সিংহবাহিনী রহস্য শেষ পর্ব — সুব্রত মজুমদার

sahityalok.com
কতক্ষণ ঘুমিয়েছি মনে নেই। অঘোরবাবুর ডাকে ঘুম ভাঙল। অঘোরবাবু, দেবলীনা আর বিক্রম তিনজনেই এসে হাজির। অঘোরবাবুর হাতে চায়ের ট্রেন আর দেবলীনার হাতে ট্রেন ভর্তি পকোড়া।
চা আর পকোড়া খেতে খেতে আড্ডা জমে উঠল। অঘোরবাবু বললেন, “বুঝলেন মশাই, আজ সকালের দিকে একটা পাগল এসেছিল। সারা শরীর কাদায় মাখামাখি।
 
 
শুনলাম সন্মন্ধে নাকি সায়কের ছোটভাই। কি কোলাকুলি মশাই !”
অঘোরবাবুর কথা শুনে বিক্রম আর দেবলীনা হেসে উঠল। আমিও পাল্টা দিতে ছাড়লাম না, বিক্রমকে উদ্দেশ্য করে বললাম, “আমার কোলাকুলির কথা তো শুনলে, কিন্তু বিজয়ার আগেই অঘোরবাবুর সঙ্গে যে আমার প্রীতি সম্ভাষন হয়েছে সেটা তো শুনলে না। “
 
আমার কথা শুনে দেবলীনা আবার একদফা হেসে উঠলো। তারপর কোনক্রমে হাসি থামিয়ে বলল, “আমি কিন্তু এই ঘটনার চশমদীদ গবাহ্। ওহ্ অঘোরবাবু একদম কাদাতে মাখামাখি ! বিপদ বুঝে আমি কেটে পড়েছিলাম, নইলে আমার কি অবস্থা হতো সে একমাত্র ঈশরই জানেন। “
বিক্রম ট্রেন থেকে একটা পাঁপড় তুলে নিয়ে তাতে কামড় বসাতে বসাতে বলল, “একের পর এক অদ্ভুত অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটে চলেছে এখানে। অঘোরবাবুর ভাইপোর এখনও কোনও ট্রেস পাওয়া গেল না। তবে সিগনালটার অ্যানালিসিস করা গেছে। “
” কিছু সাংঘাতিক মশাই ?” অঘোরবাবু বিচলিত হলেন।
 
 
বিক্রম বলল, “CHILD FOUND. DADY FOUND. MAKE SURGERY. – কিছু বুঝলেন ?”
অঘোরবাবু ঘাড় নাড়লেন। দেবলীনা বিস্ময়ে চোখদুটো গোল গোল করে বিক্রমের দিকে চেয়ে রইলো। সারা ঘরে যেন এক অদ্ভুত নিস্তবদ্ধতা। ব্যাপার দেখে বিক্রম বলল, “বাপ ছেলেকে এক সাথে পেয়েছে ওরা, এবার অপারেশন করবে। আচ্ছা অঘোরবাবু, বিশালবাবু তো আপনার ভাইপো মানে ছেলের মতো। এমন নয়তো আপনাদের দুজনকে ধরবে আর কচাৎ করে কিডনি লিভার ফুসফুস কেটে নেবে।”
ভয়ে অঘোরবাবুর মুখ শুকিয়ে গল। তিনি অনেক কষ্টে বললেন, “কি জানি মশাই, চোখ ব্লাড এসবও নিতে পারে, ওদের বিশ্বাস নেই। আমাকে বাঁচান মশাই। “
 
 
অঘোরবাবুর কথা শুনে বিক্রম হো হো করে হেসে উঠল। তারপর বলল,”গোঁফজোড়া ছাড়া আর কিচ্ছুই নেবার মতো নেই আপনার শরীরে। নিশ্চিন্তে থাকুন, আমি থাকতে আপনার লিভারে কেউ হাতও দিতে পারবে না।”
   রাতের বেলা আরতীর শেষে বিক্রম অঘোরবাবুকে বলল,”আজ রাতে আমি ঠাকুরদালানের বারান্দায় শোব। সায়ক যদি মনে করে সঙ্গে থাকতে পারে। তবে রাতের বেলা একটু সতর্ক থাকবেন। আমি ডাকলেই যেন সময় নষ্ট না করে বেরিয়ে আসবন। “
 
 
অঘোরবাবু বিক্রমের কথায় সায় দিলেন। দেবলীনা বিক্রমের সঙ্গে থাকতে চেয়েছিল, কিন্তু বিক্রম পত্রপাঠ নাকচ করে দিয়েছে। সুতরাং ঠিক হল আমি আর বিক্রম ঠাকুরদালানের বারান্দায় শোব, অঘোরবাবু আর দেবলীনা রাত্রে রেডি হয়েই থাকবে। প্রয়োজন বুঝলে ওদের ডাকা হবে।
 
 
রাতের বেলা দুজনে শুয়ে শুয়ে অনেক গল্প হল। বিক্রম বলল তার ছেলেবেলার কথা। কথাপ্রসঙ্গে বিক্রমের সাসপেন্ড হওয়ার প্রসঙ্গ এল। বিক্রম বলল, “সে এক জঘন্য ষড়যন্ত্র সায়ক। মেদিনীপুরের একটা গ্রামে একই পরিবারের পাঁচজনের মার্ডার হয়েছিল। মা, বাবা, ছেলে আর বৌমা। বন্ধ দরজা জানালার ভেতরে পাঁচটা মৃতদেহ। সবাই নিজের নিজের ঘরে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। এখন প্রশ্ন বন্ধ ঘরে আততায়ী ঢুকল কিভাবে ? আর বেরোলোই বা কিভাবে ? স্থানীয় থানা রহস্য সমাধানে ব্যর্থ হয়। আমি তখন ওখানকার পুলিশ সুপার। মিডিয়া ঘটনাকে এমনভাবে সাজাল যে অপদার্থ সাব্যস্ত হলাম আমি। এরপর আরো নাটক, আমি নাকি দোষীদের আড়াল করছি। আর স্বাভাবিক ভাবেই সাসপেন্ড হলাম। লালফিতের ফাঁসে আজও সে কেস পেণ্ডিং। “
 
 
 
  কথা বলতে বলতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি তা মনে নেই। সকালে উঠেই আবার ব্যস্ততা। আজও রাত্রে একটা চান্স নিতে হবে। বিক্রমের কথামতো কাল রাত্রে কিছুই হয়নি। আজ কিছু এটা ঘটতে পারে বলেই বিক্রমের ধারণা।
আর বিক্রমের ধারণাই সত্যি হল। রাতের বেলা শুয়ে আছি, ঘুম প্রায় চলেই এসেছে, এমনসময় একটা খসখস শব্দ শোনা গেল। আমি উঠতেই যাচ্ছিলাম, কিন্তু বিক্রম আমাকে উঠতে বাধা দিল। ফিসফিসে গলায় বলল, “নাইটভিশন চশমাটা পরে নাও। শুয়ে শুয়ে মজা দেখো।”
 
 
 
আমাদের সাথে যে নাইটভিশন চশমা আছে সেটা ভুলে গিয়েছিলাম। চশমাটা পরে দেখতে থাকলাম। দেখলাম একটা লোক ধীরপায়ে এগিয়ে যাচ্ছে সিংহবাহিনী মূর্তির সামনে। এরপর অতি সাবধানে মূর্তিটা সরিয়ে বেদীর উপরের ঢাকনাটা সরাল। ঢাকনাটা সরাতেই ভেতর হতে একটা আলোকরশ্মি বেরিয়ে এল। সেই লোকটা অতি সন্তর্পনে ঢুকে গেল বেদীর ভেতরে।
 
 
বিক্রম অঘোরবাবুকে ফোন করে ডেকে নিয়ে আমার দিকে ঘুরে বলল, “লেটস গো।”
বেদীর কাছে পৌঁছে দেখলাম একটা সিঁড়ি নিচের দিকে চলে গিয়েছে। বিক্রমের পরামর্শমতো কানে শব্দ নিরোধক লাগিয়ে নিয়েছি। কারন এই ঠাকুরদালান হতে যে বিশেষ কম্পাঙ্কের তরঙ্গ বের হচ্ছে তা মস্তিষ্কের প্রভূত ক্ষতি করে দিতে পারে।
 
 
সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকলাম। সিঁড়ি যেখানে শেষ হয়েছে সেটা একটা পাতালঘর টাইপের। ঘরের আনাচে কানাচে পুরানো পুঁথিপত্র আর অ্যান্টিক জিনিসপত্রের সম্ভার। সবকিছুর উপরেই মাকড়শার জাল আর পুরু ধুলোর আস্তরণ। ঘরের এককোণে একটা টেবিলে একটা যন্ত্র হতে লাল সবুজ আলো জ্বলছে, আর তার সামনেই দাঁড়িয়ে সেই লোকটা। বিক্রম এগিয়ে গিয়ে লোকটার কানপাটিতে বন্দুক ধরে বলল, “আপনার খেলা শেষ ঠাকুরমশাই।”   লোকটা দু’হাত উপরে উঠিয়ে আমাদের দিকে ঘুরে দাঁড়াল।
 
 
 
এতক্ষণে অঘোরবাবু আর দেবলীনা চলে এসেছে। ঘরটার চারপাশে চোখবুলিয়ে অঘোরবাবু বললেন, “এ কি দেখছি মশাই, ছোটবেলায় মায়ের মুখে আমাদের পাতালঘরের গল্প শুনেছি, কিন্তু দেখিনি কোনোদিন। আরে মশাই, এ তো কামাল করে দিয়েছেন আপনি।”   এবার ঠাকুরমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “শেষকালে ঠাকুরমশাই আপনি…!”
বিক্রম বলল, “উনাকে উপরে নিয়ে যাওয়া যাক। এতক্ষণে পুলিশও চলে আসবে। “
 
 
 
ঠাকুরমশাইকে আর যন্ত্রটাকে উপরে উঠিয়ে আনা হল। পুলিশ চলে এসেছে। ঠাকুরমশাইকে পুলিশের হাতে হ্যান্ডঅভার করতেই ঠাকুরমশাই কেঁদে ফেললেন। বড়বাবু বললেন, “এমনিতে কবুল না করলে থানায় গিয়ে থার্ড ডিগ্রী দেবো।”   ভয়ে ডরে সবকিছু বলে দিলেন ঠাকুরমশাই। বাকি যেটুকু জানার সেটা জানা গেল পরেরদিন ঘটবিসর্জনের পর।
 
 
 
                                                              ~উপসংহার ~
ঘটবিসর্জনের কাজটা বিক্রমই করল, কারণ ঠাকুরমশাই এখন পুলিশ কাস্টিডিতে। সিঁদুরখেলা, মিষ্টি বিতরণ ইত্যাদি শেষ হলে সবাই মিলে বিক্রমকে চেপে ধরলাম। বললাম,”ডিটেইল অ্যানালিসিসটা এবার কর তো গুরু ! আর কেস যদি সলভই হল তবে বিশালবাবুই বা গেলেন কোথা ?”
 
 
বিক্রম বলল, ” বিশালবাবুই হলেন  নাটের গুরু। নাসাতে কাজ করার সময় একটা গোপন প্রজেক্টে হাত দেন বিশালবাবু, – আলোর চেয়েও দ্রুত গতিতে চলে এমন এক স্পেসশিপইঞ্জিন। আর এর প্রধান জ্বালানি হল ‘পোলোনিয়াম-210’। বিশালবাবু যখন সাফল্যের একদম কাছাকাছি, ঠিক তখনই আন্তর্জাতিক মাফিয়াদের নজরে পড়ে যান তিনি। বিপদ বুঝে গবেষণাপত্র সমেত দেশে চলে আসেন। 
 
 
এখানে এসে অনেকটাই অস্বস্তিতে ছিলেন তিনি। হঠাৎই একদিন মা সিংহবাহিনীর বেদীর নিচে পাতালঘরের সন্ধান পেয়ে যান তিনি। ফলে গবেষণাপত্র আর যন্ত্রটাকে রাখার একটা জায়গা পেয়ে গেলেন। কিন্তু যন্ত্রটায় একটা ত্রুটি ছিল, যখন তখন চালু হয়ে যেত যন্ত্রটা। আর এটাই কাল হল। ফ্রিকুয়েন্সির দৌলতে মাফিয়ারা এই বাড়িটাকে সনাক্ত করে।
 
এবার আসি ঠাকুরমশাইয়ের কথায়। একটা মোটা অঙ্কের টাকার লোভে মাফিয়াদের দলে যোগ দেন ঠাকুরমশাই। সেদিন পুজোর সময় যন্ত্রটা হঠাৎ চালু হয়ে গেলে ঠাকুরমশাই অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। ফলে সন্দেহ বিশ্বাসে পরিণত হয়। এবার বিশালবাবুকে অপহরণের ছক কষা হয়। কিন্তু আমি গিয়ে সব ভণ্ডুল করে দিই। “
” মানে ! ” অঘোরবাবু আর দেবলীনা একসঙ্গে বলে ওঠে।
 
 
মিষ্টির হাঁড়ি হতে একটা রসগোল্লা তুলে মুখে পুরে দিয়ে চিবোতে চিবোতে বিক্রম বলল,”মর্গ হতে একটা লাশ জোগাড় করে বিশালবাবুর মৃত্যুর ঘোষণা করে দিই। “
আমি আর থাকতে না পেরে বললাম,” তাহলে বিশালবাবু কই ?”
বিক্রম দরাজ গলায় ডাকল, “কি হে ইঞ্জিন মশাই… গেলে কই ?”
বিক্রমের ডাকাডাকি শেষ না হতে হতেই সেই পাগলটার আবির্ভাব হল। মুখে সেই গান,
 
 “উলুক ঝুলুক মগের মুলুক দিয়ে দিলাম তোমায় সুলুক,
আমায় পাগল যতই বলুক পাগল আমি না।
দুই ঘরে তিন ভাইয়েরই বাস, ভেতর ঘরে দু’ জন হতাশ, 
বাহির ঘরে যেজন ঘোরে তারে চেনে সারা জমানা ।
দুইজনে তিন পুত্র ধরে, পুত্র আবার বিনাশ করে
সুব্রত মরে তাদের ডরে, তারা ভয়ঙ্করের কারখানা।
যেজন সুজন জ্ঞান ধরে তাদের লয়ে বসত করে,
অসাধ্য সাধে তাদের বরে, অসাবধানে ধুম্-তা-না-না।”
 
আমি তো একরকম তেড়েই গেলাম। হতচ্ছাড়া, আমার জামাকাপড় নষ্ট করেছে কাদা মাখিয়ে। বিক্রম আমাকে অনেক কষ্টে আটকালো।
উলুক ঝুলুক খ্যাপা ওরফে ডঃ বিশাল বন্দ্যোপাধ্যায় অঘোরবাবুর পায়ের ধুলো নিলেন। অঘোরবাবু তাকে একটা মিষ্টি খাইয়ে দিয়ে বললেন,” সুখে থাক বাবা,  যেকোনো বিপদ যেন তোমাকে না স্পর্শ করে, অনেক অনেক সুখে থাক।”   অঘোরবাবুর দু’চোখে দিয়ে জলের ধারা গড়িয়ে পড়ল।
 
 
 
 
 
                                                                             ~সমাপ্ত ~

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *