Franz Kafka

ফ্রান্_ৎস কাফকা

প্রবন্ধ

ফ্রান্‌ৎস কাফকা

শংকর ব্রহ্ম

পঞ্চম পর্ব

       কাফকাকে দেখার এই প্রতিষ্ঠিত ঢঙ, কাফকা-ব্যাখ্যার সময় শব্দচয়নের এই যে চিরচেনা ভঙ্গী, রোনাল্ড হেয়ম্যানের বইয়ের ‘কাফকা’ নামের পাশে নির্ঘণ্টের এই যে ক্লিশে ভুক্তিগুলো, এর নামই ‘কাফকা-মিথ’। আমরা যত যা-ই বলি না কেন, আমাদের ঐ কাফকা-মিথই ভালো লাগে, মিথের ঐ কাফকাকেই আমরা ভালোবাসি, পূজা করি, পছন্দ করি। তবে কথা হচ্ছে, এসব মিথের গোঁড়ায় আছে বিরাট গলদ এই কাফকা-মিথের অনেকটুকু সত্যিই মিথ বা অসত্য অনুমান।

      সত্য তাহলে কী, তা জানার জন্য আমাদের নির্মোহ চোখে তাকাতে হবে কাফকার জীবনের দিকে। কাফকার লেখাগুলো অসংখ্য আত্মজীবনীর উপাদানে ভরপুর (কিন্তু তার মানে এমন না যে কাফকার সাহিত্যকর্ম তাঁর কোনো লুকানো-সাজানো আত্মজীবনী)। কাফকা আসলে বলেওছিলেন যে, তাঁর কোনো কোনো লেখা ‘সত্যিই একদম ব্যক্তিগত স্বভাবের কিছু হিজিবিজি কাটা বা খসড়া নোট টোকার বেশি কিছু না’। কিন্তু জীবনকে সাহিত্যে পরিণত করার তাঁর যে মূল লক্ষ্য ছিল, সেখানে তিনি ঠিকই ঐ ব্যক্তিগত পর্যায়কে অতিক্রম করে, সমগ্র মানব-অস্তিত্বের মৌলিক চেহারাটিই তুলে ধরতে চেয়েছিলেন, চেয়েছিলেন ‘পৃথিবীকে তার শুদ্ধ, সত্য ও অপরিবর্তনীয় রূপে তুলে ধরতে’ (ডায়েরি, ২৫ সেপ্টেম্বর, ১৯১৭)।

কাফকাকে নিয়ে তৈরি হওয়া মিথগুলো খণ্ডানোর জায়গা এটা নয়, আর তা সাধারণ বাঙালি পাঠকের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছুও নয়। মিথ বলি, আর সত্যই বলি, এই ‘ভূমিকা’র উদ্দেশ্য পরিষ্কার:
১). কাফকার জীবনের মূল দিকগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা (তাতে যদি কোনো-না-কোনো মিথ এমনিতেই খণ্ডানো হয়ে যায়, তো ভাল), যাতে করে তাঁর সময়কার সমাজ, রাজনীতি ও তাঁর ব্যক্তিজীবনের নানা ঘটনা থেকে পাঠকের কাফকা বুঝতে কিছুটা সুবিধা হয়;
২). কাফকা-সাহিত্যের নানা ব্যাখ্যা ও তত্ত্ব কিছুটা ছুঁয়ে যাওয়া যাতে করে পাঠক আরো আগ্রহী হয়ে ওঠেন ফ্রানৎস কাফকার জীবন ও সাহিত্যকর্ম বোঝার ব্যাপারে এবং এর সূত্র ধরে একসময় প্রবেশ করেন শুধু কাফকার নয় বরং সমগ্র আধুনিক বিশ্বসাহিত্যের বিশাল ভুবনে; এবং
৩). পাঠককে এ কথাটুকু বলা যে, যেমনটা আলব্যের কাম্যু বলেছিলেন, কাফকার মূল স্বাদ অনুভব করার জন্য তাঁর নিজের লেখা বারবার পড়তে হবে; আর তাঁকে নিয়ে লেখা যত কম পড়া যায় ততই ভালো। মিথের কাফকার বিষয়ে শুধু এটুকুই জানা ভাল যে তাঁকে নিয়ে বিশ্বসাহিত্যে এই এই মিথ বিদ্যমান আছে, কিন্তু মিথের কাফকা মাথায় রেখে কাফকা-পাঠ তাঁর সরল-সুন্দর গল্পগুলো পাঠের আনন্দ শুধু বাধাগ্রস্তই করবে।

কাফকার জীবনে প্রবেশের আগে আসুন আমরা শুধু একবার দেখে নিই প্রধান দশটি কাফকা-মিথ। আবারও বলছি, এখানে ‘মিথ’ বলতে বোঝানো হচ্ছে হয় অর্ধসত্য বা পুরো অসত্য কিছুকে। প্রতিটা মিথের পাশে ব্র্যাকেটে তা সত্য না অসত্য নাকি অর্ধসত্য সেটা বলে দেওয়া হলো:

১). কাফকা তাঁর জীবদ্দশায় লেখক হিসেবে বলতে গেলে অপরিচিত ছিলেন। লেখা প্রকাশে তাঁর ছিল বিরাট অনীহা (অর্ধসত্য)
২). কাফকা তাঁর সমস্ত লেখা ম্যাক্স ব্রডকে তাঁর মৃত্যুর পরে পুড়িয়ে ফেলতে বলেছিলেন (সত্য)
৩). ভয়ংকর এক আমলাতান্ত্রিক চাকরি তাঁকে নিষ্পেষিত ও শেষ করে দিয়েছিল (অর্ধসত্য)
৪). কাফকার বাবা ছিলেন একজন নিষ্ঠুর একনায়ক; ভালো কিছুই ছিল না তাঁর বাবার মধ্যে (বিতর্কিত)
৫). কাফকা জীবনের বহু বছর যক্ষ্মা রোগে শয্যাশায়ী ছিলেন (সত্য)
৬). কাফকা তাঁর জীবনে আসা নারীদের সঙ্গে অসম্ভব রকমের সৎ ছিলেন। তিনি ছিলেন নিঃসঙ্গ ও অসহায় (অসত্য)
৭). প্রাগে জার্মানভাষী ইহুদি হিসেবে কাফকা ছিলেন দ্বিগুণ টানাপোড়েনে তিনি ছিলেন সংখ্যালঘুদের মধ্যেও সংখ্যালঘু; সংখ্যাগুরু চেকভাষীদের মধ্যে এক সংখ্যালঘু জার্মানভাষী লেখক এবং চারদিকের অসংখ্য খ্রিষ্টানের মধ্যে সংখ্যালঘু এক ইহুদি (অর্ধসত্য)
৮). কাফকার সাহিত্যকর্ম তাঁর এই জোড়া সংখ্যালঘুত্বের ইহুদি অভিজ্ঞতা থেকেই লেখা। তাঁর লেখা বুঝতে হলে তাঁর ইহুদিত্বকে আগে বুঝতে হবে (বিতর্কিত সত্য)
৯). কাফকার সাহিত্যকর্ম, যতই অবিশ্বাস্য মনে হোক, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি বন্দিশিবিরের ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিল যুদ্ধের প্রায় কুড়ি বছর আগেই (সত্য, তবে ব্যাপারটি এমন নয়)
১০. নাৎসিরা কাফকার লেখা নিষিদ্ধ করেছিল এবং পুড়িয়ে ফেলেছিল (অর্ধসত্য; মূলত অসত্য)

২.
পরিবার

১৮৮৩ সালের জুলাই মাসের ৩ তারিখে ফ্রানৎস কাফকার জন্ম তখনকার অস্ট্রো হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের চেকোস্লোভাকিয়ার প্রাগে, এই প্রাচীন শহরটির ওল্ড টাউন স্কোয়ারের একদম কাছে। প্রাগ তখন বোহেমিয়া রাজ্যের রাজধানী। কাফকারা ছিলেন মধ্যবিত্ত, আশ্কেনাজি সম্প্রদায়ের ইহুদি। তাঁর বাবা হারমান কাফকা (১৮৫২-১৯৩১) ছিলেন ইয়াকব কাফকার চতুর্থ সন্তান; ইয়াকব পেশায় ছিলেন ধর্মীয় অনুশাসন-মানা কসাই। ইয়াকবই পরিবারটিকে দক্ষিণ বোহেমিয়ার ইহুদি অধ্যুষিত পল্লি ওসেক্ থেকে প্রাগে নিয়ে আসেন। কিছুদিন সেনাবাহিনীতে, কিছুদিন ভ্রাম্যমাণ সেলস্ম্যান হিসেবে কাটিয়ে হারমান কাফকা তাঁর স্যুভেনির, ফ্যান্সি জিনিসপত্র আর কাপড়চোপড়ের দোকান চালু করেন প্রাগে, ওল্ড টাউন স্কোয়ারে। তাঁর অফিসে কাজ করতেন ১৫ জন কর্মচারী (এতে বোঝা যায়, একদম ছোট ছিল না তাঁর ব্যবসা) আর তাঁর ব্যবসার লোগো ছিল দাঁড়কাক (চেক ভাষায় kavka)। কাফকার মা ছিলেন ইয়ুলি কাফকা (১৮৫৬-১৯৩৪), ইয়াকব লোউভি নামের এক প্রতিষ্ঠিত রিটেল ব্যবসায়ীর মেয়ে; শিক্ষার দিক থেকে তাঁর স্বামীর ওপরে।

কাফকার বাবা-মা বাসায় কথা বলতেন ইদ্দিশ (হিব্রু বর্ণমালায় লেখা আশ্কেনাজি ইহুদি মূল থেকে তৈরি হওয়া, গোঁড়া ইহুদিদের ব্যবহৃত হিব্রু ও সেমেটিক সংমিশ্র্রণের এক জার্মান ভাষার রূপ) ঘেঁষা এক জার্মান ভাষায়, কিন্তু ‘শিক্ষিত জার্মান’ ভাষা তখন যেহেতু ছিল সমাজে ও চাকরিতে উপরে ওঠার জন্য জরুরি, তাঁরা তাঁদের ছেলেমেয়েদের ‘শিক্ষিত জার্মান’ ভাষা শিখতেই অনুপ্রাণিত করতেন। কাফকারা ছিলেন মোট ছয় ভাই বোন, এঁদের মধ্যে ফ্রানৎস কাফকা সবার বড়। ফ্রানৎসের বয়স ছয় হওয়ার আগেই তাঁর অন্য দুই ভাই গেয়র্গ ও হেইনরিখ একদম শিশু বয়সেই মারা যান। এরপর জন্ম নেন ফ্রানৎসের তিন বোন: গ্যাব্রিয়েল, ডাকনাম এলি (১৮৮৯-১৯৪১); ভ্যালেরি, ডাকনাম ভাল্লি (১৮৯০-১৯৪২); ওটলি, ডাকনাম ওট্লা, আমৃত্যু বড় ভাই ফ্রানৎস কাফকার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠজন ছিলেন এই ওট্লা (১৮৯২-১৯৪৩)। তিন বোনের মৃত্যুসন দেখে নিশ্চয়ই আর বলতে হয় না যে এঁরা তিনজনই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে নাৎসি বন্দিশিবিরে প্রাণ হারান।

কাফকারা শুরুর দিকে থাকতেন একটা ছোট, ঠাসাঠাসি অ্যাপার্টমেন্টে। তাঁদের বাসায় এক কাজের মেয়ে থাকত (কাফকার বেশ কিছু গল্প ও তিনটি উপন্যাসে বাসার ঝি বা কাজের মেয়ের কথা বারবার ঘুরেফিরে আসে)। কাফকার ঘর প্রায়ই থাকত অনেক ঠান্ডা; প্রাগে বিদ্যুৎ তখনো আসেনি, হিটিং সিস্টেমের তো প্রশ্নই আসে না; প্রচণ্ড শীতে কয়লাই ছিল একমাত্র ভরসা।

১৯১৩-র নভেম্বরে কাফকা পরিবার বেশ বড় একটা অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে ওঠে (প্রায় সাত-আটবার বাসা বদল করেন হারমান কাফকা; সবগুলোই প্রাগের ওল্ড টাউন স্কোয়ারের আশপাশে), যদিও তত দিনে এলি ও ভাল্লির বিয়ে হয়ে গেছে এবং তাঁরা কাফকার অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে তাঁদের স্বামীদের সঙ্গে বাস করছেন। ১৯১৪-র আগস্টে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগেভাগে, এ দুই বোন বাবা-মায়ের বড় অ্যাপার্টমেন্টে ফেরত আসেন, যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে তাঁদের স্বামীরা কোথায় তা তাঁরা জানতেন না।

দুজনেরই তখন বাচ্চা কোলে। ফ্রানৎস কাফকা, তাঁর বয়স তখন ৩১, ভাল্লির ফেলে আসা নীরব নিশ্চুপ অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে ওঠেন; জীবনে এই প্রথম তাঁর একা থাকা। কাজের দিনগুলোতে বাবা-মা দুজনেই কাজে যেতেন, ইয়ুলি কাফকা মাঝেমধ্যে টানা ১২ ঘণ্টা কাজ করতেন স্বামীর দোকানে, ব্যবসা দেখাশোনায়। কাফকার শৈশব তাই ছিল মূলত তিন বোনের সঙ্গে, কিছুটা একা কাজের মেয়ে আর ঠিকা-ঝিদের হাতেই আসলে বেড়ে উঠেছিলেন এই চার ভাইবোন।

(ক্রমশঃ)

চতুর্থপর্বেরলিঙ্ক

https://www.facebook.com/100057519306055/posts/pfbid02GdUQPLYvyWVL4mPmvg8DaY2vVbmrX3o8JoXArNPB6tgh1UDaTi3BVePWcEJ6F5hel/

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *