Deep Das

 Deep Das

কলেজস্ট্রিট

দীপ দাস

(১)

নীল !! নীল,বাবা নীল!!আরে ওট, সকাল গড়িয়ে দুপুর হতে এলো আর তুই এখনো পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছিস। বেলা ১২ টা বাজে এরপর স্নান করবি বা কখন? ব্রেকফাস্ট করবি বা কখন? (এরপর এত সবের মাঝে আমি আমার সুখের নিদ্রা ভঙ্গ করে বিছানায় উঠে বসলাম, সবেমাত্র অলস কাটানোর জন্য হাই তুলছিলাম) ঠিক সেই সময় আবারো আমার,

মা…… কিরে তোকে না কতবার বলেছি রাত জেগে গল্পের বই পড়বিনা !! আর আজ যে তোর কলেজস্ট্রিট যাবার কথা ছিল, সেটার কি হল?

নীল…… আরে যাব যাব ধুর দাঁড়াওনা সবকিছুর একটা পারফেক্ট সময়ে বলে কথা আছে নাকি।
মা…… আমি বাবা অত সব বুঝি না, তুই তোর পারফেক্ট সময় নিয়ে থাক, আমি গেলাম আমার কাজ সারতে
এরপর দেরি হয়ে যাবে।

নীল…. হ্যাঁ তো যাও না। এত সময় নিয়ে আমাকে কথা শোনানোর কি আছে??
মা… কথা তো আর এমনি এমনি শোনায় না তোকে, দিনের পর দিন উচ্ছন্নে যাচ্ছিস আর কিছু বললেই যত দোষ
আমার।
নীল……আরে ধুর তুমি যাও তো।
মা…… সে নয় যাচ্ছি তবে শেষবার মতএটাও বলে যাচ্ছি কলেজ স্ট্রিটে পড়ার বই কিনতে যাচ্ছে যাও কিন্তু
অহেতুক এক্সট্রা করে গল্পের বই কিনে নিয়ে আসবে না।
নীল…. আচ্ছা সে দেখা যাবে!
ও হ্যাঁ!! এত সবের মাঝে তো আমার ব্যাপারে কিছু বলাই হয়নি।আমার নাম নিলেশ রায়। ডাকনাম নীল,আর
ভালোবেসে সবাই নীল বলেই ডাকে। যদিও কেউ ভালোবাসার মতন নেই মানে বাবা মা ছাড়া সচরাচর যেটা হয়ে
থাকে আর কি!!! তবুও পারফেক্ট সময় এর অপেক্ষা করছি কবে ভালোবাসার মানুষের দেখা পাবো। আর যদি
জিজ্ঞাসা করেন ..কিভাবে দিন কাটে? তাহলে বলব, ওই প্রেমহীন প্রত্যেকটি মানুষের জীবনে অমূল্য একটি সম্বল
থাকে ।যেটাকে আশ্রয় করে মানুষ দিন কাটায় ।আমার ক্ষেত্রে সেটা হচ্ছে গল্পের বই ।ওই পড়ে দিনের দিন চলে
যাচ্ছে আর কি!! এরপর….
স্নান করে দুপুরের লাঞ্চটা সেরে কলেজ স্ট্রিট যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে রওনা দিলাম। আরে হ্যাঁ! মাঝে এটাও
বলে রাখি আমি হচ্ছি জুলজি অর্থাৎ প্রাণিবিদ্যা বিভাগের স্নাতক স্তরের বিধান নগর কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের
ছাত্র। গল্পের বই ছাড়াও পশুপাখি প্রতি ছোটবেলা দিয়ে একটা টান ছিল তাই জুলজি নেওয়া। কলেজ স্ট্রিটে
আসার উদ্দেশ্য হলো পড়ার বিষয় সংক্রান্ত কয়েকটা বই কেনা আর মাকে অজানা রেখে কয়েকটা গল্পের বই
কেনা। জানি এটা একদিক দিয়ে মিথ্যে বলা হলো। কিন্তু কি করবো বলুন নেশা তো নেশার মতই হয়। তাকে কি
আর দূরে সরিয়ে রাখা যায়। এরপর বাসটি যখন কলেজ স্ট্রীট এর মোড়ে এসে দাঁড়ালো। তখনই প্রথমেই কোন
কিছু চিন্তা ভাবনা ছাড়াই বাস থেকে নেমে, প্রথমেই রাস্তা পেরিয়ে উল্টোদিকে প্রেসিডেন্সি কলেজে গায়ে লাগোয়া
দোকান গুলোর দিকে যেতে লাগলাম গল্পের বই এর উদ্দেশ্যে। এরপর আস্তে আস্তে দোকানে দোকানে গিয়ে
বিভিন্ন রকমের গল্পের বই দেখছিলাম, ঠিক সেই সময় আমার পাশে একটি মেয়ে এসে দাঁড়ালো।ঠিক একই

উদ্দেশ্য নিয়ে সেও গল্পের বই দেখছিল। দেখে খুব ভালো লাগলো যে বর্তমানের এই মোবাইল আর সোশ্যাল
মিডিয়ার জগতে কেউ আমার মত গল্পের বই পড়তে ভালবাসে। মনে মনে ভাবছিলাম যে একবার কথা বলাই যায়
নাম জিজ্ঞাসা করায় যায় অথবা কি পড়তে ভালোবাসে ? জিজ্ঞাসা করা যায়। কিন্তু হঠাৎ মাথায় এলো… একি! কি
ভাবছি? আমি এসব! আমি একজন সম্পূর্ণ অচেনা ব্যক্তি তার কাছে এই ভেবে মনকে সান্তনা দিয়ে চুপ থাকলাম।
তারপর কিছুক্ষণ বাদে সেও চলে গেল অন্য দোকানে অন্য কিছু গল্পের সন্ধানে। এবার আমারও যাওয়ার পালা
এলো ,আমি সবেমাত্র দু পা এগিয়েছি হঠাৎই কি যেন পা -এ এসে লাগল। নিচের দিকে তাকিয়ে দেখলাম একটি
লেডিস পার্স পড়ে আছে। মুহুর্তের মধ্যে মাথায় প্রথম যে চিন্তাটি এল তবে কি এটি সেই মেয়েটির, মানে মেয়েটির
পার্স!! না না এ কী করে সম্ভব !সে তো কোন বই ক্রয় করিনি। কি জানি হয়তো কোন ভাবে পড়ে গিয়েছে, তবে কি
একবার হাতে নিয়ে দেখব। না না থাক হাতে নিলে আবার কি ভাববে কে জানে?!! এইসব চিন্তাই মাথায় ভ্রমণ
করতে থাকলো। এরই মাঝে একবার সাহস করে হাতে তুললাম নড়াচড়া করে দেখতে লাগলাম। আর আশেপাশে
দেখলাম মেয়েটি কোথাও নেই ততক্ষণে চলে গেছে। না!! এভাবে দেখছি হবে না, একবার খুলেই দেখি যদি ভেতরে
কিছু পরিচয় পত্র পাওয়া যায় তাহলে সুবিধা হবে। আর সাথে সাথে এও জানা যাবে যে পার্সটি সেই মেয়েটির নাকি
অন্য কারোর। সেরকম হলে যার পার্স তাকে নয় ফেরত দিয়ে একবার দেখে নিতে বলবো। এরপর পার্সটি খুলতেই,
যখন কলেজের আইডেন্টি কার্ড টি বার করে দেখলাম। তখন আইডেন্টি কার্ড এ ছবিটি দেখামাত্র আমার
আনন্দের আর সীমা রইল নাহ, হ্যাঁ এই তো সেই মেয়েটি যে আমার পাশে কিছুক্ষণ আগে দাঁড়িয়েছিল। তখন মনে
মনে ভাবতে লাগলাম তবে এটাই কি সেই পার্ফেক্ট টাইম যেটার জন্য আমি এতদিন অপেক্ষা করেছিলাম। স্বয়ং
বিধাতাও কি এটাই চান!!! এত সবের মাঝে ভুলে গেছিলাম মেয়েটির নাম ,নাম্বার দেখার কথা। তখন হঠাৎই এক
অজানা অচেনা মানুষের ধাক্কা খেয়ে ভাবনার জগৎ ছাড়িয়ে যেন পৃথিবীতে এসে উত্তীর্ণ হলাম। তারপর আর কি
দেখলাম আইডেন্টি কার্ডে বড় বড় করে লেখা নাম….. “অদিতি সেন”।
( ২)
বাহ !বেশ ভালই নামটা তো দেখছি, অদিতি মানে হচ্ছে কি……. কি যেন বেশ ,হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ….”যে উদার অথবা
বন্ধুত্বপূর্ণ”। ধুর! দেখো দেখো আমি আবারও আমার কল্পনার জগতে চলে যাচ্ছি। এতসব ভাবনার মাঝে এবার
আইডেন্টি কার্ড এ উল্লেখিত নাম্বারটা দিয়ে তাকে ফোন করলাম। ফোনটা কিছুক্ষণ বাজার পর,ফোনটা রিসিভ
হলো ওপার থেকে ভেসে এলো এক মৃদু, মিষ্টি শব্দ……”হ্যালো”! তৎক্ষণাৎ আমার বুকের হৃদস্পন্দনটা যেন দ্বিগুন
হয়ে গিয়েছে।
তারই উত্তরে আমি বললাম….. হ্যালো! হ্যাঁ শুনতে পাচ্ছেন !আমার নাম নিলেশ রায়।
উত্তরে….. হ্যাঁ শুনতে পাচ্ছি আমি ,আমার নাম অদিতি সেন।
….. হ্যাঁ, হ্যাঁ! সে আমি জানি। আমি এক্ষুনি আপনার নাম এই আপনার আইডেন্টি কার্ড এ দেখলাম। তা
আপনি আপনার এই ব্যাগটা ফেলে গেছেন ।আপনি যদি একটু দয়া করে বলেন কোথায় আমায় আসতে হবে বা
আপনি কোথায় আসবেন তাহলে একটু ভালো হতো।
….. হ্যাঁ আপনি এই হেয়ার স্কুলটি ছাড়িয়ে, যদি মেডিকেল কলেজের অপজিটে আসেন তাহলে খুব ভালো
হয় ।আমি তার অপজিটে দাঁড়িয়ে আছি।
…… হ্যাঁ,আপনি দাঁড়ান আমি আসছি বাকি কথাটা নয় ওখানেই হবে। আচ্ছা রাখলাম তাহলে।
…. হ্যাঁ।(ফোনটা কেটে গেল)

এরপর হাঁটতে হাঁটতে এসে পৌছালাম মেডিকেল কলেজের সামনে।রাস্তাটার উল্টোদিকে দেখলাম সেই মেয়েটি
দাঁড়িয়ে হাত দেখাচ্ছে আমাকে আর বলছে…….. “এই যে শুনছেন! এইদিকে ,এদিকে আমি”।(রাস্তাটা পার হয়ে
ওর সামনে এসে দাঁড়ালাম)।
…… আমি (অদিতি)জানতাম আপনি আসবেন।
….. জানতেন মানে। না ঠিক বুঝতে পারলাম না।(একটু হেসে) আপনি কি আগে দিয়েই জানতেন যে
আপনার ব্যাগটা আমি পাব।
….. আরে না না! সেটা না,ওই বললাম আর কি!
…. ও আচ্ছা তাই বলুন আমি ভাবলাম হয়তো আপনি আগে দিয়ে জানেন সব। এ নিন আপনার ব্যাগটা নিন
এতে আপনার সব দরকারি জিনিসপত্র আছে ।দেখে নিন একবার, সব ঠিকঠাক আছে তো??
…. না দেখার কোন প্রয়োজন নেই। আমি জানি সব ঠিকঠাক আছে।
…… আর সব ঠিকঠাক আছে মানে ?আমি তো আপনার কাছে একজন অচেনা অজানা ব্যক্তি
মাত্র।আপনার উচিত সব দেখে নেওয়া।
……….. ও ঠিক আছে সে নয় দেখে নেব ঘরে গিয়ে।
……… এ বাবা! ঘরে গিয়ে যদি কিছু না পান তখন কি করবেন???
…..হ্যাঁ এটাতো ভাববার বিষয়।। উম…… তাহলে এক কাজ করো আপনি আপনার নাম্বার টা আমাকে দিন।
আমি কিছু না পেলে আপনাকে জানানো হয়ে যাবে এবং সাথে আপনার যে একটা ট্রিট পাওনা রইল সেটাও হয়ে
যাবে।
… এ বাবা!!! না,না একদম না ট্রিট আমার লাগবেনা।
…. কেন, মেয়েদের টাকায় খেতে বুঝি লজ্জা করে???
…. আরে না না সেটা বলছি না। আপনি তো দেখছি আমায় কথার জালে ফাঁসাচ্ছেন।
অদিতি…. (অল্প হেসে)আর আপনি ফাঁসছেনও বুঝি!!
…… না সেটা না ।আসলে আপনি তো আমার কাছে একজন অচেনা,অজানা ব্যক্তি। তাই আর কি………।
….. আচ্ছা ঠিক আছে তাহলে নয় আজ থেকে আমরা বন্ধু। আর বাকি সবকিছু মানে দুজন দুজনের
ব্যাপারে , সে নয় আমি আর আপনি ফোনে কথা বলার মাধ্যমে এবং দ্বিতীয়বার সাক্ষাতের মাধ্যমে জেনে নেব।
…. হ্যাঁ ,এই প্রস্তাবটা মেনে নেওয়া যায়। তাহলে দ্বিতীয় বার দেখা হচ্ছে বলছেন???
অদিতি….. (উচ্ছ্বাস পূর্ণভাবে)হ্যাঁ ,অবশ্যই !!হচ্ছে বৈকি। আর এমনিও এই মোবাইলের আর অনলাইনে
জগতে এমন একজন গল্পের বই প্রেমী মানুষের সাথে আড্ডাটা কি মিস করা যায়!?!
……. আচ্ছা সে নয় বুঝলাম। তবে একটাই প্রশ্ন আমার মাথায় এখনো ঘুরে বেড়াচ্ছে কিছুতেই উত্তর খুঁজে
পাচ্ছি না।
…. কি প্রশ্ন???

………আমি যতটা জানি আপনি তো তখন কোন বই ক্রয় করেননি ওই দোকান দিয়ে তবে পার্সটা
আপনার ব্যাগ দিয়ে পরল কিভাবে???
অদিতি……(একটু লজ্জিতভাবে) সে উত্তর নয় আমার কাছে তোলা রইলো ।পরেরবার সাক্ষাতে নয় সে
উত্তর পেয়ে যাবেন। এখন যাই, সন্ধ্যা হতে এলো বাড়ি ফিরতে হবে যে। ভালো থাকবেন ,দেখা হচ্ছে ।। বাই!!!
…… হ্যাঁ, বাই দেখেশুনে বাড়ি ফিরবেন।
এরপর সে (অদিতি) রাস্তাটি পেরিয়ে হাঁটতে শুরু করল, কিছুক্ষণ হাঁটার পর সিগনালে দাঁড়িয়ে বাসের জন্য
অপেক্ষা করতে লাগলো। আমিও এবার বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্য নিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম ।কিছুক্ষণ হাঁটার পর
আনমনা হয় কি যেন কথা ভাবভাবছিলাম হঠাৎই মাথায় এলো অদিতি কি করে জানলে আমি গল্পের বই পড়তে
ভালোবাসি? আর সে এটাও কেন বলল ?যে ব্যাগটা কিভাবে পড়েছে ,সেটার উত্তর পরেরবার বলবে। আর সে
এটাও কিভাবে জানলো যে ব্যাগটা আমি পাব?? তবে কি সে আমার দেখার আগে আমাকে দেখেছে
দোকানটিতে?! তবে কি…., তাহলে কি…, অদিতি মানে অদিতি নিজেই……….।
এত সব ভাবনা চিন্তার মাঝে উত্তরটা পেলাম। আনন্দে এবং উচ্ছাস পূর্ণভাবে পেছনের ফিরে তাকাতেই দেখলাম
সে আর নেই।সে অনেক আগেই বাসে উঠে কলেজস্ট্রিট থেকে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে।

(সমাপ্ত)


দীপ দাস

(প্রাণিবিদ্যা,

চতুর্থ সেমিস্টার,

স্নাতক)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *