Manjusree Mondal

জিব ছোলা
কলমে মঞ্জুশ্রী মণ্ডল

শিরোনাম শুনেই নিশ্চিত হাসছো তাইতো? বেশ। পুরো লেখাটা শেষ অবধি পড়লেই এই হাসি আর থাকবে না।
আট-দশ বছর আগের কথা। ক্লাসের মধ্যে গিয়ে প্রতিদিনের মতোই খোঁজ নিলাম কোন বাচ্চাটি স্নান করেনি, দাঁত মাজেনি, মুখ ধোয় নি ইত্যাদি ইত্যাদি। এই ধরনের ঘটনা যে বাচ্চার মধ্যে দেখতে পাই আগে তাকে সেই পরামর্শ দেই এবং ধীরে ধীরে তাকে সংশোধনের পথে নিয়ে আসি।

এরকমই একদিন একটি বাচ্চা ক্লাস টু য়ে পড়ে। তাকে খোঁজ নিয়ে জানলাম সে ব্রাশ করে না ,জিব ছোলে না, মুখ ধোয় না। কোন কোন দিন স্নান করে না।
স্নান না করলে তাকে তৎক্ষণাৎ বাড়িতে পাঠাই স্নান করতে। মুখ ধোয়, কিন্তু দাঁত মাজে না ,জিব ছোলে না। শুধুই কুল কুচি করে মুখ ধুয়ে আসে।
বললাম তোকে তোর মা বকে না?
আমার মা নেই মৃদু স্বরে বলল ছেলেটি। শুনে মনটা আমার খুব খারাপ হয়ে গেল। বললাম তোর বাবাকে বলবি একটা ব্রাশ আর একটা জিব ছোলা কিনে দিতে।
দু এক দিন বাদে আবার খোঁজ নিলাম দাঁত মাজা ,জিব ছোলা করে কি না। সে জানালো তাকে জিব ছোলা কিনে দেয়নি।
বললাম তুই বলেছিলি?

-বলেছিলুম বাবাকে ,বলেছে পরে কিনে দেবো।
পরে আবার খোঁজ নিলাম , জিব ছুলছিস তো?
তখনো পর্যন্ত ওর বাবা ব্রাশ, জিব ছোলা কিনে দেয়নি তাই সে নিরুত্তর হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
বললাম তুই আবার বলবি বাবাকে। নিশ্চিত কিনে দেবেন ।তোর বাবা মনে হয় ভুলে গেছেন ।
সম্মতি জানাল ঘাড় নেড়ে।
তার দু এক দিন বাদে আবার খোঁজ নিলাম।বলল, ম্যাডাম আমার জিব কেটে গেছে।
বললাম কেন রে কি হয়েছে? জিব ছুলতে গিয়ে জিভ কেটে গেছে কেন?
বললাম যে, জিব ছুলতে গিয়ে আবার কারো জীব কেটে যায়?

বললাম তুই কি দিয়ে জিব ছুলেছিলি?
বলল বাঁশের চেরা অংশ দিয়ে।
শুনে আমি আকাশ থেকে পড়লাম।
কারণ ছেলেটি ছিল ভীষণ বাধ্য ও অনুগত ।পড়াশোনায় খুব ভাল ছিল তা নয় ।তবে খুব চেষ্টা করত। মা মারা যাওয়ার পর ওর বাবাই ভর্তি করতে এসেছিলেন ।এসে আমাকে দেখিয়ে বলেছিলেন এই ম্যাডামের কথা শুনবি কিছু জিজ্ঞেস করার থাকলে ম্যাডামকে জিজ্ঞেস করবি। চুপ করে থাকবি না।

ছেলেটি সত্যিই তাই করতো, ওর বাবার কথা মত ।আমার খুবই খুবই বাধ্য ছিল এবং চেষ্টা করত সবকিছু, না পারলেও ।ওর বাবাকে ছেলেটি ব্রাশ কিনতে বলেছিল কি না জানি না কিন্তু প্রথম প্রথম উনুনের ঘুঁটের পাশ দিয়ে দাঁত মেজে ছিল আর বাঁশের চোকলা অংশ দিয়ে জিব ছুলে ছিল।
আর সেজন্যই তার জিভ কেটে যায় ।আমি খুব কষ্ট পেলাম ওর কথাটা শুনে।

বললাম ঠিক আছে তোর বাবাকে আর বলতে হবে না। আমি কিনে দেবো ।পরের দিন একটা জিব ছোলা একটি ব্রাশ কিনে দিলাম। তারপর ও প্রতিদিন দাঁত মেজে ,জিব ছোলে। তেল মেখে জলে স্নান করে। এমন কোনো দিন গেছে ,শুধু তেল মেখে চলে এসেছে পরিষ্কার দেখাবে বলে। কিন্তু নিশ্চিত হয়ে যেতাম ও স্নান করেনি। তাই ওকে স্নান করতে পাঠাতাম ।সেদিনের পর কিন্তু ওরকম করে না ।নিয়মিত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে স্কুলে আসতো। গায়ের রংটা কালো ছিল কিন্তু খুবই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে আসত ।

যেদিন বাঁশের চোকলা দিয়ে জিব ঝুলে ছিল বলে আমাকে বলেছিল ম্যাডাম আমার জিভ কেটে গেছে সেদিন বুকটা আমার ফেটে গিয়েছিল ।একটি মাতৃহারা শিশু কতকিছু থেকে বঞ্চিত থাকে। বাবা তো কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, সবসময় খোঁজ রাখতে পারেন না ।আমি সেই ছেলেটার অভ্যাস পরিবর্তন করে সুস্থভাবে স্বাভাবিক ভাবে জীবন-যাপন করার নিয়ম ওর মধ্যে ঢোকাতে পেরে নিজেকে গর্ববোধ করি। ছেলেটার নাম আজ আর মনে নেই।

কিন্তু মনে আছে ওর মুখটা ,মনে আছে ওর স্বভাব সিদ্ধ নিরীহ ,শান্ত, ভদ্র, অবয়বটা। এরকম কত কত শিশু সন্তান ছোটবেলা থেকে উপযুক্ত পরামর্শ ,উপদেশ এর অভাবে স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারে না।
ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি কোন শিশুকে শৈশবেই মাতৃহারা বা পিতৃহারা করো না।

কলমে মঞ্জুশ্রী মণ্ডল
২১/৬/২০২২

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *