Franz Kafka

ফ্রান্_ৎস কাফকা (1)

প্রবন্ধ

ফ্রান্‌ৎস কাফকা

শংকর ব্রহ্ম

চতুর্থ_পর্ব

সংযোজন

( ‘পাঠক সমাবেশ’ থেকে লেখকের ফ্রানৎস কাফকা: গল্পসমগ্র নামক প্রকাশিতব্য বইয়ের ভূমিকার অংশবিশেষ এখানে প্রকাশিত হলো।
ফ্রানৎস কাফকা: জীবন ও সাহিত্য- মাসরুর আরেফিন)

ফ্রানৎস কাফকার লেখায় সব বিচিত্র ও উদ্ভট ঘটনা ঘটে এমনভাবে, যেন ওগুলোতে অস্বাভাবিকতার কিছু নেই।
যেমন: গ্রেগর সামসা নামের এক সেলস্ম্যান এক সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে, সে একটা তেলাপোকায় পরিণত হয়ে গিয়েছে; কিন্তু বেচারা তখনো ভাবছে অফিসে যাওয়ার ট্রেনটা যেন আবার মিস না হয়ে যায় (গল্প ‘রূপান্তর’); জোসেফ কে. নামের এক নিরপরাধ ব্যাংকারকে একদিন সকালে অজানা এক অপরাধের দায়ে দুজন সরকারি এজেন্ট আকস্মিক গ্রেপ্তার করে বসে। কে.র প্রতিবেশী মহিলার ঘরে তার একটা ছোটখাটো বিচার হয়ে যায়।

তাকে কেউ গ্রেপ্তার করে কোথাও নিয়ে যায় না, শুধু ‘মুক্ত’ভাবে ঘোরাফেরা করার অনুমতি আর পরবর্তী নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করার আদেশ দেওয়া হয় তাকে (উপন্যাস বিচার); কে. নামের এক ভূমিজরিপকারী ভদ্রলোক সারা জীবন ধরে ব্যর্থ চেষ্টা করে যায় গ্রামের শাসকদের দুর্গ বলে পরিচিত রহস্যময় এক দুর্গের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেখা করার আর তার এই গ্রামে অবস্থানের আইনগত স্বীকৃতি ও অনুমতি পাওয়ার (উপন্যাস দুর্গ); এক অদ্ভুতদর্শন মেশিন আক্ষরিক অর্থেই দণ্ডিত আসামিদের গায়ে শত শত সুই দিয়ে নকশা করে লিখে দেয় তাদের অপরাধের কথা, ওভাবেই নির্মম মৃত্যু হয় আসামিদের (গল্প ‘দ- উপনিবেশে’); এক লোক সারা জীবন আইনের দরজার বাইরে অপেক্ষা করে থাকে ভেতরে ঢোকার জন্য, তারপর যখন সে মারা যাচ্ছে, তাকে বলা হয়, এই দরজাটা শুধু তার জন্যই বানানো হয়েছিল (গল্প, ‘আইনের দরজায়’); এক ব্যবসায়ী ছেলে বিয়ে করে স্বাধীনভাবে সংসার করতে চায় আর এতে খেপে গিয়ে তার বৃদ্ধ বাবা, জীর্ণ নোংরা আন্ডারওয়ার পরা এক ক্ষমতা-উন্মাদ বুড়ো, ছেলেকে পানিতে ডুবে মরার মৃত্যুদ- দিয়ে বসেন (গল্প ‘রায়’); এক বৃদ্ধ গ্রাম্য ডাক্তার গভীর রাতে আজব এক ঘোড়াগাড়িতে চড়ে, তার নিজের বাসার কাজের মেয়েটাকে ধর্ষণোদ্যত এক লোকের হাতে ফেলে রেখে রোগী দেখতে যান দূরের গাঁয়ে, রোগীর শরীরে জ্বলজ্বল করছে ফুলের মতো একটা ক্ষত, আর সেখানে কিলবিল করছে পোকা, আর গ্রামবাসীরা ডাক্তারের রোগ সারানোর ব্যর্থতার শাস্তি হিসেবে এই অসহায় ডাক্তারকে শুইয়ে দেয় বিছানায়, রোগীর পাশে (গল্প ‘এক গ্রাম্য ডাক্তার’); সম্রাটের বার্তা নিয়ে এক বাহক কোনো দিনই পৌঁছাতে পারে না তার গন্তব্যে, পথে শুধু বাধা আর বাধা, আক্ষরিক অর্থে গোলকধাঁধার মতো (গল্প ‘সম্রাটের কাছ থেকে একটি বার্তা’); এক লোকের পেশাই হচ্ছে না খেয়ে থাকা, ক্ষুধা-শিল্পী সে, একদিন ওভাবে উপোস করেই সে মারা যায়, আর মরার আগে বলে যায়, তার খাওয়ার মতো কোনো খাবার এই পৃথিবীতে নেই বলেই অনশনই ছিল তার শিল্প (গল্প, ‘এক অনশন-শিল্পী’); এক কিশোর ছেলে, কার্ল রসমান, বাসার কাজের মেয়ের গর্ভে অবৈধ সন্তানের জন্ম দিলে তার বাবা-মা তাকে অভিবাসীদের জাহাজে তুলে আমেরিকায় পাঠিয়ে দেন, এবার এই ভিনদেশে শুরু হয় তার নানা বিচারের বারবার মুখোমুখি হওয়া (উপন্যাস আমেরিকা, প্রথম অধ্যায় এ বইয়ের ‘দি স্টোকার’); এক মেয়ে ইঁদুর, নাম জোসেফিন, মঞ্চে গান গায়, তার জাতির একমাত্র আশা-ভরসা সে, এমনটাই তার দাবি, আর আমরা তার জীবনের গল্পটি শুনি এক কথকের মুখে যে জোসেফিনের দাবিগুলোর প্রতি সন্দিহান কিন্তু একই সঙ্গে বিস্ময়বিমুগ্ধ যে মঞ্চের বাইরের এই অতি সাধারণ মেয়ে ইঁদুরটি মঞ্চে কেন এত পূজনীয় (কাফকার শেষতম গল্প ‘গায়িকা জোসেফিন অথবা ইঁদুর-জাতি’)।

              বলে শেষ করা যাবে না কীসব বিচিত্র, আপাত-অর্থহীন, মানসিক ও শারীরিক নৃশংসতার ঘটনা অবলীলায় ঘটে যেতে থাকে কাফকার গল্পের পরে গল্পে, ডায়েরির পাতায় পাতায়; বারবার মনে হয়, সবটা দুঃস্বপ্নে ঘটছে, সবটাতে গল্পের চরিত্রেরা যেন অন্ধকারের মধ্যে হাতড়ে বেড়াচ্ছে তাদের জীবনের মানে, কিংবা খুঁজে ফিরছে সৃষ্টিকর্তার সাহায্যের হাত, মালিকের অনুগ্রহ বা শাসকের কৃপাদৃষ্টি। নাকি পুরোটাই ঠাট্টা, নাকি পুরোটাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে-পরের ইউরোপিয়ান অনিশ্চিতির এক গদ্যকবিতা, তখনকার সামাজিক-বাস্তবতার এক কমিক উপস্থাপন (এখানে মনে পড়ে যায় ১৯০৮-এর দিকে চার্লি চ্যাপলিন-হ্যাট-পরা কাফকার বিখ্যাত ছবিটার কথা; চ্যাপলিন বাস্তবেই প্রিয় ছিল কাফকার)?

     কতভাবেই-না কাফকা পড়া যায় - ডাক্তারি শাস্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে যেমন কাফকা পড়ার চল আছে (অর্থাৎ কাফকার ‘ক্লিনিক্যাল ব্যাখ্যা’), তেমনি শ্রেণীবৈষম্যের দৃষ্টিকোণ থেকেও কাফকাকে নিয়ে লেখা হয়েছে কয়েক'শ বই (কাফকার ‘ম্যার্ক্সিস্ট ব্যাখ্যা’), আর তেমনই ফ্রয়েডীয় মনঃসমীক্ষণবাদী চোখ দিয়ে কাফকার প্রতিটা লাইন, এমনকি প্রতিটা শব্দের, আর কমা, সেমিকোলন ব্যবহারেরও ব্যাখ্যা হয়েছে কতবার (কাফকার ‘ফ্রয়েডীয় ব্যাখ্যা’)। আরো কত কত ব্যাখ্যা হয়েছে এই লেখকের লেখার থিম, তাঁর ব্যবহৃত ইমেজ ও লেখার আবহ নিয়ে- তার ইয়ত্তা নেই। তবে সবকিছু বলা হয়ে যাওয়ার পরেও, বারবারই, কাফকার পোস্টকার্ড ইমেজটি হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘যন্ত্রণা’ ও, ‘জ্বালা-পীড়া-দুঃখ-কষ্টে’র। রোনাল্ড হেয়ম্যানের ১৯৮১-তে প্রকাশিত যথেষ্ট বিখ্যাত কাফকা-জীবনীর একেবারে শেষে নির্ঘণ্ট অংশ ‘ফ্রানৎস কাফকা’ নামের পাশের ভুক্তিগুলোর দিকে তাকালে অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যায়:

কাফকা, ফ্রানৎস: ‘আত্মহত্যার বোধ’; ‘আত্মঘৃণা’; ‘আনন্দময় অভিজ্ঞতাগুলো মনে রাখতে পারার অক্ষমতা’; ‘শব্দের জ্বালাতনে পীড়িত’; ‘নিজেকে অপছন্দ করার বাধ্যতামূলক আচরণ’; এমনকি এক রহস্যময় ভুক্তি ‘জীবন যে খাদ্য দেয় তার প্রত্যাখ্যান’।


এটাই আমাদের সেই চিরচেনা কাফকা: খ্যাপাটে, যন্ত্রণাপীড়িত, আত্মবিশ্বাসহীন, নিজের প্রতি ঘৃণায় ভরা এক শিক্ষিত চেক যুবক, যার অদ্বিতীয় মেধার পূর্ণ স্বীকৃতি তাঁর নিজের সামান্য একচল্লিশ বছরের জীবদ্দশায় মেলেনি।


আরেকটু পণ্ডিতি ঢঙে বললে, আমাদের চিরচেনা কাফকার ছবিটা এমন: এক রহস্যময় প্রতিভা, নিঃসঙ্গ এক ইউরোপিয়ান নস্ত্রাদামুস্ (ভবিষ্যদ্বক্তা), যার সৃজনী-ক্ষমতাকে তাঁর সমকালীন লেখকেরা উপেক্ষা করেছিলেন আর যিনি ইহুদিদের প্রতি এক বৈরী পরিবেশে বাবার তাচ্ছিল্য ও অফিসের পীড়ন সয়ে নেমে গিয়েছিলেন তাঁর কুহকী সাধু-সন্তসুলভ চিন্তার গভীরতম প্রদেশে আর ওখান থেকেই দেখতে পেয়েছিলেন একদিন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবে, সোভিয়েত গুলাগ আসবে, আমলাতন্ত্র পৃথিবী জুড়ে আরো পোক্ত হবে এবং আধুনিক মানুষের জীবন জটিল থেকে আরো জটিলতর হয়ে উঠবে।

(ক্রমশঃ)

তৃতীয়পর্বেরলিঙ্ক

https://www.facebook.com/100057519306055/posts/pfbid0QUzFnwtfH6342x5GPtHwpmbmRxAnNBm4ozGzLNkehY5tyQDVTnPqjVK75Q4qVmvSl/
https://bangla-sahitya.com/post/

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *