Franz Kafka

Franz Kafka

প্রবন্ধ

ফ্রান্‌ৎস কাফকা

শংকর ব্রহ্ম

তৃতীয় পর্ব

         কাফকা যখন চাকরি করেন তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিল। তখন প্রাগের সকল যুবকদের বাধ্যতামূলক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে হতো। তবে কাফকা কে বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে হয়নি। তখন অফিসের ঊর্ধ্বতনেরা কাফকাকে এ প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘জরুরি প্রয়োজনীয় ব্যক্তি’ বলে ঘোষণা করেন।

      শুধু যুদ্ধই নয়, কাফকা প্রায় সময়ই অসুস্থ থাকতেন, তার জন্য তার অফিস তাঁকে দীর্ঘ দিনের ছুটিও দিত। শেষে কাফকা যখন শারিরীক অসুস্থতার জন্য আর চাকরি করতে পারছিলেন না তখন বীমা কোম্পানি তাকে পূর্ণ পেনশন দিয়ে চাকরি থেকে ইস্তফা দেয়, অথচ কাফকা সেই কোম্পানিতে চাকরি করেছিলেন মাত্র কয়েক বছর।

কাফকা তাঁর দু’টি চাকরি ছাড়া একবার ব্যবসা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। সেটিও ১৯১১ সাল তার বোন এলির স্বামী সাথে। তারা প্রাগে একটি মিল কারখানা খোলা মনস্থির করেন, এই ব্যবসার পূঁজি ছিল কাফকার বোনকে বিয়ে করার যৌতুকের টাকা।

কাফকা পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত পাল্টান এই ভেবে যে ব্যবসা করলে তার সাহিত্য চর্চায় ব্যাঘাত ঘটবে।
অফিস তাকে যুদ্ধ করার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিলেও। কাফকা যুদ্ধের স্বাদ কেমন তা চোখে দেখতে ১৯১৭ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার আগ্রহ দেখান, কিন্তু তত দিনে যক্ষ্মার কারণে ডাক্তারি দৃষ্টিকোণ থেকেই সেনাবাহিনী তাকে নিতে অপারগতা জানিয়ে দেয়।
ফানৎস কাফকার বাবা ‘হারমান কাফকা’

সবসময় ছিলেন নিষ্ঠুর, অনুভূতিশূন্য এক পিতা। তিনি সারাজীবন কাফকা কে আতঙ্কের মধ্যে রেখেছিলেন। কাফকার রূপান্তর উপন্যাসের পোকার মতোই তিনি তাকে কোনো সম্মান বা ভালোবাসা কোনেটাই দেননি। সবসময় ছেলেকে তিনি হুমকি ধমকি দিতেন। তুমি অপদার্থ তোমার দ্বারা কিচ্ছু হবে। এসব কথা শুনে কাফকা বড় হয়েছেন একজন আত্মবিশ্বাসহীন মানুষ হিসেবে।

১৯১৯ সালের নভেম্বরে কাফকা তার বাবার উদ্দেশ্যে ১০০ পাতার একটি দীর্ঘ চিঠি লেখেন। এই চিঠিটি বতমানে কাফকা প্রধান আত্মজীবনী মূলক রচনা। এই চিঠি লিখেছিলেন বাবার সঙ্গে তার সম্পর্কের দফারফা করতে। কিন্তু কাফকার মা ও বোন তাকে সেই চিঠি পাঠাতে নিষেধ করায় আর পাঠান নি।
এই চিঠিতে কাফকা লিখেছেন তার রাগী বদমেজাজি বাবার রূপ, তিনি কিভাবে তাকে তাড়া করতেন, কিভাবে তাকে হুমকি ধমকি দিয়ে বলতেন, ‘আমি তোমাকে মাছের মতো করে টুকরো টুকরো করবো’।
একবার রাতে কাফকা কান্না করায় তার বাবা তাকে বিছানা থেকে তুলে বাড়ির পেছনের বারান্দায় সারা রাত দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন। বাহিরে ছিলো তখন কনকনে ঠান্ডা। সেদিন কাফকার মনে হয়েছিল বাবার কাছে তিনি অতি তুচ্ছ জিনিস।

কাফকার সাথেই যে তিনি শুধু খারাপ ব্যবহার করতেন তা নয়। কাফকার বাবা তার দোকানের কর্মচারীদের সাথেও জুলুম করতেন। এজন্য কয়েকজন চাকরি থেকে ইস্তফাও দিয়েছিল।
বাবা কে কাফকা মনে করত দৈত্য। তার পাশে নিজেকে দাঁড় করালে নিজেকে মনে হতো কোন জীবন্ত কঙ্কাল। বাবাকে অনুকরণ করতে ব্যর্থ হয়ে কাফকা তাঁর অক্ষমতার জন্য নিজেকেই দোষী ভাবতে শুরু করলেন; তার নিজের সারাংশ “তোমার জন্য , বাবা , আমি আমার আত্মবিশ্বাস হারিয়েছি , বিনিময়ে পেয়েছি এক সীমাহীন অপরাধবোধ।”

ফ্রানৎস কাফকা তার জীবনের শেষ দিকে যখন কপর্দকশূন্য মেয়ে ইউলি ওরিৎসেককে বিয়ে করতে চাইলেন, তখন তার বাবা ক্ষেপে গেলেন। কাফকার ভাষায়, তার বাবা তাকে বললেন: ‘মেয়েটা খুব সম্ভব তার ব্লাউজ একটুখানি উঠিয়েছে, প্রাগের ইহুদি মেয়েগুলো যেভাবে ওঠায় আর কি, আর তুমি? তুমি মজে গেলে, ঠিক করলে ঐ মুহূর্তেই তাকে বিয়ে করবে। তোমাকে আমি একবারেই বুঝি না। তুমি বড় হয়েছ, শহরে থাকছ, কিন্তু তোমার চলার পথে দেখা হওয়া প্রথম মেয়েটাকে বিয়ে করা ছাড়া অন্য কিছুর কথা ভাবতে পারছ না।

অন্য কোনো ‘রাস্তা’ কি তোমার নেই? এইসব জায়গায় যেতে যদি তোমার ভয় লাগে , আমি তোমাকে সাথে নিয়ে যাব। অর্থাৎ তার বাবা তাকে পতিতালয়ে যাওয়ার কথা বলছেন। অথচ কাফকা এটিকে পৃথিবীর সবচেয়ে নোংরা জায়গা বলে ভাবতেন।
কাফকা কোন বিষয়ে পড়াশোনা করবেন এই ব্যাপারে তার বাবা তাকে স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। কিন্তু কাফকার কাছে এই স্বাধীনতা ছিল অর্থহীন। যে অপরাধবোধ ও হীনমন্যতা তার বাবা তার মনে ঢুকিয়ে দিয়েছিলো তাতে তিনি পড়াশোনা করে আনন্দ পেতেন না।

কাফকার আত্মবিশ্বাস ছিলো একদম তলানীতে প্রতিবার পরীক্ষার আগে ভাবতেন তিনি পাশ করতে পারবেন না। তবুও তিনি পাশ করে গেছেন কখনও ফেল করেন নি।
বাবার মানসিক চাপ থেকে নিস্তার পেতেই কাফকা সাহিত্যে ডুব দিয়েছিলেন। তবে সব জায়গায় ঘুরেফিরে তার বাবা চলে আসত। কর্তৃত্বপরায়ণ বাবার মূর্তি কাফকার অন্যতম বিখ্যাত দুটো গল্পের মধ্যে দেখা যায় একটি ‘রায়’ আরেকটি হলো ‘রূপান্তর’।

প্রথম গল্পে দেখা যায় ছেলে বিয়ে করে স্বাধীন হতে চাইলে তার বুড়ো বাবা তাকে তার বিয়ের পাত্রী নিয়ে ওভাবেই খোঁটা দেন, যেভাবে হারমান তার ছেলেকে দিয়েছিলেন, যখন কাফকা ইউলি ওরিৎসেককে বিয়ে করতে চাইছিল। সেই গল্পে পরে এই বাবা ছেলেকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন।
দ্বিতীয় গল্পটিতে ছেলে পোকা হয়ে গেলে বাবাই একসময় তার গায়ে একটা আপেল ছুড়ে মেরে তার মৃত্যু নিশ্চিত করেন।

              ফ্রানৎস কাফকার মা ‘ইয়ুলি কাফকা’

কাফকার বাবার তুলনায় তার মা খুব শান্ত ও লাজুক এক মহিলা ছিলেন। কাফকার মা কে দেখা যায় তার স্বামীর সহকারী হিসেবে। তিনি তার সন্তানদের সঙ্গে খুবই ঘনিষ্ঠ তবুও বাবার অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা করতে তিনি ব্যর্থ।
কাফকার চিঠি দেখে বুঝা যায় তার মায়ের ভূমিকা ছিলো একজন অসহায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে। অসহায় কারণ তিনি পিষ্ট দু’দিকেরই চাপে। একদিকে তাঁর স্বামী, অন্যদিকে তার সাহায্যের জন্য তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকা তাঁর চার সন্তান।
কাফকা তাঁর বাবাকে এক চিঠিতে লিখেছিলেনঃ- আমরা তাকে ( মাকে ) সমানে হাতুড়ির বাড়ি মেরে যাচ্ছি, তোমার দিক থেকে তুমি, আমাদের দিক থেকে আমরা।

কাফকার দুটি গল্প – ‘ রায় ’ ও ‘রূপান্তরে’ও তার মায়ের চরিত্রটি পাওয়া যায়। রায় গল্পে মা মৃত। আর ‘ রূপান্তর ’ গল্পে তিনি তাঁর ‘ দুর্ভাগা ছেলের প্রতি মমতায় ভরা, কিন্তু ছেলের বিপদে জ্ঞান হারিয়ে ফেলা ছাড়া তার আর কোনো ভূমিকা নেই।
এছাড়াও কাফকার ডায়েরিতে ইয়ুলি কাফকাকে দেখা যায় ছেলের অদ্ভুত ব্যাপার-স্যাপারগুলো নিয়ে ঘ্যানঘ্যান করছেন, ছেলের বিরক্তি শুধুই বাড়াচ্ছেন আর তাকে বুঝতে পুরো ব্যর্থ হচ্ছেন। কাফকা ডায়েরিতে নালিশ জানাচ্ছেন যে তাঁর মা তাঁকে সাধারণ আর দশটা যুবকের মতোই ভাবেন , তাই ‘ ঘ্যানঘ্যান ‘ করেন তাঁর ছেলে কেন বিয়ে- থা করে সংসারী হচ্ছে না?
কাফকার ব্যক্তিগত জীবন, প্রেম ও যৌনতা
কাফকার সবচেয়ে কাছের বন্ধু ম্যাক্স ব্রডের ভাষায় কাফকা জীবনভর অবিরাম মেয়েদের পেছনে ছুটেছেন, তবে আর তার মধ্যে সব সময় কাজ করত ‘বিছানায় ব্যর্থ হওয়ার ভয়। ‘
কাফকা অনেকবার পতিতা সংসর্গ করেছেন, এমনকি পর্নোগ্রাফিতেও তার আগ্রহ ছিল।
কাফকার জীবনে প্রেম এসেছে মোট ছয় বার। প্রত্যেকটি প্রেমই একেকবার একেক রূপে এসেছে। তবে কাফকা বিয়ে করাকে জীবনের মুখ্যতম ব্যাপার বলে ভাবতেন।


কাফকার প্রথম প্রেমিকার নাম ছিলো ফেলিসা ব্রাউন। ১৯১৩ সালে মাঝামাঝিতে বন্ধু ম্যাক্স ব্রডের বাসায় তার দেখা হয়েছিল। ফেলিসা বয়সে কাফকা চেয়ে চার বছরের ছোট ছিল। সে বুদ্ধিদীপ্ত, অল্পবিস্তর পড়ালেখা করা , অনাকর্ষণীয় চেহারার, ভালো চাকরি করা বার্লিন শহরের মেয়ে ছিল। কাফকা তাকে ভক্তি করতেন, কিন্তু তার প্রতি কামনা বাসনা বোধ করতেন না।


ফেলিস যখন কাফকার সঙ্গে বিয়ে নিয়ে কথা বলেন কাফকা ভয় পেয়ে যান। তিনি আবার সাহিত্যে মননিবেশ করেন এবং বাবার দোকানের দেখাশোনায় সময় দেয়া শুরু করেন।
ফেলিস কাফকার খামখেয়ালি ও অবিশ্বস্ততার ওপর খুব বিরক্ত ছিলেন। তবুও ১৯১৪ সালের বারোই জুলাই তাদের বাগদান অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু ফেলিস তা ভেঙে দেয়। এরপর আবার তাদের যোগাযোগ শুরু হয় নতুন করে সম্পর্ক হয় আবার বাগদানের অনুষ্ঠান হয়। ১৯১৭ সালের জুলাই মাসে, সেটিও ভেস্তে যায়। এবার ভেঙে যাওয়ার কারণ ছিলো কাফকা গোপনে ফেলিসের বান্ধবী গ্রেটে ব্লখের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। গ্রেটে অবশ্য ইহুদি ধর্মাবলম্বী ছিল। কাফকার বন্ধু ম্যাক্স ব্রড দাবী করেন যে গ্রেটের গর্ভে কাফকার একটি পুত্র সন্তান হয় তা কাফকা জানতেন না। কাফকা গবেষকরা অবশ্য তা অস্বীকার করেন। তারা মনে করেন গ্রেটের সাথে কাফকার অতটা গভীর সম্পর্ক কখনোই হয়নি।
১৯২০ সালে অসুস্থ অবস্থায় থাকতেই কাফকা প্রেমে পড়েন চেক সাংবাদিক ও লেখক, সুন্দরী মিলেনা জেসেস্কার। মিলেনা জেনেস্কা Image source: Art though মিলেনার সঙ্গে সম্পর্ক চলার সময়েই কাফকা প্রাগের এক গরীব অশিক্ষিত হোটেল পরিচারিকা ইউলি ওরিৎসেকের প্রেমে পড়েন। ১৯১৯ সালের এক ছুটিতে তাদের পরিচয় হয়। ইউলির সম্পর্কে খুব একটা জানা যায় নি।


তাদের দুজনের মধ্যে বিয়ের জন্য বাগদান ও হয়, দুজনে একটা অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নেন এবং বিয়ের তারিখও ঠিক করেন। ইউলির সামাজিক অবস্থান ও জায়োনিস্ট আন্দোলনের ( ইহুদিদের স্বাধীন আবাসভূমি ইজরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ) প্রতি সমর্থনের কারণে কাফকার বাবা খেপে যান। এ ঘটনা থেকেই জন্ম হয় কাফকার বিখ্যাত বাবাকে লেখা ১০০ পৃষ্ঠার চিঠির।


একসময় ইউলিকে ছেড়ে মিলেনার দিকেই কাফকা বেশি ঝুঁকে পড়েন এবং ইউলির সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করেন। কাফকার শেষ প্রেমিকার নাম ডোরা ডিয়ামান্ট। ১৯২৩ সালের আগস্টে মৃত্যুর মাস দশেক আগে ডোরার সঙ্গে কাফকার পরিচয় হয় এক অবকাশযাপন কেন্দ্রে। ডোরার বয়স তখন পঁচিশ , কাফকার তখন চল্লিশ বছর বয়স। কাফকার চেয়ে পনেরো বছরের ছোট ছিল সে।
মনে করা হয় ডোরা কাফকাকে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টুকু উপহার দেন। ১৯২৪ সালে কাফকার মৃত্যুর সময় ডোরা তার পাশে ছিলেন। কাফকার লেখার কোনও কোনও অংশ এমন ধারণারও জন্ম দিয়েছে যে তিনি সম্ভবত সমকামী ছিলেন।


ফানৎস কাফকার ১৯১৭ সালের আগস্টে স্বরযন্ত্রের ক্ষয়রোগ ( যক্ষ্মা ) ধরা পড়ে। ১৯১৮ সালের অক্টোবরে তিনি স্প্যানিশ ফ্লুতেও আক্রান্ত হয়েছিলেন। সেবার প্রায় মরতে মরতে বেঁচে গিয়েছিলেন। স্প্যানিশ ফ্লুতে সেবার আড়াই লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল জার্মানতে। টানা কয়েক সপ্তাহ তার জ্বরের মধ্যে কেটেছিল, কখনো কখনো ১০৬ ডিগ্রি জ্বর থাকত। এই সময়টার বেশিরভাগ সময়ই কাফকা অজ্ঞান থাকতেন।
১৯১৭ সালের আগস্টের পর কাফকা তার বাবা- মায়ের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে আসেন, এরপর বোন ওলার কাছে, গ্রামে , গিয়ে থাকেন আট মাস। আবার ফিরে মায়ের কাছে, এরপর প্রাগ ও আধা – স্বাস্থ্যনিবাস ধরণের নানা হোটেলের মধ্যে বারবার আসা- যাওয়া। তারপর সত্যিকারের ডাক্তারি স্বাস্থ্যনিবাস হয়ে বার্লিনে ডোরা ডিয়ামান্টের সঙ্গে কয়েক মাস।


এরপর ১৯২৪ সালের মার্চে তিনি খুব অসুস্থ অবস্থায় বার্লিন থেকে প্রাগে ফিরে আসেন। এখানে পরিবারের সবাই , বিশেষ করে তাঁর প্রিয়তম ছোট বোন ওলা, তার দেখভাল করেন । ১০ এপ্রিল কাফকাকে নেওয়া হয় ভিয়েনার কাছে কিয়েরলিংয়ে ডক্টর হফমানের স্যানাটোরিয়ামে।
এই স্যানাটোরিয়ামেই ১৯২৪ – এর ৩ জুন কাফকা মৃত্যুবরণ করেন। না খেতে পারাই ছিল তার মৃত্যুর কারণ। গলার অবস্থা ক্ষয়রোগে এতই খারাপ হয়ে গিয়েছিল যে তিনি দীর্ঘদিন কোনোকিছু গলা দিয়ে নামাতে পারেননি, আর অন্য কোনোভাবে শরীরে খাবার ঢোকানোর পদ্ধতিও তখনও আবিষ্কার হয়নি।
স্যানাটোরিয়ামে ভর্তি থাকা অবস্থায় কাফকা তার বন্ধু ম্যাক্স ব্রডকে চিঠিতে লিখেছিলেন।

প্রিয় বন্ধু ম্যাক্স,

এবার হয়তো যক্ষ্মা আমার পিছু ছাড়ছে না । তাই তেমনভাবে লেখালেখিও আর করা হয়ে উঠছে না। তাই তোমার কাছে লেখা চিঠিতে আমার লেখাগুলোর ব্যাপারে কিছু বলতে চাই। আমার প্রকাশিত পাঁচটি বই আর ছোটগল্পগুলো হয়তো কালের স্রোতে হারিয়ে যাবে। জোর করে এর নতুন সংস্করণ বের করার দরকার নেই। যদি হারিয়ে না যায় হয়তো তাতে আমার করার কিছুই থাকবে না। আর আমার অপ্রকাশিত লেখাগুলোর ব্যাপারে বলছি, সবগুলো পাণ্ডুলিপি আর নোটবুক তুমি পুড়িয়ে দিও। যদি পারো আমার ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা চিঠিগুলো সংগ্রহ করে পুড়িয়ে দিও। পুড়িয়ে দেওয়ার আগে কেউ সেগুলো যেন পড়ে না দেখে সে ব্যাপারে আমার বিশেষ অনুরোধ রইলো। তবে তুমি সে অনুরোধের বাইরে। চিঠি পাওয়ার সাথে সাথেই হাতের কাছে থাকা আমার লেখার সবকয়টি পাতা পুড়িয়ে দিও। এই ব্যাপারে এটাই হয়তো তোমার কাছে আমার শেষ অনুরোধ।

ইতি
ফ্রানৎস কাফকা

ম্যাক্স ব্রড কথা রাখেনি। ভাগ্যিস ব্রড কথা রাখেননি। শুধু তাই নয় ব্রড কাফকার পুরনো লেখা গুলো নতুন করে ছাপানোর জন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেরিয়েছেন।
কাফকা তার ছোট জীবনের প্রায় সবটাই প্রাগে কাটিয়েছেন।এগারোই জুন তাকে সমাধিস্থ করা হল প্রাগের জেলিস্কেহো রেলস্টেশনের পাশে নতুন ইহুদি কবরস্থানে। প্রায় একশো লোক জড়ো হয়েছিল তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায়। বন্ধু ম্যাক্স ব্রড সেখানে মৃত্যুর গাথা পাঠ করেছিলেন। আর যখন শবাধারটি কবরে নামানো হচ্ছিল, ডোরা নিজেকে কবরের মধ্যে বারবার ছুড়ে ফেলতে চাইছিলেন।

বেঁচে থাকতে ফ্রানৎস কাফকা তার বাবা মায়ের কাছ থেকে মুক্তি পান নি, এমনকি মৃত্যুতেও না ; তারা আছেন তাঁর সঙ্গে একই কবরে, একই কবরফলকের নীচে।

(ক্রমশঃ)

দ্বিতীয়পর্বেরলিঙ্ক

https://www.facebook.com/100057519306055/posts/pfbid02NHKXpohxabxFz4nuqqXqugLxSYxnNcM1aZCLcpi7PYn1yNXTydpojxkFFjsPv7Y8l/

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *