Mousumi Sarkar

আলোর পৃথিবী – তৃতীয় ভাগ
মৌসুমী সরকার , সমাজতত্ত্বে এম. এ.

তৃ না , নেত্রা দাদা বৌদি , রুম আর ঝুম একসাথে চলেছে দিল্লি , এই প্রথম , …. দাদার ক দিন ব্যাঙ্ক এ ছুটি , রুম ঝুমের স্কুল ছুটি আর তৃনা ,নেত্রা র স্কুল বন্ধ শীতের ছুটি তে । ছয় দিনের ছুটি তে তারা , ….. দিল্লী থেকে আগ্রা হয়ে বাড়ি ফিরবে । এই প্রথম প্লেনে চড়বে তারা!
কি যে আনন্দ সবার মনে ! নেতাজি সুভাষ চন্দ্র এয়ার পোর্ট থেকে সোজা দিল্লী নেমেছে ,. বাচ্চা গুলো চুপ করে পিসিদের হাত ধরে বসেছিল , প্লেনে , বৌদির
ও খুব ভালো লাগছে , বাড়ির সবাই মিলে জিনিস ভাগ করে খাওয়ার যে আনন্দ পাওয়া যায় ,…. সবাই এক সাথে থাকার যে নির্মল আনন্দ পাওয়া যায় , সেই একই আনন্দ বিরাজিত সবার মনে ! কেন যে হিংসা , সৃষ্টি হয় মানুষের মনে , ছোট্ট থেকে হিংসা , মানুষ
কে কোথায় নিয়ে যায় , নিয়ে যেতে পারে , সে তার বৈমাত্রেয় কাকা কে দেখেছে , পৃথিবী স্বর্গ হয়ে উঠবে , যেদিন
হিংসার অপমৃত্য হবে। …… প্লেন সঠিক সময়ে দিল্লি নেমেছে , শীত কাল , বেশ ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে , দিল্লি , … ভারত বর্ষের রাজ্ ধানি , … ইতিহাসের পাতায় যে চিরকাল গুরুত্ব পূর্ণ স্থান দখল করে আছে , সেই মহাভারতের আমল থেকে যার পরিচয় পাওয়া যায়, সেই দিল্লি ! প্রথম দিন বেরিয়ে ছে তারা , দূর থেকে দেখতে পেলো রাষ্ট্র পতি ভবন, লাল পাথর দিয়ে তৈরী , সাধারণের কাছে যাওয়া নিষেধ , দেখতে পেলো সুপ্রিম কোর্ট , পরিষ্কার পরিছন্ন শহর , পাশে পাশে সবুজ গাছ , ও সবুজ রেলিং অনেক জায়গা তে । এবার তারা যাচ্ছে কুতুব মিনার দেখতে , …. ইতিহাস ! ইতিহাসের দিদিমনি সে ! আগে আসা সম্ভব হয়নি , সংসারের নানান চাপে , শুধু বই পড়ে গেছে , আজ সে , এই বিশাল ঐতিহাসিক স্তম্ভের সামনে দাঁড়িয়ে , ১২০০ শতকে তৃতীয় পৃথ্বীরাজ কে পরাজিত’ করে কুতুব আল দিন আই বক এটি তৈরী করেন ,
, ২৩৮ ফুট উচ্চতা নিয়ে তৈরি , ভারত বর্ষের সর্বাধিক উঁচু স্তম্ভ । …… সে এক আশ্চর্য ব্যাপার । কত দিন। .. কত সময় লেগেছিলো , এটি তৈরী হতে , মাথা উঁচু করে দেখতে গেলে একে বারে ঘাড় ব্যাথা হয়ে যাচ্ছে । এটি আসলে হিন্দু রাজা দের পরাজিত করে মুসলিম আধি পত্য বিস্তার এর প্রতীক । কিন্তু গঠন শৈলী ? স্থাপত্য ? নেত্রার জানা নেই
কার সাথে একে তুলনা করা যায় ! অনেক জায়গা নিয়ে এটি দাঁড়িয়ে মুসলিম শাসনকালের জয়োধ্বনি করছে , সত্যি , কত দিন আগে তৈরী , কিন্তু কি মজবুত গঠন ! রুম ঝুম তো একেবারে ব্যস্ত , তারা ওপরে উঠবে কুতুব মিনারের , কিন্তু আর ওপরে ওঠার অনুমতি নেই , নিরাপত্তার কারণে , ঘুরে দেখতে বিকেল গড়িয়ে এল , সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ছে , নেত্রার মন চলে যাচ্ছে কোন সুদূর অতীতে , সে যেন দেখতে পাচ্ছে পৃথ্বীরাজ পরাজিত হলেন , খবর ছড়িয়ে গেল বিদ্যুৎ গতি তে , পরাজিত রা রা মন খারাপ করছে , বিজয়ী দের জয়োল্লাস শোনা যাচ্ছে , আস্তে আস্তে কত দক্ষ শ্রমিকের অনবদ্য হাতের কাজে , পরিশ্রমে তৈরী হলো ,,কুতুব মিনারের গঠন , সম্রাট খুশি হয়ে নজরানা দিলেন , .কাউকে কাউকে , আর যে ফাঁকি দিলো তাকে শাস্তি দিলেন , হাঁ , এই সঙ্গে সঙ্গে শাস্তি ব্যাপার টি ভারী ভালো লাগে নেত্রার , হালের মতো অপরাধ করেও অপরাধী কি সুন্দর ছাড়া পেয়ে ঘুরে বেড়ায় ! বিচার হতে বছরের পর বছর লেগে যায় …. তার পরেও আসল অপরাধী ঠিক জাল কেটে বেরিয়ে পড়ে ! ……” কি হলো উর্মি! “… উর্মি! …”.. হা , দাদা , যাই ,” আসলে দাদা জানেন তার ছোট্ট থেকেই নানান চিন্তার তরঙ্গ নিয়ে চলা স্বভাব ছিল , … তাই বাবা , মা তৃনার দাদা সবাই তাকে উর্মি
বলেওডাকতো ,…..নেত্রার আর এক নাম উর্মি ! দাদা হেসে ফেলেন , বলেন “চলো , পরে চিন্তা করবে ! ওদিকে লাল কেল্লা বন্ধ হয়ে যাবে যে ! “ লাল কেল্লা! কি অপূর্ব ! ২৫৬ একর জুড়ে তৈরী সপ্তদশ শতাব্দীতে প্রাচীর বেষ্টিত পুরোনো দিল্লী শহরে মুঘল সম্রাট শাহজাহান কর্তৃক নির্মিত একটি দুর্গ , ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত এই টি ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের রাজধানী , উচ্চ তা প্রায় ৩৩ মিটার , এটি উস্তাদ আহমেদ লহরী র সাহায্যে নির্মিত হয়। । ইসলামিক , হিন্দি পার্সিয়ান সব রকমের স্থপত্য সৌন্দর্য কে একত্র করে লাল বালি পাথর দিয়ে নির্মিত লাল কেল্লা !। কি অপূর্ব লাগছে সব কিছু ! দেওয়ালের বিস্তার …. ২.৫ কিলোমিটার , ধরে , সামনে পরিখা , যাতে শত্রূ পক্ষ আক্রমণ না করতে পারে , কত উঁচু দরজা , একেবারে ভেতরে মীনা বাজার , , লাল পাথরের নির্মল সৌন্দর্য বিকেলের গোধূলি তে কি মায়াময় দেখাচ্ছে , … তাদের কারো ফিরে যেতে ইচ্ছা করছে না , কত দিন ? কতদিন আগের কথা? তিনশো বছর হবে! সাকুল্যে! যাতায়াত ব্যবস্থা এত উন্নত ছিল না , উন্নত হয় নি বলা যায় …. মশাল নিয়ে রাত প্রহরী পাহারা দিচ্ছে , সন্ধ্যা তেলের কত শত প্রদীপ জ্বলে উঠছে , সম্রাট রয়েছেন, রয়েছেন রানী রা , কত সুন্দর পোশাক , তাদের , রয়েছে কত দাসী রা , ….. লোক লস্কর ,সেপাই ,হাবশী ,…. অস্ত্র শস্ত্র , কেমন তাদের পোশাক ,
আসবাব পত্র, পরনের গহনা , রান্নার ধরণ , কত তফাৎ আজকের কম্পিউটারের যুগের সাথে , কত আলাপ আলোচনা , র সাক্ষী এই লাল কেল্লা ! সময় হয়েগেছে , এবার দুর্গ বন্ধ হবে , রুম ঝুম তো ফিরতেই চায় না ……, কাল তারা যাবে যন্তর মন্তর ,,, আর হুমায়ুন এর সমাধি দেখতে । যন্তর মন্তর , ১৭২৪ সালে জয়পুরের মহারাজা এটি বানিয়ে ছিলেন , উঁচুতে এটি ৭২৩ ফুট , আক্ষরিক অৰ্থ এটি instrunments for measuring the harmony of the heavens …… অপূর্ব লাগছে নেত্রার , তৃনার , দাদা বৌদি রুম ঝুম অনেক দিন পরে বাইরে বেরোতে পেরে খুব খুশি ,…. খুশি ঐতিহাসিক স্থাপত্য র সাথে মাত্র কয়েক
ঘন্টার সাক্ষী হতে পেরে! কত উন্নত দেশ ছিল আমাদের ভারত , যেখানে শুধু লড়াই হয়ে যায় নি , ….. সমান ভাবে শিক্ষা র ও প্রচলন ছিল , গণিত পদার্থ বিদ্যা , জোতিষ শাস্ত্র সব। …. .. পৃথিবীর সাথে টক্কর দেওয়ার ক্ষমতা রাখতো , ভারত , এখনো রাখে ! হুমায়ুন , সম্রাটের সমাধি , বেগম বেগ বা বেগম এর সদিচ্ছায় ১৫৫৮ সালে গড়ে উঠেছিল এটি র দায়িত্বে ছিলেন মিরাক মির্জা ঘিয়াৎ , অপূর্ব বাগান দিয়ে ঘেরা , ওপরে চক চক করছে সোনা দিয়ে কিছুটা মোড়া রয়েছে গোলাকৃতি স্থপত্য টি , মাঝে সম্রাটের সমাধি ঘর , কত ছবি যে তুলেছে তারা ! বৌদি হাঁটতে পারে না তাড়াতাড়ি , …… দাদা বকছেন , আর তৃনা , নেত্রা হাসছে আড়ালে । কাল তারা যাবে আগ্রার দিকে , তাজ মহল দেখতে ! আগ্রা ! সেই আগ্রা ! যা সে ছোট্টবেলা থেকে স্বপ্ন দেখেছে , সে আগ্রার এ গেছে , ওখানে ঘুরছে … স্বপ্ন সত্যি হলো আজ ! বহু দুঃখ কষ্ট সহ্য করে সে বেঁচেছে , তৃনার বাবা নিখিল জেঠু ও তৃনার দাদার অসীম সাহায্যে সে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে ছে , প্রতি পদে পদে তাকে বিরক্ত করেছে , হেনস্থা করার চেষ্টা করেছে , তার নিজের বৈমাত্রেয় কাকা , তাকে , তার মা কে , মধ্য বিত্ত পরিবারে প্রাচুর্য না থাক , শান্তির অভাব ছিল না , ছোটবেলায় , বাবা ছিলেন প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক , মা গৃহ বধূ , ছোটবেলায় সে দাদু আর কাকা সবাই একসাথে থাকতো । দাদুর মৃত্যুর পর কাকা কেমন যেন পাল্টাতে থাকলো , চূড়ান্ত খারাপ ব্যবহার করেছে কাকা পরবর্তী কালে , তার সাথে , মার সাথে ,বাবার সাথেও । শুধু কি কাকা ?….. বাইরের পৃথিবী?………… মায়ের ইচ্ছা ছিল সে গান শিখুক , অল্প মাইনের দিদি মনি মুখের ওপর বলে গেছে , “ টাকা বাড়াতে বলবি!”চমকে গেছে সে ! ছোট্ট তেই ! শিক্ষা তাহলে টাকার সাথে যুক্ত ! পড়তে গেছে , সেখানেও একই অবস্থা …. আলাদা করে পড়া দেখানোর , বোঝানোর কেউ নেই , খাতা একদিন বেশি রাখবে না সহপাঠী ,…. যদি তার সাফল্যে ভাঁটা পরে! বাবার পেনশন ছাড়া আর কিছু ছিল না তাদের , … এগুলো তো বাইরের কথা , ভেতরে ? নিত্য দিন কাকা অত্যাচার করেছে , হাতের লেখা ভালো করার চেষ্টা করতো সে . ধরে ধরে , দিদিমনি বলেছেন , কে লিখে সাহায্য করে ? দিদি কে কি করে বলবে সে , কেউ নেই সাহায্য করার ! কাকা তখন
নিত্য দিন অশান্তি করে তার মায়ের সাথে , বাবার সাথে ,,, রাগ করে বই ছিঁড়ে দিয়েছে তার মাধ্যমিকের আগে ., …….. ভালো পেন্সিল ছিল কটা রং বেরঙের , সব কিভাবে চুরি করেছে ! তার শিশু মন রক্তাত্ত হয়েছে , তারপর তো চূড়ান্ত ঘটনা ঘটেই গেছে ! সেই রাত্রে নিখিল জেঠু . তৃনার বাবা , দাদা না বাঁচালে কি হতো সে নিজেই জানে না ! মানুষ এত স্বার্থপর , বেইমান হয় …. হতে পারে ! নিশ্চয় পারে , মানুষের মন অর্থ লিপ্সা তে ভরা …….. তাদের খারাপ হোক , ক্ষতি হোক , এই চাওয়া তো সে নিজের চোখে দেখেছে , তিল তিল করে তার মা বাবার গড়া সংসারে ভাঙ্গন এসেছে ,,, তৃনার দাদা সেই দুঃসময়ে তাকে বই
দিয়ে , বুঝিয়ে অনেক সাহায্য করেছে , কাকার দুর্ব্যবহার এর পরে বোধকরি তার বাবার শরীর টাই খারাপ হয়ে গেল ….. তত দিনে সে বড়ো হয়েছে, দরকারে ট্রেনে বাসে একা চলতে হয় , কত খারাপ ইসারা , ইংগিতের শিকার সে , ….. কারণ কি ? একটাই কারণ মেয়ে সে ! দাতেঁ দাঁত চেপে লড়াই চলেছে …… মা বাবার সদিচ্ছা আর দাদা . জেঠুর সাহায্য না থাকলে কোথায় তলিয়ে যেত সে . হিংসা নীচতার ক্রূর মূর্তি দেখেছে সে ছোট্ট বেলা থেকে ! ! তার নিজের দাঁড়াতে সময় লেগেছে , তার পরে বাড়ি দেখভাল , বাবার দেখভাল , মার অসুস্থতা কিভাবে যেন সময় কেটে গিয়েছে । মান আর হুঁশ থাকলে তবেই মানুষ , বাকি সব তো চার হাত পা ওয়ালা জন্তু সব ,……. তার প্রমান সে পয়তাল্লিশ বছর ধরে পেয়ে ছে , অন্ধকারাছন্ন রাস্তায় চলতে চলতে হঠাৎ সূর্য কিরণ এসেছে , কোনো কোনো সময় , যা তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে এত দিন , হয়তো
আরো বাঁচাবে , কিন্তু জীবনের যে অভিজ্ঞতা তার সঞ্চিত হয়েছে , তাতে বিয়ে , সংসার , শব্দ দুটির ওপর তার কি যে
ঘৃণা ! না সবাই খারাপ একথা সে বলবেই না! তবে মুচকি হেসে সর্ব ক্ষেত্রে দায় সারা ভাব যেন বড়ো বেশি , জলে , স্থলে , সর্বত্র ,….. এমন
হবার কথা ছিল নাকি ? সর্বত্র পাইয়ে দেওয়া আর পেয়ে যাওয়া র রাজনীতি ,!…… মাঝে মাঝে তার চোখে পরে হঠাৎ এক একটা বিজ্ঞাপন ! কোনও
Iit চাকুরী করা ছেলে বা মেয়ে সমাজের গরিব
দের জন্য কিছু করতে চায় , বা কোনো শহরে মেয়ে, সব অসুবিধা সহ্য করে সুন্দর বনে গিয়ে তাদের জন্য কিছু করতে চায় , এগুলো তার মনে কি যে আলো প্রজ্জ্বলিত করে ! ভালো
চিরকাল অল্প , কিন্তু এখন যেন সংখ্যা টা বড়ো অল্প ! যাক , ….. এসব তার নিজের ভাবনা চিন্তা !
আগ্রা কে সে যেন স্বাপ্ন দেখতো কতদিন ! সেই তাজ মহল! ২২ বছর লেগেছিলো মোটামুটি যা তৈরী হতে , ৪২
একর জমির ওপর যা অবস্থিত , ১৬৩২ সাল থেকে শুরু হয়ে যা শেষ হতে অনেক দিন লেগেছিলো , ২০০০০ জন মজুর , যারা অসীম কষ্ট করে , তৈরী করেছিলেন , ভারত ছাড়াও পারস্য , তদ সংলগ্ল দেশ , এমন কি ইউরোপ থেকেও এসেছিলেন
মনে করা হয় , শাহজাহান তার স্ত্রী কে অমর করার জন্য এটি নির্মানের সিদ্ধান্ত নেন, এটি ভারতীয় , ফার্সি , মুঘল স্থাপত্য ও ইসলামিক শৈলীর মিশ্রণ , চার টি মিনার সহ। যার গঠন শৈলী , অপূর্ব! অভূত পূর্ব ! ভালো বাসা সামান্য তম না থাকলে এটি রচনার কথা স্বপ্নেও আনতেন না সম্রাট ,…. এতো
শুধু রচনা নয় , হাজার শিল্পীর যেন হৃদয় অৰ্ঘ ! দুধ সাদা মার্বেল পাথর দিয়ে রচিত , একে রচনা ছাড়া কিছু বলতেই পারছে না তৃনা , ….সেই মার্বেল ওপরে কত লেখা , সুদৃশ্য লতা পাতা, ফুলের সমাহার , লেখা গুলো পড়ার সাধ্য তার নেই , ! ভেতরে সম্রাটের , মহারানীর সমাধি , … দুটি আলোর বাতি জ্বলছে , তাদের প্রেমের সাক্ষর …… বাইরে বিশাল গম্বুজ। … সূর্যের আলোতে ঝলমল করছে , একে কেন্দ্র করে চার টি। … বিশাল … মিনার … দেখে আর চোখ ফেরে না কারো ! চিরকালীন নারী পুরুষের প্রেমের স্বাক্ষর বহন করছে ! প্রেম! শব্দটার অৰ্থ নেত্রার কাছে আলাদা কিছু অৰ্থ বহন করে না , কিন্তু তৃনা?….. সে বুকের মাঝে কি নিয়ে চলছে? …. কি নিয়ে বেঁচে আছে ? … পাশাপাশি বাড়ি , ছোট্ট থেকে বেড়ে উঠেছে তারা একসাথে , বয়সে নেত্রা এক বছরের বড়ো , কত বয়স তখন তৃনার ? বাইশে পড়েছে বোধহয় , …. পড়তে যেত এক সুদর্শনের কাছে , কৌশিক দা , যে অঙ্ক তে পিএইচডি করছে , … একটু দূরে তে বাড়ি , অঙ্ক দেখাতে যেত সে , তারপর … যা হয় .. দুজন কে দুজনার পছন্দ খুব …. কিন্তু বাড়ির কেউ জানে না ,,, আর নিখিল জেঠু ,তৃনার বাবা , খুব করা ধাতের , ২৩
বছরের নেত্রার চোখে ধরা পড়েছিল সব , কৌশিক দা খুব অবস্থা পন্ন ঘরের ছেলে , ওর বাবা মাও খুব কড়া ধাতের মানুষ , এ বিয়ে কখনো হবে কিনা নেত্রার সন্দেহ ছিল ! ঠিক তাই ! ভগবানের ইচ্ছা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা ! কৌশিকদার মা বুঝতে পারলেন
, তাদের এই সম্পর্কের কথা, কৌশিকদার বাবা , মা তৃনাকে কি চূড়ান্ত অপমান করে গেলেন , , নিখিল জেঠু কে ও , তৃনার মা কেও ছাড় দেন নি , … এটাও বলে গেলেন …. তারা বামন হয়ে যেন চাঁদে হাত না বাড়ান ! কি লজ্জা ! পাড়ার সবাই জানলো ! তৃনার পড়া শোনা বন্ধ হবার অবস্থা ! বাবার , মার বকুনি তে সে একেবারে বিধ্বস্ত , আসলে প্রথম প্রেম যে কোথায় কাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় ! সত্যি ! ভাসানোই বটে! তৃনা তার কাছে কেঁদে হালকা হতো ,,, আর
তারপর ? নেত্রা শুধু বোঝাতো তাকে , পড়াতে মন দিতে বলতো , যোগাযোগ বন্ধ হয়েছে তখন কৌশিকদার সাথে , … তখন তো এত
হাতে হাতে মোবাইল ছিল না , চিঠি ছিল ভাব প্রকাশের মাধ্যম , আর তারপর ! এল সেই কালান্তক খবর , কৌশিক দার ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়েছে , … ডাক এসেছে ওপর থেকে ! ছয় মাসের মধ্যে বড়োলোক বাবা মার সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে কৌশিক দা পরপারে পাড়ি জমালেন , ! সেদিন তৃনার অবস্থা ! ২৩ বছর কে সান্তনা দিচ্ছে ২৪
বছর , … নেত্রা যে ছোট্ট থেকে সংসারের কালো রূপ
দেখেছে , কিন্তু তৃনা তো সংসার অনভিজ্ঞ , বাবা মা
দাদার আদরের …. সেই রাত্রে নেত্রা কাছে থেকে না বোঝালে বোধকরি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেত এই মেয়ে টির . ভগবান যে বড়ো কষ্ট দিলেন তার ছোট বেলার সঙ্গী কে …. “ অন্তর কে বাইরের আক্রমণ থেকে বাঁচাও …… দুই এ মিশিয়ে এক করে দেখো না , সমস্ত কেই কেবল মাত্র সংসারের অন্তর্গত করে জেনো না , , তা যদি করো
, তবে সংসার সংকট থেকে উদ্ধার পাবার কোনো রাস্তা খুঁজে পাবে না ,… থেকে থেকে ঘোরতর কর্ম সংঘাতের মাঝখানেই নিজের অন্তর কে নির্লিপ্ত বলে অনুভব করো। ……….. সংসার তার , শরীর তার , বুদ্ধি তাঁর হৃদয় তাঁর …… এমনি করে সমস্ত কর্ম থেকে , সংসার থেকে সমস্ত ক্ষোভ থেকে বিবিক্ত করে আত্মা কে যখন বিশুদ্ধ রূপে জানি তখন দেখতে পাই তা শূন্য নয় “…….. গুরুদেবের কথা বলতে বলতে , বোঝাতে বোঝাতে জল গড়িয়েছে নেত্রার চোখে ,. সারা রাত কেঁদে ভাসিয়েছে তৃনা … কাঁদুক …ও কেঁদে হালকা হোক , ভালো বাসা ! এ কথার মানে যে অনেক বড়ো ! “ হে আমার চিরদিনের অধি স্বর , তোমার জন্য দুঃখ পেলাম এই কথা জানাবার সুখ যে তুমিই দেবে , ……… হে বন্ধু তোমার জন্য দুঃখ পেলেম এই কথা জানাবার সুখ যে তুমিই দেবে , অসত মা সদ্গ ময় ,……… অসত্যে জড়িয়ে আছি , তোমার সাথে মিললে তবে সত্য হবো , তোমার সঙ্গে সত্যে মিলন হবে , জ্ঞানের জ্যোতি তে মিলন হবে , মৃত্যুর পথ মাড়িয়ে অমৃতলোকে মিলন হবে ।”, সময় হয়তো ভুলিয়ে দেবে সব ! বা কিছুই ভোলাবে না!
এ আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগের ঘটনা ! সেই থেকে তৃনা সামলে চলেছে নিজেকে , বুকের কষ্ট , হাহাকার সব
জানেন অন্তর্যামী ! অঙ্ক দিদির বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই , না তার কাছে বিয়ের কথা আর বলেনি কেউ , দুই বন্ধু সুখ দুঃখের ভাগিদার , দাদা বৌদিও সব জানে ,….. তৃনাও পারলে একটা তাজ মহল বানিয়ে ফেলতো কি তার কৌশিকদার জন্য ! …….. সে অন্তরে বানিয়ে রেখেছে , নেত্রা জানে !, ….. কাল তারা যাবে আগ্রা ফোর্ট আর ফতে পুর , সিক্রি দেখতে । এটি মূলতঃ রাজপুত দের ছিল , পরবর্তী কালে মুঘল রা এটি দখল করেছিল , সম্রাট আকবর ১৫৬৫ থেকে ৭৩
সাল সময় কালে এটি নির্মাণ করেন ,…. এটি র মূল আকর্ষণ জাহাঙ্গীর মহল। যা সম্রাট তার নিজের ছেলের জন্য বানিয়ে ছিলেন , …. মতি মসজিদ , দেওয়ানি খাস , দেওয়ানি আম , যেখানে সম্রাট সাধারণ লোকেদের অভিযোগ শুনতেন , ….. সাদা পাথর , লাল পাথর বালি
দিয়ে তৈরী অপূর্ব সৃষ্টি , অপূর্ব রচনা ….. কত শ্রম , স্থপত্য নিপুণতা জড়িয়ে দেওয়ালে দেওয়ালে ,….. মহিষী দের জন্য রচিত খাস মহল , অনবদ্য মার্বেল পাথরের সাথে জড়িত ছিল দামি পাথর ও , …… চোখে না দেখলে বিশ্বাস হয় না , ….. নহবত খানা , বীরবল মহল , লাল বেলে পাথরের
অপূর্ব সৃষ্টি , জলাশয় দিয়ে ঘেরা , ….. বুলন্দ দরওয়াজা , যা ১৭৭ ফুট উঁচু , স্থপত্য বিদ্যা কে সংগীতের সুর , তাল লয় যেমন
ভাবে সর্বোচ্য সীমায় ওঠে ,…. সেই ভাবে উচ্চমার্গে উদযাপিত হয়েছিল পুরোনো ভারতে ! ! প্রতিটি প্রাসাদ কি অসাধারণ মনোযোগ সহকারে তৈরী শিল্পীদের , কুর্নিশ তাদের , যারা দিন রাত এক করে কত পরিশ্রমে বানিয়ে ছিলেন , ভারত ! , …. সম্পদশালী ভারত ,…. কতবার ভুলুন্ঠিত হয়েছে , আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে , তার মতো, তৃনার মতো , … কষ্ট হয়েছে ,. বুকে রক্ত ঝরেছে , কিন্তু পালায় নি কখনো , মঞ্চ ছেড়ে , এই বেঁচে থাকা , …. লেগে থাকা ই তো জীবন … এও গুরুদেবের কথা , . পুরো দেখা হলো না তাদের দিল্লি , আগ্রা ,… আবার পরে আসবে কাল, বাড়ি
ফেরার ট্রেন , পূর্বা এক্সপ্রেস ! কৃতজ্ঞতা রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধ

1 thought on “Mousumi Sarkar”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *