Dr. Taimur Khan

এই কবিতাজীবন (ধারাবাহিক)
🐦
পর্ব-১১
তৈমুর খান
🍁
কষ্টরা দল বেঁধে এল

🍁

বাংলা অনার্সের ছাত্র, তবু অধিকাংশ সময়ই একাকিত্বের ভার সহ্য করেই চলতে হয়। জীবনের অনেক শূন্যতা ঢাকতে পারি না। আভিজাত্য তৈরিই হল না। টিউশান পড়তে পারি না। সহপাঠী আজাদ টিউশান পড়ে। মাঝে মাঝেই তার নোটসগুলো পড়তে দেয়। একবার চোখ বুলিয়ে নিলেই আমার হয়ে যায়। শুধু ছন্দটাই শিখতে পারি না। সাহিত্যের রূপরীতি লাইব্রেরি থেকে বই তুলে লিখে নিই। ভাষাতত্ত্বটাও বেশ কঠিন মনে হয়। নোজফুল স্যারকে কথায় কথায় একদিন সব জানালাম। স্যার বললেন, ‘সুনীলবরণ স্যারকে বলে দেবো বিনা বেতনে পড়ানোর জন্য। তুমি চলে যেয়ো।’

কিন্তু তবুও আমি যেতে পারলাম না। ভালো পোশাক-আশাক নেই। দু-পায়ের চপ্পলে দু-রকম ফিতে লাগানো আছে। একটাই জামা। রংচটা স্যুট আর সাদা পাজামা। অধিকাংশ মেয়েরাই টিউশান পড়ে। তারা তেমন পাত্তা দেয় না। ওদের কথাবার্তার সঙ্গে আমিও পেরে উঠি না। এক আড়ষ্টতা আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখে। তাই অনেকটাই মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে। শুধু বাগাল মুখার্জি কয়েকটি কবিতার ইংরেজি অনুবাদ করেছে, কিন্তু সেসবও কাউকে দেখাবার সুযোগ ও সাহস হয়নি। একদিন কী একটা কারণে কলেজ ছুটি হয়ে গেল। বাসস্ট্যান্ডে আমি আর সুমিত্রা নামে একটি মেয়ে বাস পেলাম না। প্রায় এক ঘণ্টা দেরি। কী করা যায় ভাবতে ভাবতেই একটা মিষ্টির দোকানে দু’জনে গিয়ে বসলাম। সেদিনই প্রথম সুমিত্রা আমার সঙ্গে কথা বলল।মিষ্টি খেতে খেতে দু’জনে পরস্পরে যে কথাবার্তা হয়েছিল তা আজও মনে আছে।

—তোমাকে অনেক দিন ধরেই একটা কথা বলব মনে করি, কিন্তু বলতে পারি না। কী মনে করবে জানি না!

—কিছুই মনে করব না, বলো কী বলবে? আমি তো গ্রামের ছেলে, শহরের মেয়েদের সঙ্গে মিশতে পারি না। তাছাড়া আমাদের অবস্থাও ভালো নয়। নানা কারণেই একা একা থাকি।

—ওই জন্যই তো তোমাকে ভালো লাগে! মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ হল চরিত্র। দ্যাখো অনেক বখাটে ছেলেরা একাধিক মেয়ের সাথে প্রেম করে বেড়ায়। বাবার পয়সা আছে তাই ফুর্তিরও অভাব নেই।

—সবই দেখি, কিন্তু ওদের নিয়ে ভাববার সময় পাই না। বরং তুমিও আলাদা। গ্রাম থেকে তুমিও আসো। এই আমার সঙ্গে কথা বলছ এর থেকেই তো বুঝতে পারছি তুমি কেমন। তা কী বলছিলে বলো?

—আজ থাক, অন্য কোনোদিন বলব।…

একথা বলতে বলতেই সুমিত্রার মুখ রাঙা হয়ে গেল। এক রকমের লজ্জায় সে মাথা নামিয়ে নিল।এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলা ভালো, সুমিত্রা ক্লাসের মধ্যে সবচেয়ে শান্ত ও নিরীহ মেয়ে। মুখশ্রী চমৎকার হলেও শরীরের রং একেবারে কালো। কোনো ছেলে বন্ধু যেমন তার নেই, তেমনি মেয়ে বান্ধবীও নেই। বাস অথবা ট্রেনে চেপে তাকে যাতায়াত করতে হয়। এর পরের দিনগুলিতে ওর সঙ্গে অনেক কথা বলতে পারতাম। একসাথে বাস অথবা ট্রেন স্টেশন পর্যন্ত যেতাম। একদিন বললাম, ‘সুমিত্রা, তোমার অলংকারের নোটসের খাতাটা একটু দেবে?’

সুমিত্রা বলল, ‘আগামিকাল নিয়ে আসব।’

পরের দিন যথারীতি খাতাটি আমাকে দিয়েছিল। তবে সবার সামনে নয়, বাসস্ট্যান্ডে এসে। দিয়ে বলেছিল, ‘বাড়ি ফিরে খুলবে, এখানে নয়।’

খুব কৌতূহল নিয়েই সেদিন বাড়ি এসে ওর খাতাখানি খুলেছিলাম। দীর্ঘ দু-পাতা জুড়ে একটি বিরাট কবিতা লিখে আমাকে তার মনের কথা জানিয়েছিল। এটিই ছিল আমার জীবনের কোনো মেয়ের থেকে প্রথম পাওয়া প্রেমের চিঠি। দীর্ঘ চিঠি থেকে কয়েকটি পংক্তি উদ্ধার করলে জানা যায় তার প্রেম নিবেদনের আকুলতা কতখানি। কী সে বলতে চেয়েছিল তা পীড়াপীড়ি করলেও সেদিন বলেনি। না বলার জন্য তার ওপর রাগও করেছিলাম। তাই চিঠির প্রথমেই সে আমার কথার প্রসঙ্গ তুলেই লিখেছে:

“শুধু শুধু রাগ করছ, মন ভাঙিনি তোমার

ক্ষমা চেয়ে তোমার কাছে ফিরে এসেছি আবার।

আমি হলাম মনভোমরা, মনে মনে উড়ি

মন ভাঙা কাজ নয়কো আমার, ফুলের পরাগ জুড়ি।

দোষ দিওনা সোনা আমার, প্রিয় আমার তুমি

জানতে যদি আমার কাছে কতটা তুমি দামি!

মনের কথা মনেই থাক, একদিন তুমি বুঝবে

একা একা তখন তুমি আমায় শুধু খুঁজবে।”

তারও এটাই ছিল ভালোবাসার লেখা প্রথম পত্র। তাই সে মন উজাড় করে অনেক কথা লিখেছিল। ভবিষ্যতের স্বপ্ন পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছিল। কী করে জীবনে সুখী হওয়া যায় তারও নির্দেশনা দিয়েছিল। চিঠির শেষ অংশে লিখেছিল:

“মনের ভেতর শুধুই তুমি, দেখি তোমার মুখ

তোমায় আমি ভুলব নাকো যতই আসুক দুখ।

প্রথম যেদিন দেখেছিলাম, সেদিনই মনের মাঝে

জায়গা তুমি করে নিয়েছ, তা বলতে পারিনি লাজে।

কত যে দাগ কেটেছ তুমি, হৃদয় জুড়ে ক্ষত

আমার আকাশ আলো করো পূর্ণ চাঁদের মতো।”

বেদনার কষ্টের আর রোমান্টিক উপলব্ধির প্রথম প্রেমের এই পত্রখানি আমি হারাইনি। এই প্রেম বহন করে অনেকদূর নিয়ে গেছি। এম এ পড়তে গিয়ে ভীষণ টানা পোড়েনের মধ্যে তখন দিন কাটাচ্ছি। বারবার পড়া ছেড়ে দেবার মতো পরিস্থিতি আমার। সেই মুহূর্তেই সুমিত্রার চিঠি পাই। তার বিয়ের সম্বন্ধ প্রায় পাকা। আমি তখন হোস্টেলে তীর্থের কাকের মতো। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের কাছে টাকা চাইছি মাসিক খরচের জন্য। চোখের সামনে শুধু অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই নেই। এই মুহূর্তেই সুমিত্রার আকুতি: ‘অন্তত একবার দেখা করো, একবার কিছু কথা বলতে চাই!’

কিন্তু আমি দেখা করতে পারিনি। ওর আকাশে পূর্ণচাঁদ হওয়ার মতো সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছিলাম। পরে শুনেছিলাম, বহু কষ্ট পেয়েই সে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিল। আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারিনি।

নোজফুল হক স্যারের কথা মতো পত্রিকার একটা নাম ঠিক করেছিলাম ‘বালার্ক’। আমি ছিলাম সহ-সম্পাদকীয় বিভাগে। প্রথম ও দ্বিতীয় সংখ্যায় লিখেছিলাম তিনটি করে কবিতা। স্বনামে একটি এবং ‘কমললতা’ ছদ্মনামে দুটি। পত্রিকার প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন নজির আহমেদ। সকালবেলার সূর্য উঠছে পুব আকাশে। গাছ-গাছালির পাতার ফাঁকে সোনালি রঙের রশ্মি তির্যকভাবে পড়ছে। নীল রঙের আকাশ। কিছু উড়ন্ত পাখির দৃশ্য। চমৎকার হয়েছিল। পত্রিকার বিজ্ঞাপন চেয়ে স্যারের সঙ্গে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরেছিলাম। মাত্র দুটি সংখ্যা ‘বালার্ক’ বেরিয়েই বন্ধ হয়ে যায়। যে কবিতাগুলি এই পত্রিকায় বেরিয়েছিল তা তুলে দিলাম, কেননা এগুলি কোনো কাব্যগ্রন্থেই ঠাঁই পায়নি।

“১

এখন নির্ভাবনায় মৃত্যু আসুক

——————————————————————–

এখন নির্ভাবনায় মৃত্যু আসুক।

সবকিছু দিয়েছি জলাঞ্জলি

ভালোবাসার আরসি ভেঙেছে টুকরো টুকরো—

বয়ঃসন্ধির উচ্ছল প্রেমে

শিয়রে আর ফুল ফোটে না

প্রিয়ার চোখে সীমাহীন অন্ধকার।

নিকুঞ্জ-কাননে কাঁদে কৃষ্ণের বাঁশি

নিসর্গ বেদনা প্লাবিত মাঠে

ফুঁসে ওঠে মহেঞ্জোদারো—

হতচ্ছায়া গুঞ্জরিত বাতাসের কানে

নাভিশ্বাস ওঠে।

কবে গুরু দ্রোণ ছুঁড়েছিল বাণ

আজ নিলাম হয়েছে দেহ

ক্ষয়ে গেছে পৌরুষ

নিরালম্ব বর্ষণের রক্ত ধোয়া পথে

শুরু হয়েছে এবার নদীর ভাঙন ।

হে কাপুরুষ

তোমার শিরাল শরীরের বিষণ্ণ ঊরু বেয়ে

শিহরনে কম্র গৃধ্রতা নাচে

সরওয়ারে সংবর্ত রূপহীন তমিস্রা

ছদ্ম বিলাসিতায় মরছে মানুষ

দুই ঠোঁটে তার তীব্র অ্যালকোহলের গন্ধ

পাশাপাশি তিরভর্তি তূণ

হিংস্র থাবা

রণভূমের লীলাক্ষেত্র

এখনো পড়া হয়নি ‘মোহাম্মদাং রসুলাং’

এখনো ‘ওঁ’ উচ্চারণে কোণঠাসা হয় মানুষ।

সব সমাচ্ছন্ন মানবতা জ্বলে ওঠে

প্রতিদিন পুড়ে ছাই হয়

শান্তি

ঐক্য

প্রেম

পৃথিবীর স্তব্ধ ডাকে উড়ে যায়

রক্তপায়ী সঙ্কুল শকুন।

বিশ্বাসের তুলসী তলায় জ্বালুক প্রদীপ

বাজক শঙ্খ ধ্বনি

সংঘর্ষের নিঃসৃত অভিযানে

এখন নির্ভাবনায় মৃত্যু আসুক ।

বলে যেতে হবে

————————————————–

তোমাকে ডাকতে পারি না

আজও,

কেবলই ভয় হয়

পাছে তুমি এসে চলে যাও।

তোমাকে বলতে পারি না

কোনো কথা

আজও,

কেবলই ভয় হয়

পাছে সব কথা ফেলে যাও।

শুধু শূন্যের টানে মিলে যাই

একাকী

একাকী

কতদূর

কতদূর

অমৃত নদী পার হয়ে যাই—

পদ্মনাভির দেশে ,

তোমাকে পেছন ফেলে যেতে হবে?

অথচ তোমার সুখের জন্যই

আমি চলে যাব

:

নদীর ভাঙনে

আদিম মানুষের ভোঁতা পাথারে,

বন্য শরীর….

জীবনের সব ভাষা হারা

পুঞ্জ পুঞ্জ ক্ষত—

মোম করে নিয়ে যাব

সাদা কাফনের মতো

লেফফায় ঢাকা।

তখন তোমাকে না ডাকলেও

তুমি আসবে

সেদিন

তখন তোমাকে কোনো কথা

না বললেও

সব কথা তোমার জানা।

তখন আমাকে খুঁজবে

তোমার দুই চোখের নদী

মৃত বন্যায়,

কুচি কুচি হাড়ের বালির ভিতর।

আমি তখন পাথর

একটা কথাও বলব না

আর।

তোমাকে আজ শুধু এটুকুই

বলে যেতে হবে।

দূরত্বের কাব্য

————————————————-

আজও আমি থেকে গেছি অচেনা

তোমাদের কাছে,

আজও কাছে থেকে চলে গেছি দূরে।

গবাক্ষের ঘুরপাক বাতাসে

হাজার পাতার কাঁপন বাজে

এসে এসে ফিরে যায়

নিথর শূন্যতা এঁকে মনের বাহিরে।

রক্তের নিরামিষ ভালোবাসা ব্যথাতুর দুই ঠোঁটে

ডাকিনি তো কাছে

কখনো বলিনি তোমাকে :

‘তুমি আমার ভালোবাসার রানি,

তোমায় আমি ছেড়ে যেতে পারি?’

তবু এমন অবিশ্বাসের চোখে দেখো

এমন ব্যবধান করে রাখো—

ফাঁকা হাত থেকে ফসকে নাও আঙুলগুলি

তারপর দুপুরবেলায় ঘুমোবার সময় হলে

‘ফক্কড় কবি’ বলে বাইরে যেতে বল আমাকে।

একটি চিলের সোনালি পালক ভেঙে পড়ে

ফুলের বন্দিত গান গায় না মৌমাছি

প্রেমের প্রেপসা ছিঁড়ে শ্মশানের মড়কের কাছে

তোমার তীব্র প্রলন্তনে অস্ফুট ভাসায়

গাহে গান…

আজও তাই প্রলম্বিত পথে

ভুলের ভষক হয়ে পারি না তো

ক্ষমা চেয়ে মানুষ হতে!

সব বসন্তে যে ফুল ফোটে না

তা জানো নাকো তুমি।

সব কবি যে প্রেমিক নয়

তা জানা নেই তোমার।

অথচ প্রেমিকও তোমার কাছে

কামুক হয়ে যায়।

আবিল অন্ধকারে শুয়ে থাকে কাপুরুষ

নির্জীব পুতুলের মতো।

তবু জেনো আমি একাকী সম্রাট

নাড়ির একাগ্র টানে বিচ্ছিন্ন কেন্দ্রভূমি

শতাব্দীর শিরাল শিকড়ে

দৈন্যের রাজ্যপাট মহাকাব্য হয়।

রণরঙ্গে তোমার সন্ধানে

আজও খুঁজি উদ্ভাবিত অচেতন মাঠে

অশ্বখুর— দিগ্বিজয় —মঙ্গোলীয় তরবারি—

আত্মহারা বিপ্লবের আহ্বান।

বাসন্তী রাতের নেশা রমণী-রমণ ভারে

এ কাব্য ছোঁবে না তোমাকে,

বরফের মতো জ্বরে

একাকী সে বসে থাকে

তোমাদের ঘরে।

আত্মসমর্পণে দাঁড়িয়ে আছি

——————————————————————–

এখন যুদ্ধ নেই তবু যুদ্ধক্ষেত্রে

একাকী আত্মসমর্পণে দাঁড়িয়ে আছি

নগ্ন ইতিহাস দাঁড়িয়ে আছে।

রক্তের মিশ্রণে ফোরাত নদীর উষ্ণ তৃষ্ণা

স্নায়ুর যন্ত্রণায় শুধু কারবালা

সীমারের বুকের মতো ধূসর মরুর বুকে

রক্তাক্ত সাখায়াত—

নিরাসক্তির শূন্য স্রোত বুকের ভিতরে বয়ে যায়—

শূন্য আকাশ — শূন্য প্রান্তর

মাঠে ঘাটে ঘাসে গাছের পাতায়

অবিচ্ছিন্ন নীরবতায় শব্দের শোহরত

হৃদয়ের স্পন্দনে বিভোল দোল ওঠে :

‘ফাবি ইয়াহি আলায়্যি রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান’

বেদাতের বিদাহি শ্মশানে সেজদায় নত হয় শির।

এখন যুদ্ধ নেই তবু যুদ্ধক্ষেত্রে

একাকী আত্মসমর্পণে দাঁড়িয়ে আছি।

এক তরুণী সন্ন্যাসিনীকে

——————————————————————–

হে সন্ন্যাসিনী, তুমি কী অপরূপ যন্ত্রণা পাও

বল বল বল

সহজ করে বল

কেন তুমি সন্ন্যাসিনী হয়ে যাও?

দুচোখে তোমার ধূসর কামনা কী যাতনা বিষ

দুহাত তোমার নির্লিপ্ত এমন নিথর বিবশ,

কেন ওগো অশ্রুতে এমন আলপনা এঁকে চলো

কী ব্যথা পাও

বল বল বল

তোমার আনত উচ্চারণে স্পষ্ট করে বল!

ব্যর্থতার কোলাহলে কী গান শুনেছ বারবার?

একা একা হেঁটে যেতে এত ভালোবাসো

কী সুখ পাও?

বাসন্তী রাতের কুয়াশায় মৃত স্বপ্নেরা

তোমার আলতো বুক ছুঁয়ে

অনাঘ্রাত অস্ফুট গন্ধে পাক খায়!

এ মাটির স্পর্শ তুমি চাও নাকো আর?

কখনো ধূলোর পরে তুলবে না ঝড়?

নদীর মতো চঞ্চল ভেঙে

যাবে না কি হারানোর খোঁজে?

বিস্মরণী সাগর তীরে বিদ্রুত জীবনের ভ্রষ্ট লগ্নগুলি

স্পন্দিত নিক্কণের স্মিত ঢেউ তুলে

হে নিষ্ঠিতা,স্বতঃই তুমি নেবে না ফিরে ফিরে?

বল বল বল

স্নিগ্ধ দীপ্ত উন্মেষিত ব্যগ্র দুই ঠোঁটে

পল্লবিত বাতাসের কানে

বঞ্চনার কোন অভিশাপে

তুমি এমন আকসার চলে যেতে পারো?

আজ পূজার পারুলবনে সন্ন্যাসিনী ফিরে এসো

ক্লেদ ক্লিষ্ট রক্তমাখা দেহে

উজ্জীবনে প্রেমে ধ্যানে সংসার সাধনে!

স্বপ্ন দেখতে নেই

————————————————————-

জীবনের সব নিমেষগুলি জ্বলে যায়

অনবরত জ্বলে যায়—

ভাতে হাত ডুবিয়ে উদরের ক্ষুধা শুকায়

জলে আর তেমন তৃষ্ণা মেটে না

শোকের জলসাঘরে দাঁড়িয়ে

বন্যায় ভেসে যেতে দেখি—

লাখো লাখো মানুষ।

কী হবে আর এমন কবিতা লিখে?

যেখানে আমি মৃত অর্ধমৃত

অথবা আছি আছি করে থেকেও নেই

এমন করে কী পাব কী পেয়েছি এতদিন?

আমার ঘরে সারারাত মোমবাতি জ্বলে গেছে

তবু তো কেউ আলো দিয়ে যায়নি—

সারারাত সাজগোজ করে বসে বসে আছি ;

অন্ধকারে সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে

হয়তো নিষ্কর্মা জোনাকিরা খুঁড়ে গেছে পথ ।

আমি বেদব্যাসের খোঁজে গেছি—

বাল্মীকির খোঁজে গেছি—

হোমারের খোঁজে গেছি—

কোথাও পাইনি তাদের সন্ধান।

হেলেনের আজ পায়ের খুরে রক্ত ঝরতে দেখি

পাথরের ঘর্ষণে

বেথো শাক খেয়ে বেঁচে থাকে দ্রৌপদী,

সীতাকে আর রাবণের প্রয়োজন নেই

সে এখন কাঠকুড়োয় বনে।

রোজ সকালে বিপ্লবের নামতা পড়তে পড়তে

ফিরে আসে বিপ্লবী নেতার দল,

লোকালয়ে —জলে ডুবে জল খায়

দরদের ধুলো মাখা গায়ে….

নতুন নতুন ঘর বানায়।

আমার সামনে বিকৃত বিপ্লব কেঁপে ওঠে

আদিমতার অন্ধকারে প্রতিদিন সূর্য ডুবে যায়,

পৃথিবীতে জেগে থাকে ছদ্ম-মানুষ

আর ভস্ম মানবতা।

এখানে কখনো স্বপ্ন দেখতে নেই।”

মোট ছটি কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল।

সেই সময় শব্দ ব্যবহারেও একটা দুঃসাহস ছিল। শিরাল শরীর, বিষণ্ণ ঊরু, কম্র গৃধ্রতা, সরওয়ারে সংবর্ত, রূপহীন তমিস্রা, সঙ্কুল শকুন, সংঘর্ষের নিঃসৃত অভিযান, পদ্মনাভির দেশ, ভোঁতা পাথার (পাথর নয়), লেফ্ফায় ঢাকা(যা লেফাফা), ফক্কড় কবি, প্রেপ্সা(প্রেপসা), প্রলন্তন, ভুলের ভষক, শিরাল শিকড়, রক্তাক্ত সাখায়াত(যা সাখাওয়াত), বেদাতের বিদাহি শ্মশান, বিস্মরণী সাগর, বিদ্রুত জীবন, স্পন্দিত নিক্কণের স্মিত ঢেউ, নিষ্ঠিতা, স্বতঃই, পূজার পারুল বন, বেথো শাক, দরদের ধুলো, ভস্ম মানবতা ইত্যাদি । এইসব শব্দ এখন আর ব্যবহার করি না। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল, এই শব্দগুলি বহুদিন পর দেখে নিজেকেই আর বিশ্বাস হচ্ছে না। স্যারদের পরামর্শ ছিল : “তুমি যেমনটি লিখেছ তেমনটিই থাকুক। ভোঁতা পাথারই হোক, আর লেফাফার বদলে লেফ্ফাই হোক।”এটিই ছিল আমার একমাত্র সাহস।

সেই সময় নোজফুল স্যারের বাড়িতে অনেক লোকেরই সমাগম হত। সবাইকে তিনি প্রাণ খুলে ভালোবাসতেন। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে কারও অন্তর্ঘাতী আচরণে তিনি ভীষণ ব্যথিত হয়েছিলেন। যার কারণে পত্রিকা এবং সাহিত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। তারও কিছুদিন পরে তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে খুব যন্ত্রণাদগ্ধ জীবন পার করেন এবং মাস তিনেকের মধ্যেই মাত্র ৪২ বছরে মৃত্যুবরণ করেন। আমরা প্রায় অভিভাবকহীন হয়ে পড়ি। যে মানুষটি আমাকে সাহিত্যে অভিষেক ঘটালেন, সেই মানুষটির হঠাৎ সাহিত্যবিমুখ হওয়া এবং পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার যন্ত্রণা আজও আমি ভুলতে পারিনি। ‘বাংলার চালচিত্র’ নামে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখছিলেন। সেটিও বই হিসেবে বের করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু তা আর হয়নি। দিশেহারা হয়ে বেশ কিছুদিন কাটাতে লাগলাম জীবন।

চলবে….

FA.png

আত্মগত গদ্য

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *