Nikhil Ranjan Guha

এক ভন্ড সাধুর কীর্তি
নিখিল রঞ্জন গুহ

এক দীর্ঘদেহী সাধু বাবার আগমনে কয়েক গ্রামে সারা পড়ে গিয়েছে । তাঁকে নিয়ে মানুষের ঔৎসুক্যের যেন শেষ নাই । সকলের মুখে তাঁর নানা অলৌকিক ক্ষমতার কথা । গ্রামে গ্রামে তাঁকে নিয়ে রীতমতো চর্চা শুরু হয়ে গিয়েছে । মা মাসিদের মধ্যে এখন তিনি নিত্য আলোচনার বিষয় । মধ্যাহ্ন শেষে অথবা সান্ধ্য মজলিসে গৃহবধূরা মিলিত হলেই পান চিবোতে চিবোতে তাঁকে নিয়ে কথা হয় ।

কারো কাছে তিনি ধন্বন্তরি, সিদ্ধ পুরুষ । কেউ কেউ তাঁকে সাক্ষাৎ ভগবান মনে করে । গ্রামের কালীমন্দির নাকি সেই জটাধারী সন্ন্যাসীর বর্তমান ঠিকানা । সেখানে ঠাকুরও নাকি জাগ্রত । বহু বছরের পুরাতন মন্দির । নদীর ধারে সেই মন্দিরে নিত্যদিন পুজো হয় । ভক্তদের সেখানে নিয়মিত যাতায়াত । সামনেই দাঁড়িয়ে আছে বহু প্রাচীন এক বট বৃক্ষ । নেমে আসা অসংখ্য ঝুরিই এখন তাঁর অবলম্বন । ঝুরির ভিড়ে আসল গাছটাকে খুজে পাওয়া ভার । বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে শাখাপ্রশাখায় কলেবরে সে সংসার পেতে বসেছে । দূরদূরান্ত থেকে আসা পুণ্যাগ্রাহীরা সেখানে তাঁর ছাওয়ায় আশ্রয় নেয়, বিশ্রাম করে । সাধু বাবা নাকি ভক্তের চোখের দিকে তাকিয়েই মনের কথা পড়তে পারেন । কুল কুল শব্দে নূপুরের ছন্দ তুলে পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে নদী ।

বাতাসে ভেসে আসে ডেউ ভাঙা ছলাৎ ছলাৎ । শিষ্য শিষ্যারা তাঁর আর্শীবাদ নিতে যায় সেখানে । ডোরাকাটা বাঘের ছালের আসনে উপরবিষ্ট ধ্যানমগ্ন সেই সন্যাসীকে সাক্ষাৎ করে ভক্তরা ধন্য হয় । আগুন্তুকের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা দাত বের করা বাঘের মুণ্ডটা দেখলেই ভেতরটা যেন কেমন করে ওঠে । ডানদিকে মাটিতে দন্ডায়মান মস্ত বড় একটা ত্রিশূল । ফলাগুলি তেল সিঁদুর মাখা, লাল টুকটুকে । জটাধারী সাধুবাবার দর্শনার্থীর সংখ্যা দিন দি্ন বাড়তে থাকে । তিনি নাকি ভূত ভবিষ্যৎ বলতে পারেন । শিব ভক্ত সেই সাধুর মন্ত্রপূত তাবিজ নাকি কথা বলে ।

এ গ্রাম থেকে সে গ্রাম তাঁর সেই অলৌকিক ক্ষমতার কথা এক মুখ থেকে শত মুখ হয়ে ছড়িয়ে পড়তে লাগল । সন্তানহীনা রমণী, সন্তানের মুখ দেখার জন্য আর্শীবাদ ভিক্ষা করে । কেউ ঘর ভাঙা স্বামীর মন পাওয়ার জন্য মন্ত্রপূত মাদুলি নিয়ে যায় ।

মতিভ্রম পুত্রের মতি ফেরাতে মায়েরা তাঁর কাছে হত্যা দিয়ে পড়ে থাকে । রোগগ্রস্ত মানুষ ভিড় করে । সাধু বাবা কাউকে নিরাশ করে না । সকলেই তাঁর কাছে আর্শীবাদ পেয়ে ধন্য হয় । খুশি মনে ফিরে যায় । সাধুবাবার গায়ের রং যেন কাঁচা সোনা,উজ্জ্বল চোখ দুইটি জ্বল জ্বল করে । দেখলেই ভক্তি আসে । দর্শানার্থীদের দেওয়া ফলমূল,মিষ্টান্ন আর নানা উপাচারে ভরে উঠতে লগল তার থান । তাঁর পদধূলি নিতে সকলেই ব্যস্ত । কপালে ইয়া বড় একটা তিলক । গায়ে লাল শালুর কৌপিন । একহাতে কমণ্ডলু আর এক হাতে ত্রিশূল । মুখমণ্ডল শ্মশ্রুমণ্ডিত ।

তাও তো দশ বারো দিন হয়ে গেল, তাঁর সাক্ষাৎ নাই কেন ? সাধুবাবাকে যেন বেশ বিচলিত মনে হচ্ছে । তাঁর আবাস তো এই গ্রামেই । সে যে তাঁর জন্যই অপেক্ষা করছে । প্রতিদিন এত ভক্তের আনাগনা ! তবে কী তাঁর আগমন বার্তা তাঁর কাছে পৌঁছায়নি ? সেটাই বা কী ভাবে সম্ভব ? তাঁর পক্ষে তো আর এখানে থাকারও উপায় নেই । কতদিন সে অপেক্ষা করবে ? তবে কী তাঁর সাথে দেখা না করেই তাঁকে ফিরে যেতে হবে ?

সে বেশ ব্যস্ত হয়ে উঠেছে । না, তাঁকে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি । তাঁর মনের যখন এই অবস্থা তখন সেই নারী সত্যি একদিন এসে উপস্থিত হয়েছিল । তাঁকে চিনতে তাঁর ভুল হয়নি । চোখ ঝলসানো সেই রূপ । যেন স্বর্গ থেকে নেমে আসা অপ্সরা । কপালে জ্বল জ্বল করছে সিঁদুর, পড়নে লাল পেড়ে গরদের শাড়ি । বোঝাই যায় তিনি কোনও এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের গৃহবধূ । বয়স কত হবে ? খুব জোর কুড়ি বা একুশ । এক কথায় বলা যায় পূর্ণ প্রস্ফুটিত এক নারী ।

সাধু জোরে জোরে বলে উঠলেন, ব্যোম,ব্যোম ভোলেনাথ । ব্যোম শঙ্কর । মা তুই এসেছিস ? আমি যে তোর জন্যই অপেক্ষা করছি ।

সে উত্তর দিয়ে বলেছিল, বাবা আপনি জানতেন আমি আসব ?

জানব না কেন রে ? কত দূর দূর থেকে ভক্তরা আসছে, তুই কী না এসে পারিস ? তুই আমার স্মরণ নিবি তা আমি জানি । গুরু যদি তাঁর ভক্তের মনের খবরই নাই রাখল তবে আবার সে গুরু হল কী করে ?

সেই রমণী জবাব দিয়ে বলেছি্‌ল, জানি না এই পাতকীকে ভগবান তাঁর পায়ে স্থান দেবেন কিনা । এই সংশয় আমাকে এই কটা দিন তিষ্ঠতে দেয়নি । সত্যি বলতে কী এই পবিত্র থানে আসতে আমার ভয় হয় ।

ব্যোম শঙ্কর, বাপের কাছে মেয়ে আসবে তার আবার পাপপুণ্যি কীরে ? গঙ্গা যেমন সব কিছুকে ধারণ করে ভগবানও তাই । তোর পাপ তিনি নিজেই ধারণ করবেন । শিবকে নীল কন্ঠ কেন বলে জানিস ? বিশ্বের সকল হলাহল তিনি নিজের কন্ঠে ধারণ করেছিলেন, তাই তো তিনি নীলকন্ঠ ! তাঁর কাছে পাপীতাপী সব সমান । সকলেই তাঁর সন্তান ।

মহেশ্বর কি এই পাতকিনীকে ক্ষমা করবেন ?

কেন করবে না ? তিনি তো বিষহর !

আমি মুক্তি চাই । বাবা আমাকে পথ দেখাও ।

সাধুবাবার প্রখর অনুসন্ধানী উজ্বল চোখ দুইটি যেন সেই নারীর পটল চেরা চোখের ওপর এসে ক্ষণিকের জন্য স্থির হয়ে গেল । মনে হল, তাঁর মনের গভীরে সে যেন কিছু একটা হাতরে বেড়াচ্ছে । স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে বশীভূত সেই নারী ।

সাধুবাবা জবাব দিয়ে বলেছিল, পথ দেখানোর আমি কে ? যা করার তিনিই করবেন । তিনিই তোকে পথ দেখাবেন । আমি তো নিমিত্ত মাত্র ।

সাধুবাবার পায়ে লুটিয়ে পড়েছিল সেই রমণী । কাতর কন্ঠে বলে উঠল, আমাকে আর্শীবাদ করুন, আমি যেন ঠাকুরকে তুষ্ট করতে পারি ।

পারবি রে পারবি । আমি তোকে আর্শীবাদ করছি, ভগবান তোকে মুক্তি দেবে । কাল তুই সূর্য ওঠার আগে স্নান সেরে ভোলানাথের স্মরণ নিতে এই থানে আসবি । সাথে দুইটা ধুত্রা ফুল, চন্দন আর আর সিঁদুরের একটা নতুন কৌটা নিয়ে আসিস ।

সেখানে কাগজে নিজের হাতে তোর আর তোর স্বামীর নাম লিখে বন্ধ করে রাখিস । লাল কাপড়ে জড়িয়ে রাখবি । সেই সিঁদুর আমি ভগবানের কাছে উৎসর্গ করব । তোর মনের সব গ্লানি দূর হবে ।

সে কথা রেখেছিল । পরের দিন সূর্য ওঠার আগেই এসেছিল সে । তাঁর নিষ্ঠাতে কোনও অভাব ছিল না । সেদিনও তাঁর পরনে ছিল দামি গরদের শাড়ি । কপালে জ্বল জ্বল করছে ভোরের সূর্য়ের মতো সিঁদুরের টিপ । চোখেমুখে উদ্বিগ্নতার ছাপ ।

সাধুবাবা তাঁকে দেখেই ভোলা নাথের স্মরণ নিয়ে উচ্চস্বরে বলে উঠলেন, ব্যোম ভোলে নাথ,ব্যোম ব্যোম, বোম শঙ্কর । সূর্য দেবতার তখন সদ্য ঘুম ভেঙ্গেছে । ক্লান্ত তারাগুলি ঘরে ফিরেছে । পূব দিগন্তে তখন কুসুম আলোর আভায় ছড়িয়ে পড়া স্নিগ্ধতা । বাতাসে ভেসে আসছে ঘুম ভাঙা চড়ুই পাখির কিচিরমিচির শব্দ । মাঝে মাখে শালিক পাখির ডাক । বহু দূর থেকে ভেসে আসা কোকিলের কুহু কুহু তান ।

নরম কচি ঘাসের উপর পা রেখে এগিয়ে আসা রমণী সত্যিই অপরূপা । তাঁর মধ্যেও এত পাপ ! হাতে তামার রেকাবীতে পরিপাটি করে সাজানো ফুল, চন্দন,একটা নতুন সিঁদুরের কৌটা । এক বাটি মিষ্টান্ন আর সন্দেশ । সে বলেছিল, বাবা আপনার স্মরণে এই সামান্য অর্ঘ, গ্রহণ করে আমাকে কৃতার্থ করুন ।

তোর সব জ্বালা,দুঃখ আজ এই মহেন্দ্রক্ষণে ভোলানাথের পায়ে উৎসর্গ কর । পূর্ দিকে মুখ করে সূর্য দেবতাকে সাক্ষী রেখে মনে জমে থাকা ক্লেদ ভোলানাথের পদমূলে নিবেদন কর । আমাকে সব বল । কিছু গোপন করিস না । চোখ বন্ধ করে নিঃসঙ্কোচে প্রাণ খুলে তুই তোর সমস্ত কথা আজ ঠাকুরের কাছে উজার করে দে । মহেশ্বরের কাছে নিজেকে সমর্পণ কর । আমি ধ্যানে বসছি । দেখিস ধ্যানের যেন কোনও বিঘ্ন না ঘটে । পেছন ফিরে তাকাস না । সময় হলে আমিই তোকে বলব । সেদিন সে এতদিনের পাথর চাপা মনের কথা মহেশ্বরের কাছে নিবেদন করেছিল । কোনও কথাই সে গোপন করেনি । সত্যিই সে যেন আজ নিজেকে হালকা বোধ করেছে ।

সাধু বাবাও যেন বেশ ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন ।

তিনি পরের দিন তাঁকে একই সময়ে আসতে বলেছিলেন । সেদিনও পুজো উপচার নিয়ে এসেছিল সেই রমণী । সাথে ছিল মিষ্টান্ন । সাধুবাবা তাঁর মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, আজ থেকে তোর পাপ মুক্তি ঘটল । তিনি আরও বলেছিলেন,মা, তোকে একটা মন্ত্রপূত তাবিজ ধারণ করতে হবে । আমি নিজে হাতেই তা পড়িয়ে দেব । তিন দিন পর আবার আসবি ।

সাবিত্রীদেবীর কথা থেকে উঠে এসেছিল, এক রোম হর্ষক অজানা কাহিনি । ব্যার্থ প্রেম রসে সিক্ত সেই কাহিনি । নীলমাধবের সাথে সাবিত্রীদেবী বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল সামাজিক নিয়মেই । হিরালাল সামন্তের একমাত্র ছেলে নীলমাধব । দরিদ্র পরিবারের মেয়ে সাবিত্রিদেবী যেন গোবরে পদ্ম ফুল ! তাঁর রূপের বাহারে বাড়িতে ঘটকের যাতায়াত শুরু হয়ে গিয়েছিল যখন তাঁর বয়স মাত্র দশ কী বারো । সাবিত্রীর বাবা চন্দ্রশেখর কোনও দিনই সুবিধার মানুষ ছিলেন না । লোকের মাথায় হাত বুলিয়ে চলাই তার স্বভাব । একমাত্র মেয়ে সাবিত্রী যেন তাঁর পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা । নীলমাধবদেরর অবস্থা মন্দ না । জমিজাতি নিয়ে গ্রামের অনেকের থেকেই তাঁর অবস্থা ভালো । খেত খামারের কাজ নিয়ে ব্যস্ত সে । রাখি মালেরও কারবার আছে । সেই দিক থেকে চন্দ্র শেখরের কাছে নীলমাধব জামাই হিসেবে স্বর্গ । বয়সটাই যা একটু বাধা । মেয়ের সাথে বয়সের ফারাকটা যা একটু বেশি । চোখে পড়ার মতো ।

তবুও বিয়েটা হয়েছিল । চন্দ্রশেখরকে এক কানাকড়িও খরচ করতে হয়নি । বরং ভালোই আমদানি হয়েছিল তাঁর । তাছাড়া মেয়ের বাড়ি যাতায়াত তো ছিলই । বেশ কেটে যাচ্ছিল । চন্দ্রশেখরের ছন্নছাড়া অভাবী পরিবারের সাথে নীলমাধবের পরিবার কোনও দিক থেকেই মানানসই ছিল না । এই সম্পর্ক গড়ে অঠার মূল ভিত্তিই ছিল সাবিত্রীর রূপ । ভেতরে ভেতরে নীলমাধবের একটা গর্বও ছিল । সুন্দরী বৌ বলে কথা ! বৌয়ের যত্ন আত্তিরেরও খামতি ছিল না । বলতে গেলে সুখের সংসার । গ্রামে ঘোষেদের পরিবারটাও কম যায় না । জমিজিরেত,খেত খামার নিয়ে প্রায় সমান সমান । তাঁদের সাথে নী্লমাধবদের সম্পর্কও কয়েক পুরুষের । সেই বাড়ির ছোট ছেলে শশীকান্ত তাঁর বন্ধুও বটে । বয়সে অনেকটা ছোট হলেও বন্ধুত্বে তা বাধা হয়ে দাড়ায়নি ।

হ্ঠাৎ করেই যেন সামন্ত পরিবারে ছন্দ পতন ঘটল । ছেলে নীলমাধবের অকাল মৃত্যুতে পরিবারে অন্ধকার নেমে এলো । তাঁর পক্ষে এই বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠা সম্ভব ছিল না । কচি মেয়ে সাবিত্রীর মুখের দিকে শ্বশুর হিরালাল তাকাতে পারে না । সে বৌমাকে নিজের মেয়ের মতোই দেখে এসেছে । ছেলের মৃত্যুর পর সাবিত্রীকে আবার তিনি বিয়ে দিয়েছিলেন । নিজের মেয়েকে যে ভাবে দেওয়া হয় ঠিক সেইভাবেই দিয়েছিলেন । টাকা পয়সাও খরচ করেছিলেন ভালো । তত দিনে দেশে বেধবা বিয়ের আইন পাস হলেও কাজটা খুব সহজ ছিল না । সুবিধা করে দিয়েছিল নীলমাধবের বন্ধু শশীকান্ত । পাত্র হিসেবে এগিয়ে এসেছিল সে । তবুও সেই বিয়েতে বাধা কম আসেনি । সমাজের ময়মাতব্বরা হিরালালের এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি । মেয়ের বাপ চন্দ্রশেখেরও ঝোপ বুঝে কোপ মারতে উঠেপড়ে লেগেছিল । এই নিয়ে রীতিমতো গ্রাম দুইটি শিবিরে ভাগ হয়ে গিয়েছিল । তবে হিরালাল সবই সামলে নিয়েছিলেন ।

শশীকান্তদের পরিবারটাও বর্ধিষ্ণু পরিবার । প্রভাব প্রতিপত্তিতে তারাও কম যায় না । টাকা পয়সাতেও বেশ ক্ষমতাশালী । পাত্রপাত্রীরাও সম্মত । তাই শেষপ্রর্যন্ত নির্বিঘ্নেই সব মিটে গিয়েছিল । সাবিত্রীদেবীর নতুন সংসার তাঁকে বৈধব্য থেকে মুক্তি দিল । শ্বশুর হিরালালও খুশি । নীলমাধবের মৃত্যুর রহস্যও ধীরে ধীরে ঢাকা পড়ে গেল । সকলেই জানল,সে আত্মহত্যা করেছে । কিন্তু কেন ? সেই উত্তর অজানাই থেকে গেল । বেশ কবছর পর সেই ঘটনা আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠলে সব যেন কেমন হয়ে গেল । একদিন সেই মৃত্যু রহস্য উন্মোচিত হয়েছিল সাবিত্রীদেবী্র মুখে । তাঁর দেওয়া বিবরণে উঠে এসেছিল এক ব্যর্থ দাম্পত্য জীবনের করুন আখ্যান । ছত্রে ছত্রে আত্মবিলাপের সুর ফুটে উঠেছিল তাঁর সেই বিবরণে ।

সাধুবাবার কথামত তিনদিন পর আবার আসতে হয়েছিল সেই রমণীকে । তখন ভরের আলোয় রং বদলের খেলা শুরু হয়েছে ।

সাধু বাবা তাঁকে বলেছিলেন, মা, এদিকে আয়,বা হাতটা এগিয়ে দে । হর হর ব্যোম ব্যোম, ব্যোম ভোলেনাথ,ব্যোম শঙ্কর ধ্বনিতে প্রভাতি সকালে চারদিকের নিস্তব্ধটা ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেল ।

গাছের পাখিরা ছোটাছুটি শুরু করে দিল ।

সাধুবাবা একমনে বিড় বিড় করে তখনও মন্ত্র পড়ে চলেছে । হাতে একটা তাবিজ । দেখতে চৌকানা তাগার মতো । তামা দিয়ে তৈরি । লাল সুতায় বাঁধা । মন্ত্রপূত সেই তাবিজকে ধূপধুনা দিয়ে পুজো করে সাবিত্রী বা হাতের বাজুতে পড়িয়ে দিতে দিতে সাধুবা্বা বলেছিল, সাবধানে রাখিস । দেখিস এটা যেন কখনো স্থানচ্যুত না হয় । জল থেকে বাঁচিয়ে রাখিস । অযত্ন হলে দোষ লাগবে । তাবিজের গুণ নষ্ট হবে । ঠাকুর রুষ্ট হবেন । অমঙ্গল ঘটবে ।

ভক্তি ভরে সাধুবাবাকে প্রণাম করে সেদিন সে ফিরে গিয়েছিল । সেই দিনটাই সাধুবাবার শেষ দিন । সেই সাধুবাবাকে আর দেখা যায়নি ।

তারপর অনেক দিন কেটে গেছে । ঘোষ পরিবারে তখন খুশির হাওয়া । বাড়িতে নতুন অতিথি এসেছে । চাঁদ পানা মুখ । মায়ের সবটাই নিয়েই যেন ভূমিষ্ট হয়েছে সে । সাবিত্রী তাঁর নবজাত পুত্রকে নিয়ে ব্যস্ত । বাড়িতে তাঁর আদরও বেড়ে গেল । ভরা সংসারে সে তখন মধ্যমণি । শশীকান্ত বাবা হয়েছে । তাঁর মা বাবা দুজনেই খুশি । শাশুড়ি মা সোনার বালা দিয়ে নাতির মুখ দেখলেন । অন্নপ্রাশনের অনুষ্ঠান্টাও হয়েছিল জমকালো । হিরালাও এসেছিল । তবে পুত্রশোকে ভেঙে পড়া নীলমাধবের মা সারদাদেবী আসতে পারেননি । বাড়িতে অভ্যাগতদের যাতায়তও বেড়ে গেল । আকস্মিক ভাবেই যেন একদিন সেই ঘোষ পরিবারে অন্ধকার নেমে এলো । ইতিমধ্যে সেই গ্রামে বারকয়েক পুলিশ এসেছে । একদিন সাবিত্রী আর তাঁর বর শশীকান্তকে পুলিশ ধরে নিয়ে নিয়ে গেল । মানুষের কৌতুহলের শেষ নাই । গ্রাম শুদ্ধ মানুষের মধ্যে ফিসফিসানি শুরু হয়ে গিয়েছে । কৌতূহলের ধর্মই হল যতক্ষণ না তার নিরসন হচ্ছে ততক্ষণ সে নানাভাবে পল্লবিত হতে থাকে এবং বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়ায় , এক মুখ থেকে সহস্র মুখে ছড়িয়ে পড়ে । এই ক্ষেত্রেও যেন তার ব্যতিক্রম ঘটল না । বড় পরিবার, তাই তাঁকে নিয়ে মানুষের কৌতূহলও বেশি ।

অবশেষে গ্রামবাসীর সেই কৌতূহল দূর হয়েছিল । আদালতে এক খুনের ঘটনা শুনিয়েছিল এক তরুণ পুলিশ আধিকারিক । মহামান্য আদালতের সামনে এক নিখুত চিত্র তুলে ধরেছিলেন তিনি । সাবিত্রীর শ্বশুরমশায় শশীকান্তের বাবা শিশির ঘোষ কলকাতা থেকে নাম করা ব্যারিষ্টারকেও লাগিয়েছিলেন সেই মামলায় । ফল হয়নি । ব্রিটিশ শাসন । কঠিন সাজা হয়েছিল তাঁদের । শশীকান্তকে ফাঁসি আর সাবিত্রীদেবীকে যাবজ্জীবন কারা দণ্ডের সাজা শুনিয়েছিল আদালত । সাবিত্রী সমস্ত ঘটনাই প্রথমে অস্বীকার করেছিল । সে জানত না মন্ত্রপূত সেই তাবিজের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এক অজানা রহস্য । তাঁর প্রাণভ্রমর । সেই আধিকারিক তখন নীলমাধবের মৃত্যু রহস্যের পর্দাগুলি এক এক করে উন্মোচন করে চলেছেন ।

শশিকান্ত চমকে উঠেছিল । সে মনে মনে ভাবে, এটাও কী সম্ভব ? তাঁর বিশ্বাস হয় না ।

সাবিত্রী ভরসা রাখে ঠাকুরের ওপর । সেই জটাধারী সাধু বাবাকে সে মনে মনে জপ করতে থাকে । তাঁর বিশ্বাস,মন্ত্রপূত তাবিজই তাকে রক্ষা করবে । সে মহেশ্বরের স্মরণ নেয় ।

অবশেষে অকাট্য প্রমাণ উপস্থিত করেছিল সেই আধিকারিক । সে মহামান্য আদালতকে অনুরোধ করে বলেছিল,হুজুর আমি আপনাকে কিছু নথি জমা দিতে চাই ।

মহামান্য আদালতের অনুমতি দিলে সেই ঝানু আধিকারিক জজ সাহেবের হাতে একটা সীল করা ফাইল তুলে দিয়েছিলেন । সেই ফাইলের মধ্যে ছিল একটা সিঁদুরের কৌটা । আর ছিল একটা রিপোর্ট ।

জজ সাহেব জানতে চেয়েছিলেন এর মধ্যে কী আছে ?

সে উত্তর দিয়ে বলেছিল, কৌটার মধ্যে আসামীর স্বাক্ষর যুক্ত এক টুকরো কাগজ আছে । আর আছে আসামীর জবানবন্দি ।

বিপক্ষীয় ব্যারিষ্টার সেই জবানবন্দির তা নিয়ে প্রশ্ন তুললে বিচারক মহাশয়কে জবানবন্দিটিতে মননিবেশ করতে দেখা গেল । তাঁকে যেন বেশ চিন্তিত মনে হল ।

তিনি সেই পুলিশ আধিকারিকের কাছে জানতে চাইলেন, আপনি কী এই রিপোর্টকে যথেষ্ট মনে করছেন ? এমন একটা মামলায় এইটুকুই কী যথেষ্ট ? এই স্বীকারোক্তির যথার্ততা্র প্রমাণ কোথায় ?

বিরোধীপক্ষীয় ব্যারিষ্টারও একই প্রশ্ন তুলেছিল । পুলিশের দেওয়া তথ্যকে মান্যতা দিতে তীব্র আপত্তি করেছিলেন তিনি । ঝড় উঠেছিল আদালত কক্ষে । এই নিয়ে দুই পক্ষের যুক্তি পালটা যুক্তির লড়াই যখন চরমে তখন বিচারক মহাশয়কে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল । বিচারক সেই আধিকারিককে তাঁর পক্ষে প্রমাণ দাখিলের নির্দেশ দিয়েছিলেন ।

সেই আধিকারিক জবাব দিয়ে বলেছিল,’ ‘এই জবানবন্দির সত্যতা প্রমাণ করতে আমি প্রস্তুত’। সে আরও বলেছিল, ‘এখানে আসামীর দেওয়া এই ঘটনার বিবরণ লিপিবদ্ধ করা আছে তাই আমি এটার মান্যতা দাবি করছি । এই প্রশ্নে আমি আরও প্রমাণ হাজির করতে চাই’ ।

‘বেশ তো,অনুমতি দেওয়া হল’, বললেন বিচারক মহাশয় ।

সেই তরুণ আধিকারিক অনুরোধ করে বলেছিলেন,‘আসামীকে কাঠগড়ায় তোলা হোক । আমি তাঁকে জেরা করতে চাই’ ।

সাবিত্রীদেবীকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল ।

তাঁকে সে বলেছিল, ‘মা, তোমার বা হাতের মাদুলিটা জজ সাহেবকে খুলে দেও’ ।

বিস্মিত বিচারক মহাশয় প্রশ্ন করেছিল, ‘এই মামলার সাথে এই মাদুলির সম্পর্ক কী’ ?

সাবিত্রীদেবী ভয় পেয়ে গিয়েছিল । সাধুবাবার কথা তাঁর মনে পড়ে গেল । সে তাঁকে বার বার সতর্ক করেছে । সে যেন তাবিজটাকে আগলে রাখে । সে কোনওভাবেই তা কাউকে দিতে রাজি নয় । সে জবাব দিয়ে বলেছিল, ‘মন্ত্রপূত এই তাবিজ তাঁর পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়’ ।

তাঁর ব্যারিস্টারও তীব্র আপত্তি জানিয়েছিল ।

কে এই পুলিশ আধিকারিক ? কেন সে তাঁকে তাঁর রক্ষা কবজ খুলে দিতে বলছে, কী তাঁর উদ্দেশ্য ?, সে বেশ বিড়ম্বনায় পড়ে গেল । জজ সাহেবকে পুলিশ যা যা বলছে সবই তো তাঁরই কথা ! তবে সেই সাধু ?

সেই আধিকারিক উত্তর দিয়ে বলেছিল,‘মহামান্য আদালত ,নীলমাধব অরফে সাবিত্রীদেবীরর প্রথম পক্ষের স্বামীর খুনের সাথে এই তাবিজের সম্পর্ক আছে । এই তাবিজের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এই মামলার রহস্য, আসামীদের নাম এবং ঘটনার বিবরণ’ ।

সাবিত্রী শেষ মুহূর্তও সেই সাধুবাবাকে ভরসা করেছিল । বার বার তাঁর মনে অমঙ্গলের আশঙ্কা দেখা দিতে থাকে । মনে ভেসে উঠেছিল সেই অমোঘ বার্তা ; ‘দেখিস এই তাবিজ যেন স্থানচ্যুত না হয় । হলে অমঙ্গল ঘটবে’ । তবে শেষ রক্ষা করতে পারেনি সে । আদালতের হাতে তাঁকে সেই তাবিজ তুলে দিতে হয়েছিল । সাধুবাবার কথাও যেন অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেল । তাঁর জীবনে সত্যিই অভিশাপ নেমে এসেছিল সেদিন ।

সেই আধিকারিক সমস্ত ঘটনা আদালতের সামনে বর্ণনা করলে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন জজ সাহেব । সকলেই তাঁকে তারিফ করেছিল । সেই রমণী আদালতে ভেঙে পড়েছিল । সব কথাই সে স্বীকার করে নিয়েছিল । সত্যিই যেন তাঁর পাপ মুক্তি ঘটেছিল সেদিন ।

প্রায় আট বছর আগের কথা । সওয়াল জবাব চলেছিল অনেকদিন । প্রতিদিনই আদালত ভরে উঠতে থাকল । ঠান্ডা মাথায় এক পরিকল্পিত খুনের রহস্যের পর্দা সেদিন উন্মোচিত হয়েছিল । এক দক্ষ পুলিশ অফিসারের চেষ্টায় নীলমাধবের পিতৃদেব বিচার পেয়েছিলেন । সকলেই উন্মুখ হয়ে ছিল রায়ের জন্য । আসামী পক্ষের উকিল জোর সওয়াল করেছিল । তবে সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছিল তাঁর ।

আসামী তো হতভম্ব ! তার কিছু করার ছিল না । মুষড়ে পড়েছিল সে । কেঁদে ফেলেছিল সাবিত্রীদেবী । তাঁর সেই মাদুলির মধ্য থেকে বেরিয়ে এসেছিল নীলমাধবের মৃত্যু রহস্য । অসম বয়সে বিয়েতে সাবিত্রীদেবীর প্রথম থেকেই আপত্তি ছিল । তাঁর কোনও উপায়ও ছিল না । লোভী পিতৃদেব তাঁকে বাধ্য করেছিল । স্বামী সোহাগে কোনও খামতি ছিল না তাঁর । তবে সে তাঁকে কোনও দিনই মন দিতে পারেনি । স্বামীর বন্ধু শশীকান্তর সাথে সে প্রেমে পড়ে যায় । শশীকান্তও তখন সাবিত্রীর প্রেমে পাগল । একে অপরকে একান্ত নিজের মতো করে পেতে তারা মরিয়া হয়ে উঠেছে । সেই থেকেই নীলমাধবকে চিরদিনের মতো সরিয়ে দেবার জন্য এই পরিকল্পনা । প্রেমে পড়া সাবিত্রীর সাহায্য নিয়ে তাঁর স্বামীকে খুন করেছিল শশীকান্ত ।

সমস্ত পরিকল্পনা ছিল নিখুঁত ভাবে সাজানো ।

ঘোষ পরিবারের পক্ষেও তা জানার উপায় ছিল না । সুন্দরী সাবিত্রীদেবীর এক বছরের বৈধব্য জীবন কাটানো,তাঁকে বিয়ে করতে শশীকান্তের ইচ্ছা প্রকাশ সবটাই ছিল সেই তার অংশ,ঠান্ডা মাথায় খুনের এক নিখুঁত চিত্রনাট্য । ছেলে শশীকান্তের এমন প্রস্তাবে তাঁর পিতৃদেব প্রথমে আপত্তি করলেও শেষ প্রর্যন্ত ছেলের জেদের কাছে তিনি আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন । সাবিত্রীর দেওয়া বিবরণকে ভিত্তি করেই সেই অফিসার প্রমাণ সংগ্রহ করে তা আদালতে সামনে তুলে ধরেছিলেন । কীভাবে প্রেমিক শশীকান্তকে সাহায্য করেছিল সবটাই সে স্বীকার করেছিল ।

সময়টা ছিল বর্ষা কাল । সেদিন রাতে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল । তখন মধ্য রাত । মধ্যযামে নীলমাধব তখন গভীরভাবে নিদ্রামগ্ন । দরজায় শব্দ হতেই সাবিত্রী দরজা খুলে দিয়েছিলেন । ঘুমন্ত অবস্থায় নীলমাধবকে খুন করেছিল শশীকান্ত । বালিশের সাহায্যে শ্বাস রোধ করে খুন করা হয়েছিল তাঁকে । সমস্ত ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা ছিল সেই কাগজে । খুন করার পর বারান্দায় তাঁকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল । এক অভিশপ্ত পরকীয়া প্রেমের করুণ নিষ্পত্তি সেদিন প্রত্যক্ষ করেছিল আদালতে উপস্থিত মানুষ ।

সেই আধিকারিকের প্রশংসায় সকলেই পঞ্চমুখ । শোনা যায় সরকার সেই আধিকারিকের নাকি পদোন্নতি ঘটিয়েছিল ।

ঠিকানা
নিখিল রঞ্জন গুহ,
৪৫৪/প্রতীচী অ্যাপার্ট মেন্ট,ডাবগ্রাম-১,
পোঃ রবীন্দ্র সরণি,শিলিগুড়িঃ৭৩৪০০৬ ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *