
ভটচায মশাই বললেন,” হ্যাঁ। মহাভারতের জয়দ্রথের শিব। এখানেই তার পিত বৃদ্ধক্ষত্র তপস্যা করতেন। অর্জুনের বাণে জয়দ্রথের মাথা উড়ে এসে এখানেই বৃদ্ধক্ষত্রের কোলে পড়ে। গণপুর জঙ্গলের মাঝে অবস্থিত এটি। “
               মন্দিরের পেছনে একটা সমাধি দেখে অঘোরবাবু বললেন,”এটিই কি সেই আগমবাগীশের সমাধি ? ”  ভটচায মশাই বললেন,” ঠিকই বলেছ অঘোর এটিই মহান সাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের জীবন্ত সমাধি। উনি বিখ্যাত সাধক রামপ্রসাদ সেনের তন্ত্রগুরু ছিলেন। এই কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশই দক্ষিণাকালি মূর্তির রুপকার ও ‘বৃহৎতন্ত্রসার’ গ্রন্থের লেখক।”
                 মল্লেশ্বর দর্শন করে বেরিয়ে পড়লাম আমাদের সম্ভাব্য শেষ শক্তিস্থলের দিকে। দ্বারবাসিনী। অটোতে করে প্রথমে ডেউচা ও পরে ডেউচা-মুরালপুর রাস্তা দিয়ে চন্দ্রপুরে পৌঁছে গেলাম।
গ্রামটার বেশ সাদামাটা। গ্রামেরই একজনের ঘরে আশ্রয় পাওয়া গেল। এখানকার বন্দ্যোপাধ্যায় বংশ দ্বারবাসিনীর বংশানুক্রমে পুরোহিত । এছাড়াও ভটচায মশাই বহুদিন তার গুরু বজ্রধরের সঙ্গে এখানে ছিলেন। তিনিই বললেন দ্বারবাসিনীর ইতিহাস।
“যতটুকু জানা যায় এই দ্বারকানদী মাত্র দুটো জায়গায় উত্তরবাহিনী হয়েছে। আর দু’জায়গাতেই দুটো শক্তিস্থল, – দ্বারবাসিনী ও তারাপীঠ।
                   লোককথা অনুসারে দ্বারবাসিনীর প্রথম সেবাইত হলেন ত্রিলোক শর্ম্মা। তার পূর্বের ইতিহাস পাওয়া যায় না। ত্রিলোক শর্ম্মার দুই পুত্র ও এক কন্যা। পুত্রদ্বয় বামাচরণ ও গুরুচরণ এবং কন্যা গৌরসুন্দরীদেবী ( মতান্তরে গোলাপসুন্দরী দেবী ) । বামাচরণ নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যান। গুরুচরণের পুত্র উমেশচরণও নিঃসন্তান ছিলেন।
এই উমেশচরণ জমিদার ছিলেন বলে তাকে উমেশচরণকে শর্ম্মাকে রাজা উমাচরণ রায় বলেও ডাকা হত। উমেশচরণ পিসি গোলাপসুন্দরীর পুত্রদ্বয় ব্রজনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও দীননাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে দত্তক গ্রহণ করেন। এই ব্রজনাথই বর্তমান বন্দ্যোপাধ্যায় বংশের আদিপুরুষ।
                       উমেশচরণ বা রাজা উমাচরণ সাঁওতাল বিদ্রোহে সাঁওতালদের হাতে নিহত হন। সাঁওতালরা সারেন্দার  দিকে এগিয়ে আসলে উমেশচরণ মা দ্বারবাসিনীর কাছে যান। মা দ্বারবাসিনী তখন সাঁওতালদের তৈরি বাঁশের ছাতা ঢাকা থাকত।
মা উমেশচরণকে নিজের ছাতার নিচে তাকে লুকোতে বলেন। উমেশচরণের বুদ্ধি তখন কৃতান্তে ঘিরে রেখেছে। তিনি মাকে বললেন, “হে মা দীনদয়াময়ী, তোমার কথায় আমার মন প্রবোধ পাচ্ছে না । আমার দৃঢ় বিশ্বাস তোমার ছাতার তলায় বসে থাকলে সাঁওতালদের হাতে নিঘঘাত কাটা পড়ব। তুমি অন্যকিছু কর মা।”
                মা তখন মৃদু হেসে বললেন, “তাহলে তুমি তোমার উঠোনের ধানঘরে লুকিয়ে থাক, সেখানে তোমার কোনও বিপদ হবে না। ”   উমেশচরণ  মা দ্বারবাসিনীর সে কথাতেও বিশ্বাস করলেন না। আগেই তিনি পরিবারের সকলকে নিরাপদস্থানে পাঠিয়ে দিয়েছেন। এখন রাহাখরচ হিসাবে একঘটি মোহর নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। রাস্তায় সাঁওতালদের হাতে নিহত হলেন তিনি।
                             মা দ্বারবাসিনী ঠিক কথাই বলেছিলেন। সাঁওতাল বিদ্রোহীরা বড়রাস্তা কখনো ছাড়েনি, সুতরাং মা দ্বারবাসিনীর ছাতার তলায় বা ধানঘরে উমেশচরণ নিরাপদেই থাকতেন।
এছাড়াও দ্বারবাসিনী সন্মন্ধে আরেকটি গল্প আছে। একবার এক মস্তবড় সাধক দ্বারবাসিনীতে আসেন। বহুদিন থাকার পর অন্যত্র যাবার জন্য ইচ্ছা হয় তার।
তখন তিনি মা দ্বারবাসিনীকে সঙ্গে নিয়ে যেতে মনস্থ করেন। মা প্রতিবাদ করলে লড়াই শুরু হয়। মা যতবার সেই সাধকের মাথা কেটে ফেলেন ততবারই মাথা জোড়া লেগে যায়। তখন কুসুমবৃক্ষের তলায় অবস্থানকারী ভৈরব কুকুর দিয়ে সাধকের দেহে প্রস্রাব করিয়ে দেন। এতে দেহ  অশুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় মাথা আর জোড়া লাগে না।
                  মৃত্যুকালে সাধক মা দ্বারবাসিনীকে শাপ দিয়ে বলেন, “আমি তো মরবই মা, কিন্তু আজ হতে আমার রক্তে তোর ভোগ হবে।”  সেদিন হতে সেই সাধকের সমাধি হতে জলের স্রোতা বের হয়ে কাঁদরের সৃষ্টি করে। এই কাঁদরের জলেই মায়ের ভোগ হয়।
একবার হেতমপুরের রাজা এসে মায়ের ভোগের জন্য খাঁটি দুধের পায়েস তৈরি করতে বলেন। গরম ফুটন্ত পায়েস হতে মাগুরমাছ লাফিয়ে পড়ে। রাজা নিজের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন। “
                ভটচায মশাই শেষ করতেই খাবারের ডাক এল। গরম গরম মাছের ঝোল, ফুলকপিপোস্ত, চাটনি আর ভাত। খেয়েদেয়ে একটু বিশ্রাম করে নিলাম। রাতের বেলায় বেরোবো অভিযানে। আমাদের ধারণা যদি ঠিক হয় তবে আজি একটা কিছু হবে।
রাতের বেলায় আমরা চারজন চলেছি দ্বারবাসিনী মন্দিররের উদ্দেশ্যে। আমাদের হাতে টর্চলাইট আর লাঠি। বিক্রমের হাতে পিস্তল। অঘোরবাবু  সবার পেছনে চলেছেন। তিনি ফিসফিসে গলায় বললেন, “আমাদের পেছনে কেউ আছে মশাই।”
                 “আপনি এগিয়ে চলুন। যে আছে সে এখন দেখা দেবে না।” বিক্রম উত্তর দিল। কিন্তু অঘোরবাবুর কোনও উত্তর পাওয়া গেল না। বিক্রম পেছন দিকে টর্চের আলো ফেলতেই দেখল অঘোরবাবু নেই। দু’চারবার হাঁকপাড়তেই  অন্ধকার হতে একটা উত্তর এল, “আমি এখানে মশাই, নদীর বালিতে…. “
এদিক ওদিক খুঁজতেই অঘোরবাবুকে দেখা গেল বারো তেরো ফুট নীচে বালিতে পড়ে আছেন। আসলে হয়েছে কি আমরা এগিয়ে চলেছিলাম  নদীর ধার বরাবর। হঠাৎ একটা জায়গায় অন্ধকারে রাস্তা ঠিক করতে না পেরে গড়িয়ে পড়েন নদীগর্ভে। ভাগ্য ভালো পড়েছেন গড়িয়ে গড়িয়ে, তাও আবার গড়িয়েছেন নরম ঘাসের উপর। আমরা অনেক কষ্টে নদীগর্ভে নেমে অঘোরবাবুকে উদ্ধার করলাম।
                অঘোরবাবু চোখ বন্ধ করেই “বাঁচাও বাঁচাও” বলে চিৎকার করে চলেছেন। আমরা তাকে যত বোঝাবার চেষ্টা করি যে তিনি নিরাপদে আছেন ততই চিৎকার বেড়ে যায়। গত্যোন্তর না দেখে বিক্রম নদী হতে এক আঁজলা জল তুলে অঘোরবাবুর মুখে ঝাপটা মারলেন। অঘোরবাবুর ঘোর কাটলো। কিন্তু ততক্ষণে অন্য একটা কাণ্ড ঘটে গেছে।  প্লেটের মূর্তিগুলো উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে উঠেছে । এর অর্থ আশেপাশেই আরেকটা দেবীমূর্তি আছে। টর্চহাতে খুঁজতে লাগলাম।
কেন জানি না আমার মনে হচ্ছে লোকের তুলনায় টর্চের আলোর সংখ্যা মাঝে মাঝে বেড়ে যাচ্ছে। তাহলে কি…
যাইহোক নদীর বালি কুঁড়ে শেষ মূর্তিটা উদ্ধার করল বিক্রম। মূর্তিটার উপর টর্চের আলো ফেলতেই ভটচায মশাই বললেন, “দেবী ছিন্নমস্তা, রাহুর অধিষ্ঠাত্রি দেবী । নগ্না, মিথুনের উপর দাঁড়িয়ে নিজ মুণ্ড কেটে নিজেই সেই রক্ত পান করছেন। দুপাশে ডাকিনী ও যোগিনী। সম্পূর্ণ গোমেদের তৈরি। “
                  বিক্রম ছিন্নমস্তা মূর্তিটি প্লেটে বসিয়ে দিতেই নয়টা মূর্তি হতে আলোর রেখা বেরিয়ে এসে একটা জায়গায় মিলে একটা কালিকামূর্তি গঠন করল। ওই রুপ দেখে ভয়ে আমাদের অন্তরাত্মা শুকিয়ে গেল। সেই কালিকামূর্তি শূন্যেই স্থির রইল। প্লেটটা মাটির তলায় ঢুকে যেতে লাগল। আর তার কিছুক্ষণ পরেই সেই গর্ত হতে বেরিয়ে এল নয়টা স্বচ্ছ স্ফটিক নির্মিত মানবকরোটি।
প্রত্যেকটা করোটির ভেতরে রয়েছে বিভিন্ন বর্ণের তরল। অঘোরবাবু হাঁ করে তাকিয়ে আছেন সেদিকে। চোখের পলক পড়ে না। বিক্রম বলল, “কি দেখছেন অঘোরবাবু, খুলিগুলোতে যে সব তরল রয়েছে সেগুলো যে সে তরল নয়, জৈব অস্ত্রের বীজ। ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর সব জীবাণু ভাইরাস। আর এগুলোর জন্যই আমাদের পেছনে লোক লেগেছে।”
                  বিক্রমের কথা শেষ হতে না হতেই গোটাচারেক লোক ঝাঁপিয়ে পড়ল আমাদের উপর। আমাদের মাটিতে শুইয়ে পিস্তল তাণ করে রইল তারা। আরেকটা লোক এগিয়ে এল আমাদের দিকে। লোকটার মুখে কালো মুখোশ। লোকটাকে দেখেই বিক্রম বলে উঠল,”তাহলে দেখা হয়েই গেল বন্ধু। “
লোকটা চমকে উঠল।  অঘোরবাবু বললেন, “বন্ধু মানে !”
বিক্রম শান্ত গলায় উত্তর দিল, “কেন অঘোরবাবু চিনতে পারছেন না ! আরে যার ঘরে আয়েশে কাটিয়ে এলেন। কি রে সুমন মুখ হতে মুখোশটা সরা।”
                  লোকটা ইতস্তত করতে করতে মুখ হতে মুখোশটা সরাল। আমরা চমকে উঠলাম। এ তো বিক্রমের সেই বাঁকুড়ার বন্ধু সুমন। বললাম, “সুমনবাবু আপনি !”
সুমন কর্কশকণ্ঠে জবাব দিল, “হ্যাঁ আমি। এই bio-weapon এর আসল হকদার। এটা অস্ত্রের বাজারে বিক্রি করলে কয়েকশো কোটি টাকার মালিক হব আমি। এই অস্ত্রের খোঁজ পেতে আমার দরকার ছিল বিক্রমকে।”
“তাহলে দীনুর উপর আক্রমণ করলে কেন ?” বিক্রম প্রশ্ন করল।
                সুমন বলল,” ও সব জানত। কিছুদিন ধরেই ও আমাকে ব্ল্যাকমেল করছিল, তাই ওকে শিক্ষা দেওয়া জরুরি ছিল। এখন তোমাদের কাজ শেষ। তাই তোমাদেরকে  আর বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই আমার। গো টু হেল !! “
লোকগুলোর হাতের পিস্তল গর্জন করে ওঠার আগেই ভটচায মশাই কি যেন দুর্বোধ্য ভাষায় কি যেন বিড়বিড় করে বলতে শুরু করলেন, আর অমনি উঠল এক বিশাল ঝড়। ভটচায মশাই চিৎকার করে বললেন মুখ দিয়ে ‘হুম্’ শব্দ করতে। আমরা মুখ দিয়ে ‘হুম্’ শব্দ করতে লাগলাম। ঘূর্ণি ঝড়টি সুমন সহ  গুণ্ডাদের সবাইকে নিয়ে সেই গর্তের ভেতরে ঢুকে গেল। আর তার সঙ্গে চিরকালের জন্য পাতালের অতলে তলিয়ে গেল মকরাক্ষের জৈবহাতিয়ার।
আমরা ঝেড়েঝুড়ে উঠতেই বিক্রম বলল, “এ কেমন করে সম্ভব হল ভটচায মশাই ?”
                ভটচায মশাই গম্ভীর গলায় বললেন, “তামার প্লেটের গায়ে একটা লিপি খোদাই করা ছিল সেটা নিশ্চয়ই দেখেছ। ওটা ছিল শঙ্খ লিপি। আমার পক্ষীসিদ্ধি থাকায় ওই লেখা পড়ে বুঝতে অসুবিধা হয়নি। ওতে লেখা ছিল জৈববিষকে আবার পাতালে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার মন্ত্র। সঙ্গে ওই পাতালমুখি ঝড়ের হাত হতে বাঁচার উপায়। এখন চল খালি হাতে। “
শেষ হাসিটা এবার বিক্রম হাসল। হো হো করে হাসতে হাসতে ব্যাগ হতে বের করল ইছাই ঘোষের চারখানা রত্ন। বলল,” চারজনের চারটে। এক একটার কোটি টাকার উপর দাম হবে। কি অঘোরবাবু অভিযান সফল কি না ? “
অঘোরবাবু দু’হাত তুলে নাচতে লাগলেন। সঙ্গে আমরাও যোগ দিলাম।  আনন্দম্ মহানন্দম্। ।
                                                                                        _শুভমস্তু_

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *