NIKHIL GUHA

NIKHIL GUHA

ফ্যাসিবাদ ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্ব মানবতাবাদ

নিখিলরঞ্জন গুহ

বর্তমান ভারতে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাবনার মধ্যে তথাকথিত জাতীয়তাবাদের স্থান কোথায় তার অনুধাবন করা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক । ভারতীয় দেশাত্ববোধ ও জাতীয়তাবাদকে অবশ্য তিনি পশ্চিমী দেশগুলি থেকে পৃথক ভাবে দেখেছেন । এখানে বিভিন্নতার মধ্যে যে ঐক্য এবং বিশ্বভ্রাতৃত্ব বোধ তাঁর ভাবনায় ধরা পড়েছিল পশ্চিমী দেশগুলিতে তাঁর অনুপস্থিতিতে তিনি ভীষণভাবে বিচলিত ছিলেন । 

তাঁর বিভন্ন লেখায় এবং ভাষণে তার এই বিচলিত হওয়ার কারণ প্রতিভাত হতে দেখা যায় । ভারতীয় সমাজে বিভিন্ন অংশের মেলবন্ধনের মধ্যে তিনি আবিষ্কার করেছিলেন পারস্পরিক সহযোগিতা এবং দেশাত্ববোধের ভিত্তিকে, সাধারণ ভাবে যার প্রকাশ আমরা দেখতে পাই জাতীয়তাবাদের মধ্যে । বিকাশের প্রশ্নে তা যখন নাগরিক জীবনকে দায়বদ্ধ ক’রে তোলে তখন তা শুধু দেশেরই বিকাশ ঘটায় না ব্যক্তিজীবনের উন্নতিরও অংশিদার হয়ে পড়ে ।

বিপরীতে তা যখন জাতীয়তাবাদের নামে প্রভুত্ব বিস্তারের কারণ হয়ে দেখা দেয় তখন তা শুধু মানবতাকেই উপেক্ষা করতে শেখায় না দেশ এবং বিশ্বকে হিংস্রাতার মুখে ঠেলে দেয় । এই প্রশ্নে কবিগুরুর ভাবনার প্রতিফলন দেখা যায় তাঁর বন্ধু এ এম বসুকে লেখা একটা চিঠিতে । সেখানে তিনি লিখছেন “ Patrotism can’t be our final spiritual shelter.I will not buy glass for the price of diamond and I will never allow patriotism to triump over humanity as long as I live”. (১৯৯৭ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত নির্বাচিত চিঠির থেকে সংগৃহীত একটি চিঠির অংশ বিশেষ)। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কবিগুরুর এই মনোভাবের মধ্যে কোনও ব্যতিক্রম ঘটতে দেখা যায়নি । ভারতের জাতীয় আন্দোলনে তাঁকে যে ভূমিকায় আমরা পাই তাও স্মরণযোগ্য ।

সে বঙ্গভঙ্গের(১৯০৫)প্রশ্নেই হোক বা জালিওয়ানাবাগ হত্যাকাণ্ড সেখানে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর সরব উপস্থিতি ছিল লক্ষ্য করা মতো । ১৯১৯ সালের ঘটনার প্রতিবাদে তাঁর নাইট উপাধি ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনা মানবতার বিরুদ্ধে ব্রিটিশসরকারের হিংস্রতাকে বিশ্বমঞ্চে উন্মোচিত করেছিল । ১৯১১ সালে কলকাতায় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে পঠিত তাঁর রচিত সংগীত জাতীয় জীবনে তাঁর দেশপ্রেমের অনন্য নজির হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে । যা আজ আমাদের জাতীয় সংগীত যা আমাদের ১৩৫ কোটি মানুষের আবেগ । ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মহত্মাগান্ধি এই দুই ব্যক্তিত্বের মধ্যে পারস্পরিক সম্ভ্রমের অভাব না থাকলেও তাঁদের সম্পর্ক ছিল অম্লমুধুর । অনেক পশ্নেই তাঁদের মতানৈক্য লক্ষ্য করা যায় ।

তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটা কারণ ছিল দেশাত্ববোধ এবং জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে তাঁদের ভাবনার পার্থক্য । কবি মনে করতেন স্বার্থ নিয়ন্ত্রিত জাতীয়তাবাদ বিশ্বভ্রাতিত্ববোধ এবং বিশ্বমানবতার পরিপন্থী যা পুঁজিবাদী জাতীয়তাবাদের নামান্তর বিশেষ । পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ যেখানেই তিনি আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছেন সেখানেই তাঁর ভাষণে তার উল্লেখ পাওয়া যায় । সাহিত্যের প্রতিটি অঙ্গনও রবিপ্রতিভা এই আলোকেই ভাস্বর ।
কী ব্যক্তি, কী সামাজিক, কী রাষ্ট্রজীবনে স্বার্থসবর্স্ব ভাবনাই আধিপত্যবাদের জনক যা মানবতাকে অস্বীকার করার পথকে মসৃণ করে, বিশ্বমানবতাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেয় । জার্মান এবং ইটালির ফ্যাসিবাদ এই ধারণা থেকেই উদ্ভূত ।

হিটলারের উগ্র জার্মান জাতীয়তাবাদের ভিত্তি ছিল ইহুদি ও কমিউনিস্ট বিদ্বেষ আর ছিল ইউরোপে প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত । ইটালির ক্ষেত্রেও তা সত্য । জাপানকেও সেই পথেই হাঁটতে দেখে তিনি মর্মাহত হয়েছিলেন ।
সেই দেশের অর্থনৈতিক বিকাশ, বিজ্ঞানের অগ্রগতি,সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য,চারুকলা প্রভৃতি কবিকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করেছিল । তিনি একাধিকবার(১৯১৬,১৯২৪ এবং ১৯২৯)জাপান সফর ক’রেছিলেন । বিশ্বসাহিত্যে এশিয়ার প্রথম ‘নবেল’ প্রাপক হিসেবে কবিকে বিশেষভাবে গ্রহণ করলেও জাপান সরকারের তথাকথিত দেশাত্ববোধ এবং জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে কবির ভাবনাতে তাঁদের সংশয় ছিল । পশ্চিমী রাষ্ট্রগুলির মতো জাপা্নের বিদ্বজ্জনেদের একটা বড় অংশ এই ক্ষেত্রে তাঁর সাথে সহমত হতে পারে্ননি ।

দ্বিতীয় সিনও-জাপান যুদ্ধে জাপবাহিনীর নানকিং দখল(১৩/১২/১৯৩৭) এবং নির্বিচারে গণহত্যার বিরুদ্ধে কবির অবস্থান ছিল কঠর । তিনি জাপান সরকারকে এই ভূমিকার জন্য তীব্র সমালোচনা করেন এবং জাপান সরকারের কাছে এই ঘটনার নিন্দা ক’রে অধ্যাপক নোগুচিকে প্রতিবাদ জানিয়ে চিঠি লিখতে অনুরোধ করেছিলেন । নোগুচি তখন তাঁর প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনের অধ্যাপক । কবি তাঁকে কাছে পাননি । বরং তিনি সেই যুদ্ধের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে কবি এবং মহত্মাগান্ধিকে তাঁর জবাব দেন । জাপান থেকে আগত খ্যাতনামা সেই অধ্যাপকের এহেন আচরণে বিস্মিত এবং মর্মাহত হয়েছিলেন তিনি । উগ্রজাতীয়তাবাদে উন্মত্ত সামরিক শক্তিনির্ভর জাপান সম্পর্কে তাঁর আশঙ্কা যে অমূলক ছিল না পরবর্তী সময়ে জাপানবাসী তার প্রমাণ পেয়েছিল ।

  বেনিটো মুসলিনির আমন্ত্রণে এমন একজন বিশ্বমানবতাবাদী কবির আতিথেয়তা গ্রহণকে কেন্দ্র ক’রে সমকালীন সময়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল । আপাতভাবে তাতে অস্বাভাবিকতার কিছু ছিল না । এই নিয়ে এখনও অনেকের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা যায় । তৎকালীন সময়ে ইউরোপ তথা বিশ্বের বিদগ্ধ জনেদের মধ্যে সৃষ্ট বিভ্রান্তি দূর করতে কবিকে অবশেষে কলম ধরতে হয়েছিল । প্রকৃতপ্রস্তাবে মুসলিনির এই আমন্ত্রণের পেছনে ছিল একটা ঘৃণ্য কূটকৌশল ।

বিভিন্ন গেবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায় ভাষাগত কারণে যেমন ইটালি সরকারের ভূমিকা নিয়ে তিনি সঠিক তথ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন তেমনই সরকার এবং মুসলিনির হয়ে অনেক কথাই তাঁর মুখে বসানো হয়েছিল । এই ক্ষেত্রে সে দেশের অধ্যাপক ফরমিচি ও গুইসেপ্পে তুচ্চি বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলেন । সরকার পোষিত জাপানের সংবাদমাধ্যমগুলিও মুসলিনির হয়ে বিশেষভাবে প্রচারে নেমেছিল । এটা ঠিক শান্তিনিকেতনের গ্রন্থাগারে বহুমূল্যের মূল্যবান বই দানসহ অধ্যাপক কার্লো ফরমিচি এবং অধ্যাপক গুইসেপ্পে তুচ্চিকে শান্তিনিকেতনে পাঠানোতে কবি অভিভূত হয়েছিলেন ।

উল্লেখ্য শান্তিনিকেতনে থাকাকালীন তুচ্চির এক বছরের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করেছিল ইতালি সরকার । তবে মনে করা হয় তাঁরা দুইজন বিশেষ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছিলেন । তাঁদের প্রধান লক্ষ্য ছিল মুসলিনিকে সন্তুষ্ট করা । কবির সফরসূচি রচনাতে কার্লোফরমিচির ভূমিকাই ছিল প্রধান। ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে ইরোপে তখন মুসলিনি তীব্র সমালোচনার মুখে । আমানাডলা এবং ম্যাট্টেওটি দুইজন জনপ্রিয় বামপন্থী চিন্তাবিদকে হত্যা(১৯২৪)করার প্রতিক্রিয়ায় মুসলিনির জনপ্রিয়তা তখন তলানিতে ঠেকেছে । রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো একজন বড় মাপের বিশ্বব্যক্তিত্বকে সামনে রেখে বিশ্বজনমতের দৃষ্টি ঘোরানোর জন্যই মুসলিনির এই কৌশল নিয়েছিলেন বলে অনেক গবেষক মনে ক’রে থাকেন ।

কবির সহযাত্রি প্রশান্ত মহানলবিশের অভিজ্ঞতা থেকেও তাঁর প্রমাণ পাওয়া যায় । জানা যায় ইটালি সফরকালে অদ্ভুতভাবে কবির সান্নিধ্য থেকে নানা কৌশলে তাঁকে বিছিন্ন ক’রে রাখা হয়েছিল । ফলে ইটালি সরকারের ভূমিকা নিয়ে তাঁর মনে প্রশ্ন দেখা দিলেও তাঁর কিছু করার ছিল না ।

একটা ঘটনা থেকে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হতে পারে । একদিন কবি ইতালির বিখ্যাত দার্শনিক বেনেডেট্টওক্রুচের সাথে সাখ্যাতের ইচ্ছে প্রকাশ করলে অধ্যাপক ফরমিচি তাতে তীব্র আপত্তি জানান । কবি বিস্মিত । অদ্ভুতভাবে দেখা গেল মুসলিনি নিজেই সেই ব্যবস্থা করে দিয়েছেন । প্রাথমিকভাবে মুসলিনির এই মহানুভাবতায় তিনি সন্তুষ্ট হলেও ইটালির সেই দার্শনিকের গৃহবন্দির কথা জানার পর তিনি ভীষণভাবে ব্যথিত হন । কবি নিজেই তাঁর ইটালি ভ্রমণ নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে ৫ই অগাস্ট ১৯২৬ ফাদার চরর্লস ফ্রিয়ার এন্ড্রুসকে একটা দীর্ঘ চিঠি লিখেন । সেখানে এই বিভ্রান্তির কারণগুলি স্পষ্ট হয়ে ওঠে । এই ঘটনার পর ইটালির সরকারের সাথে কবির সম্পর্কের অবণিতি ঘটতে দেখা যায় ।

 সরকার পোষিত বুদ্ধিজীবি ও বিদ্বজ্জনেদের ভ্রান্তিজনিত কারণে জাপানকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে । ১৯২৯ সালে ইম্পেরিয়াল ইউনিভার্সিটিতে(এখন টকিও ইউনিভার্সিটি)কবির দেওয়া ভাষণটি আজকের দিনেও বিশেষ ভাবে প্রণিধানযোগ্য । 

সেখানে ‘Organized selfishness of Nationalism’ এর উপরে ‘Higher ideals of humanity’ কে স্থান দেবার জন্য তিনি সে দেশের বিদ্বজ্জন এবং নাগরিকদের কাছে আহবান জানিয়েছিলেন । যদিও সেদেশের বিদ্বজ্জনদের একটা বড় অংশই সেদিন তাঁর সেই আহ্বানে সারা দিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন । পরিণতির শিকার হতে হয়েছিল জাপানবাসীকে । বর্তমান বিশ্বেও কবির সেদিনের সেই আহবান ভীষণ ভাবে প্রাসঙ্গিক ।

,৪৫৪/প্রতীচী অ্যাপার্টমেন্ট,

ডাবগ্রাম-১,

পোঃ রবীন্দ্র সরণি,

শিলিগুড়িঃ৭৩৪০০৬

মোঃ৯৪৩৪০৯৬৭৭৭

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *