NIKHIL GUHA

_ নিখিল রঞ্জন গুহ

লিচ্চি

নিখিল রঞ্জন গুহ

    বস্তিটা বেশ পুরনো । প্রায় একশত ঘর মানুষের গর্ব এই বস্তি । বস্তিতে নতুন মানুষ এলে কথায় কথায় ছেলেছোকরা থেকে বুড়ো গর্ব করে তা শুনিয়েও থাকে । অনেকবারই তাঁদের উচ্ছেদ করার চেষ্টা হয়েছে । মারদাঙ্গাও কম হয়নি । মুড়িমুড়কির মতো পেটো ফেটেছে । রণক্ষেত্রের আকার নিয়েছে । বার কয়েক গুলিও চলেছে । প্রাণও গিয়েছে দুই একজনের । ফল হয়নি । এই বস্তিতে পূর্ববঙ্গের বাঙালের সংখ্যাই বেশি । কয়েক ঘর হিন্দি ভাষীও আছে । তবে এই প্রশ্নে সকলেই একমত । দেশ আক্রান্ত হলে যা হয়, এখানেও যেন ঠিক তাই । যেন দেশের মধ্যে দেশ । কেউ তাতে ফাটল ধরাতে পারেনি ।

 চেষ্টা যে হয়নি তা নয় । এখনো হয় । সমস্যাও অনেক । সরু সরু গলি । ঘিঞ্জি । কারো মাথার উপর টিনের ছাউনি । কারো বা মাথার উপর ছেঁড়াফাটা ত্রিপল,ভারী প্লাস্টিক বা টালি । কর্পোরেশনের কমিউনিটি ল্যাট্রিন আর জলের কলই প্রধান ভরসা । জল নেওয়া,বাসন ধোয়া,জামাকাপড় কাচা,স্নান করা সবই এই টাইমকলের ওপর । যখন আসে তখন কাড়াকাড়ি পড়ে যায় । মুখে যা আসে তাই বলে । কানে নেওয়া যায় না । তাইবলে তাঁদের মধ্যে মিল মহব্বতের অভাব আছে তা বলা যাবে না । কেউ বিপদে পড়লে সব ভুলে যায় । একে অপরের পাশে এসে দাঁড়ায় । প্র্যজনে জান কবুল করতেও প্রস্তুত ।

 কয়েক ঘর সংখ্যা লঘু মানুষও আছে । নিয়মিত আজান হয় । আবার দুর্গা পুজোয় হিন্দুদের সাথে দলবেধে ঠাকু্র দেখতে যায় । গলিতে শনি পুজোতে হাত লাগায় । বাড়ির মেয়েবৌরা কাজে বেরিয়ে পড়ে । অনেকেই বাবুদের বাড়ি কাজ করে । কেউ বা এটা ওটা বিক্রি ক’রে সংসারে টাকা যোগান দেয় । বেটাছেলেরা কেউ ঠেলা চালায় । কেউ গাড়ি চালায় । আবার কেউ বাবুদের দোকানে কাজ করে । নানা স্বাদের লজেন্স,ঝালমুড়ি,কেটলি ভরতি চা নিয়ে অনেকে আবার লোকাল ট্রেনে ওঠে । কলকাতা শহরে কাজের হিসেব রাখে কে । সকলেই ব্যস্ত । এই তো সেদিন লিচ্চির বাবা মহেশ, বস্তার মধ্যে খান কুড়ি কাঠের তৈরি বসার ছোট পিড়ি নিয়ে শিয়ালদার পাশেই একটা ফাঁকা জায়গা দেখে বসেছিল । তারস্বরে বলে চলেছিল, ‘মাত্র কুড়ি টাকা । সারা জীবন বইয়্যা খাইতে পাইবেন’ !

  ভিরমি খাওয়ার অবস্থা ! বলে কি লোকটা ? নীলকণ্ঠ বাবু ভাবলেন, ‘ব্যাপারটা একটু দেখতে হয়’ । তিনি যে এই ভাবে ফেঁসে যাবেন তা ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি । মহেশকে সে প্রশ্ন করেছিল, ‘কী বললে ? কুড়ি টাকায় সারা জীবন বসে খাওয়া ! কই দেখি তোমার সেই জিনিস’ ।

  সে জোর দিয়ে বলেছিল, ‘গরিব বইলা কী আমাগো ধম্মকম্ম থাকতে নাই’ ?

  নীলকন্ঠ বাবু দেখল, ‘লোকটা বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়েছে । কথা গুলিকেও তো ফেলে দেওয়া যায় না । ভাবল একবার পরীক্ষা করেই দেখা যাক’ । 

  মহেশ বলল, ‘আমারে এই খানে ৩৬৫ দিনই দ্যাখতে পাইবেন’ । মিথ্যা হইলে এই মুখে পায়ের জুতা ঘইষ্যা দিয়া যাইবেন’ । এই বলে সে একটা কাঠের পিড়ি বের করে দেখিয়েছিল ।

  সেই ভদ্রলোক তো তা দেখে অবাক !

  সেই পিড়ি কত মজবুত তা বোঝাতে মহেশ তখন ব্যস্ত ।

  ভদ্রলোক কী আর করে । করার কিই বা ছিল তাঁর ? মহেশ তো আর ভুল কিছু বলেনি । এই পিড়ি তাঁর কী কাজে লাগবে ? অথচ নাও করতে পারছে না । প্রথমে সে ঠিক করল, ‘তাঁকে সে কুড়ি টাকা এমনিতেই দিয়ে দেবে’ । যেমন ভাবা তেমন কাজ । পকেট থেকে একটা কুড়ি টাকার নোট বের করে তাঁকে দিয়ে বলল, ‘এটা রেখে দেও, ওটা আমার লাগবে না’ ।

  মহেশের ধারণা, সে পিড়ির গুণাগু্ণ ঠিক বোঝাতে পারেনি । সে রাস্তার উপর পিড়িটাকে আছাড় মেরে বলল, ‘দেইখ্যা লন, ঠকামু না’ ।

  তাঁর কোনও যুক্তিকেই ফেলে দেওয়া যাচ্ছে না । নীলকণ্ঠ বাবু মহাবিপদে পড়ে গেল । সে বলল, ‘নানা সে কথা হচ্ছে না । আমার লাগবে না’ ।

  লিচ্চির বাবার মাথাটা যেন হঠাৎ করেই খিঁচড়ে উঠল,সে উত্তর দিয়ে বলল । না বাবু, ‘আপনারে লইতেই হইবো । আমরা গরিব, তাই বইলা ভিক্ষা কইর‍্যা খাই না । কাজ কইরাই প্যাট চালাই । না হইলে রাস্তায় বাটি হাতে দ্যাখতেন’। বেকায়দায় পড়ে তাঁকে সেই পিড়ি নিতে হয়েছিল । তবে তা বাড়ি পর্যন্ত গিয়েছিল কিনা তা জানা যায়নি ।

 লিচ্চির বাবা যাই বলুক, সে আগে কোনওদিন সেখানে বসেনি । সে যখন যা পায় তাই করে । কথা বেচে খাওয়াই তাঁর কাজ । লিচ্চির মায়ের নাম শেফালী । তবে নামটা তাঁর বরের দেওয়া । আসল নাম আমিনা । তাঁর বাবা জেঠারা কোন নবাব বংশের তা তাঁর জানা নাই । পূর্ব পাকিস্তান থেকে আর সকলের মতোই সে তাঁর আব্বাজান,দাদু,দিদা আম্মার সাথে এই দেশে এসেছিল । মুক্তিযুদ্ধের সময় খান বাহিনীর তাড়া খেয়ে সেই যে দেশ ছাড়া হয়েছে আর ফেরা হয় নাই । কোনওক্রমে এই বস্তিতে একটা ঠাঁই করে নিয়েছে । তাঁর বাবা ইকবাল মিয়াঁ বেশ করিতকম্মা মানুষ । সে নিজেও ঢাকাইয়া বাঙাল । সে এখন এই দেশের লোক । রীতিমতো ভোট দেয় । সরকারের রেশন পায় । সরকারি কাগজপত্রের অভাব নেই । দাপাটও তাঁর কম না ।

  এই আমিনার সাথে লিচ্চির বাবা মহেশের প্রেম শুরু হয় সেই কলতলা থেকে । তখন তাঁর বয়স উনিশ কুড়ি হবে । দোহারা চেহারা । একমাথা ঝাঁকড়া চুল । এক কানে পেতলের দুল । ডান হাতে একটা লোহার বালা । দেখলেই বোঝা যায় গতরে জোর আছে । বস্তিতে ঝামেলা হলেই তাঁর ডাক পড়ে । তখন যেন সে চন্ডাল । দেখলেই ভয় করে । বার কয়েক পুলিশের লাঠির ঘাও পড়েছে ।  এই কারণে সে জেলেও খেটেছে । হাস পাতালেও থাকতে হয়েছে বারকয়েক । একবার তো যায় যায়,অনেক কষ্টে প্রাণ নিয়ে ফিরে এসছে । সেই চিহ্ন সে এখনও বহন করে । তবে তা বস্তির জন্য ।

 সুযোগ পেলেই তা সে দেখায় । গর্ব করে । এটা যেন তাঁর মাতৃভূমি রক্ষার লাড়াইয়ের চিহ্ন । যদিও তাঁর মাকে সেইভাবে সে পায়নি । জন্ম দেওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই সে গত হয় । তখন তাঁর বয়স দুই কী তিন । ওই বয়সে সব কথা মনে থাকার কথাও না । মাঝে মধ্যে তাঁর মায়ের মুখটা যেন উঁকি মারে । বুকটা হুহু করে ওঠে । লোকে বলত, তাঁর বাবা নাকি তাঁর মাকে খুন করেছিল । একজনের বৌকে নিয়ে সে নাকি মহল্লা ছাড়া হয় । সেই থেকে আর তাঁর খোঁজ পাওয়া যায় না ।

  মহেশ এই বস্তিতেই বড় হয়েছে । বস্তিবাসীরাই তাঁকে পালা করে বাঁচিয়ে রেখেছিল । তাই সকলের কাছেই সে ঋণি । কারো বিপদ হলে সকলের আগে সে হাজির হয় । সেই মহেশের উপর আমিনার নজর পড়ল । সে যখন কল তলায় স্নান করতে যায় আমিনা দূর থেকে তাঁকে চুরি করে দ্যাখে । বিধর্মী মেয়ে বলে কথা,তাই তাঁর সাহস হয় না মুখ ফুটে মনের কথা কাউকে বলার । আমিনারই বা বয়স কত, পনেরো ষোল  হবে । সকাল হলেই সে বেরিয়ে পড়ে । কয়েক বাড়ি ঠিকা করে । ফিরতে ফিরতে সেই মধ্য বেলা । সূর্য দেবতার চোখ দিয়ে তখন আগুন ঝড়ছে । আমিনার যাতায়াত কলের ধারে রাস্তা দিয়েই । মহেশ প্রায়ই সেই সময় স্নান করতে আসে । তখন সেখানে যত ব্যাটাছেলের ভিড় ।

 আমিনারও ফেরার সময় এটা । এই জায়গা এলেই সে যেন কেমন হয়ে যায় । দুই চোখ ভরে সে মহেশকে দ্যাখে । সবদিন যে তাঁর দেখা মেলে তা না । যেদিন দেখা পায় না সেদিনটা তাঁর খারাপ যায় । ভেতরটা যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে । ব্যাপারটা প্রথমে মহেশের নজরে পড়েনি । রাকেশই ঘটনাটা তাঁর নজরে এনেছিল । সে নিজেও পরীক্ষা করে দেখেছে । আমিনার চোখের ভাষা বুঝতে মহেশের ভুল হয়নি । আমিনাকে তাঁরও পছন্দ । হবেই বা না কেন । বস্তিতে আমিনা যেন গোবরে পদ্মফুল ! ডাগর মেয়ে । গায়ের রংটাও পেয়েছে । ভাবল একবার যদি কথা বলা যায় ? এখানেই যত বিপত্তি । এমন ডানপিটে ছেলে, মহল্লার উঠতি দাদা জেলখাটা মহেশের পক্ষে তাঁর থেকে বছর চারেক ছোটো আমিনাকে তাঁর মনের কথা বলার সাহস হয় না । ক’দিন চেষ্টাও করেছে । পারেনি । না, সে বেজাত বলে না । 

সঙ্কোচ থেকেই পেরে ওঠেনি । দায়িত্বটা রাকেশকেই নিতে হয়েছিল । যেদিন আমিনা রাকেশের কাছে সেই কথা জানতে পারল,সেদিন যেন তাঁর মনে হাজার প্রজাপতির ঝটপটানি শুরু হয়ে গিয়েছিল । তারপর তাঁকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি । সকালে বেরিয়ে গেলে মহেশও তাঁকে সাথ দেয় । সুযোগ হলেই সকলের চোখের আড়ালে সে আমিনাকে নিয়ে নানা জায়গা ঘুরে বেড়ায় । কোথায় না গিয়েছে সে । বাবু ঘাট,চিড়িয়াখানা,মনুমেন্ট,ভিক্টোরিয়া এমন কী দক্ষিণেশ্বরেও সে নিয়ে গিয়েছিল তাঁকে। কিছু দিনের মধ্যেই সে একটা কাজও জুটিয়েও ফেলল । এক মালিকের গদিতে । দিনে দুইশত টাকা । তবে চার রবিবার বাদ । 

একদিন মহেশ তাঁর কজন বন্ধুকে নিয়ে সোজা এক কালী মন্দিরে গিয়ে উপস্থিত । সাথে আমিনা । সে আমিনাকে শিখিয়ে পড়িয়েই নিয়ে গিয়েছিল । পুরোহিতের সন্দেহ করার উপায় ছিল না । সেই থেকে তাঁরা স্বামীস্ত্রী । শেফালি রীতিমত সিন্দুর পরে । রাকেশ, মহেশকে সাবধান করেছিল । দেখিস কোনও ঝামেলা না হয় । আমিনার উপর কিন্তু অনেকের নজর পড়েছে । তার উপর আবার বিধর্মী মেয়ে । মহেশ ফুঁ দিয়ে তাঁর কথা উড়িয়ে দেয় । একটা খিস্তি দিয়ে বলেছিল, আমিনারে আমার ভালো লাগে, তাঁরে আমি বিয়া করুম, তাতে----- কোন হালার পো হালার কী ।

    মহল্লায় কটা দিন এই নিয়ে বেশ গুঞ্জন শুরু হয়ে গিয়েছিল । একটা থমথমে ভাব । আমিনার মা সাবিনা খাতুন ভয়ে কয়দিন ঘর থেকেই বের হয়নি । কিছু লোক আমিনার বাবাকে তাতানো্র চেষ্টা করেছি্ল, তাঁকে উস্কে দিয়ে বলেছিল, ‘এক হিদুর ব্যাটা তোর ম্যায়াডারে ফুসলাইয়া নিকা কইর‍্যা ফ্যালল, তোর কিছু করণের নাই ? তোর মুসলমান রক্তে একটুকুও জ্বালা ধরে না ? তুই কী চোখ বুইজ্যাই থাকবি,? ভয় নাই, আমরা তোর লগে আছি’ । 

    ইকবাল মিয়াঁ তাঁদের পরিকল্পনায় জল ঢেলে দিয়ে বলেছিল, ‘ তয় তোগার কি । জ্বালা ধরবো ক্যান ? বাঙালে বাঙালে নিকা হইছে । আপত্তি করণের কী হইছে । ও হইল ফরিদপুইর‍্যা বাঙাল আমি হইলাম গিয়া ঢাকাইয়া বাঙাল । হেডাই তো হক কথা । ম্যায়ার যেখানে মন হেইখানেই তো তাঁর বিয়া হওয়ান দরকার’ ।

    এক বছরের মাথায় শেফালির পেটে লিচ্চি আসলে তাঁকে নিয়ে মহেশের কত না চিন্তা । সেই লিচ্চির বয়স তখন চার । সারটা দিন সে উদম গায়ে মহল্লায় ঘুরে বেড়ায় । কোমরে বাঁধা একটা কালো সুতা । তাতে একটা লোহার চাবি । আদাড়েপাঁদাড়ে ঘুরতে ঘুরতে গায়ের রংটা কালো হয়ে গ্যাছে । সে মায়ের রং পেয়েছিল বটে তবে সেটা এখন বোঝার উপায় নাই । একদিন মহেশ বৌকে বলেছিল, ‘লিচ্চিটারে স্কুলে দেওয়া লাগে । 

আমার তো এই জম্মে আর স্কুলের মুখ দেখা হইল না । ছেলেটারে যদি পাঠাইতে পারতাম’ । ফুটপাত থেকে রংচঙা একখানা অ আ ক খ এর বইও এনে দিয়েছিল সে । বোউটার পেটে কিছু বিদ্যে আছে, যদি কাজে লাগাতে পারে । শেফালী পারেনি । তাঁর সময়ই বা কোথায় । সকাল হলেই তো বাবুর বাড়ি ছোটা । এতটুকুও দেরি হলে রক্ষা নাই । দরজায় পা রাখতেই সামনে দণ্ডায়মান গৃহকর্তী, যেন সাক্ষাৎ রণচণ্ডী ।

  ভালোই চলছিল । হঠাৎ করেই সব যেন কেমন হয়ে গেল । মানুষগুলি ঘর থেকে বের হয় না । সেফালীও বাবুবাড়ির কাজগুলি হারিয়েছে । তিনটা পেট, চলে কী ভাবে । সকলেই ঘরবন্দি । তার মধ্যেই মহেশ সবজি ফেরি করে । মালিককে হিসাব বুঝিয়ে দিয়ে যা থাকে তাই বৌয়ের হাতে তুলে দেয় । একদিন সেই মহেশই বৌয়ের হাতে ছয়টা কড়কড়ে একশত টাকার নোট ধরিয়ে দিয়েছিল । এত টাকা হাতে পেয়ে সেফালী সত্যি সেদিন অবাক হয়েছিল । বিস্ময়ে সে বরের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে ।

   ক’দিন হল মহেশের আয় মন্দ হচ্ছে না । তাঁর বৌটাও বেশ লক্ষ্মী । বরের আয় বাড়লেও তাঁর খরচের হাত বাড়েনি । সে সাবধানে চলে । এই নিয়ে বরের সাথে মাঝে মধ্যে তাঁর কথা খটমটিও হয় । মহেশের নেশার দোষ আগেই ছিল । ইদানীং তা যেন একটু বেড়েছে । রাত হলেই তাঁর মাথাটা যেন তিরিক্কি দিয়ে ওঠে । বাড়িতে অশান্তি হলে লিচ্চি মায়ের কোলে সিটকি মেরে থাকে ।

  নেশা হলেও লিচ্চিকে আদর করতে তাঁর ভুল হয় না । কদিন হল লিচ্চি তা থেকে বঞ্চিত । মাও যেন কেমন গুম মেরে বসে থাকে । সকাল হলেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় । ফিরতে ফিরতে সেই সন্ধ্যা । লিচ্চি এ বাড়ি সে বাড়ি ঘুরে বেড়ায়, যে যা দেয় তাই খায় । একদিন বাড়িতে বস্তির বেশ কিছু মানুষের আগমন ঘটল । লিচ্চির মনে হল কিছু একটা হচ্ছে । তাঁর মধ্যেও খুশি খুশি ভাব । সেদিন লুচি,ভাজা,তরকারি,ডাল,ভালোমন্দ রান্নাও হয়েছিল । দই মিষ্টিও ছিল । লিচ্চির চোখ দুইটি জ্বল জ্বল ক’রে ওঠে । পাত পেতে বেশ ক’জনকে সে খেতেও দেখেছে । এর আগেও সে বস্তিতে গানবাজনা হতে দেখেছে ।

 সেখানে ভালোমন্দ খাওয়া দাওয়াও হতে দেখেছে সে । ঘুর ঘুর করেছে, যদি কেউ ডাকে । না তেমন হয়নি । মুখ ভার করে সে ঘরে ফিরেছে । আজ তেমন হল না । অনেকদিন পর লিচ্চিও আজ পেট ভরে খেয়েছে । তাঁর একটাই দুঃখ, এই দিনেও তাঁর বাবা কাছে নাই । রাগও হচ্ছিল । সে মায়ের মুখের দিকে তাকাতে পারছিল না । সকাল থেকেই তাঁর মুখখানা যেন কেমন দুখী দুখী হয়ে আছে । সে বারকয়েক মায়ের কাছে একটু আদরের আশায় ঘুর ঘুর করেছে । সারা পায়নি । রাকেশ বলল, ‘বৌদি খেয়ে নাও’ । সকাল থেকে তো পেটে কিছু পড়েনি’ ।

     শেফালী হঠাৎ চিৎকার করে কেঁদে উঠল । ছেলেকে দুই হাতে বুকে জাপটে ধরে বলে উঠল, ‘লিচ্চিরে তোর বাবা আর ফিরবে নারে । তোর বাবা আর নাইরে । তোরও স্কুলে যাওয়া হবে নারে’ । লিচ্চি থতমত খেয়ে গিয়েছিল ।

  শেফালী জানতেই পারেনি তাঁর বরের কাজটা কী ছিল । তাঁকে সে শেষ বারের মতো চোখের দেখাও দেখতে পারেনি । দাহ করার পর সে জানতে পারল তাঁর বর করোনায় মারা গ্যাছে । মহেশকে তাঁর বন্ধুরা অনেক বুঝিয়েছে, বলেছিল, ‘তুই কাজটা ছেড়ে দে । বৌ বাচ্চা নিয়ে থাকিস । কিছু হলে রক্ষে নেই’ ।

   মহেশের এক কথা, ‘মানুষের কাজে লাগতাছি সেটাও তো আমার কপাল । হাতে কটা পয়সাও আইতাছে । বৌটারও কাজকম্ম নাই । দুই বেলা ছয়টা প্যাট, চালামু ক্যামনে’ ? কথা শুনল না । বন্ধুরাই তাঁর শ্রাদ্ধের ব্যস্থা করেছিল । লিচ্চিকে কোলে নিয়ে রাকেশ শেফালীকে বলেছি্ল, ‘বৌদি কেঁদো না । লিচ্চির জন্যই তোমাকে শক্ত হতে হবে ।

 তোমার বরের সাধটা মেটাবে না’ ? লিচ্চির আদল গায়ে এই প্রথম একটুকরো সাদা কাপড় জড়িয়ে দিয়েছিল তাঁর পাড়াতুতো এক জ্যাঠাইমা । তাঁর চোখ দুটি চক চক করছিল । নতুন কাপড় ! মাকেও সেদিন একটা নতুন সাদা থান পড়তে দেখেছে সে । তবুও তাঁর মুখ ভার, দেখে তাঁর খুব কষ্ট হচ্ছিল । কপালের লাল টুকটুকে সিঁদুরে চিহ্নটাও ক’দিন থেকে উধাও । অবোধ শিশু কিছু বুঝে উঠতে পারল না । মায়ের বুকফাটা আর্তনাদে কী বুঝল কে জানে, হঠাৎ করেই সে ঠোঁট ফুলিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল ।


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *