শব্দের আড়ালে – পর্ব ৬ // সুব্রত মজুমদার

Subrata Majumdar

সকালবেলা ঘুম হতে উঠেই হাঁক ছাড়লেন অঘোরবাবু,”পদ্দ…. চা নিয়ে এস।”
এরপর পাশের চেয়ারটার দিকে নজর যেতেই দেখলেন সেখানটা ফাঁকা। কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রে হাতে হাসিমুখে হাজির হল পদা। গরমগরম চা আর মাখনমাখানো ব্রেডটোষ্ট। টোষ্টে কামড় দিতে দিতে অঘোরবাবু বললেন, “তোমাদের বড় ইস্কুলের মাষ্টার গেলেন কোথায় ?”

অঘোরবাবুর কথায় যেন একটু লজ্জা পেল পদা। বলল, “সি গল্প শ্যাষ। শত্তুরে সব জানতি পেরেছে। দাবাবু গেইছে মর্ডিং করতে। সি বিহানবেলায়।”
অঘোরবাবু হাসলেন। মনে মনে বললেন, “মর্ডিং না ছাই, গিয়েছে তোমাদের সিড়িঙ্গে দৈত্যের খোঁজখবর নিতে। আজই শেষ, যদি কিছু করতে পারে তো করবে নইলে কাল সকালে উঠেই ঢঢনং কলিকাতা। সোজা ঘর।”

বেলা এক দেড়টা নাগাদ ফিরল বিক্রম। কালকে রাতের ঘটনা আর বিক্রমের ফিরতে দেরি হওয়া এই দুটো নিয়ে ভীষণ চিন্তিত ছিলেন অঘোরবাবু। দেশি ঘিয়ে ভাজা পরোটা আর ফুলকপির তরকারি মুখে তুলতেও পারছিলেন না তিনি। নলেনগুড়ের রসগোল্লাও কেমন যেন বিস্বাদ লাগছে। সবসময় বুক আইঢাই করছে, মনে একটাই চিন্তা, বিক্রমের কিছু হল না তো !

বিক্রম ফিরে আসতেই মুখে হাসি ফিরল অঘোরবাবুর। বললেন, “একটা ফোন তো করতে হয়।”
বিক্রম হেসে বলল, “আসলে এমন সব জায়গায় গিয়েছিলাম যেখান থেকে ফোন করার চিন্তাও মাথায় আসেনি। খাওয়া দাওয়ার পর আপনাকে নিয়ে একটু বেড়াতে যাব অঘোরবাবু। ঘুমিয়ে পড়বেন না যেন।”

মাথা নেড়ে সায় দিলেন অঘোরবাবু। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তা হল না। বিছানায় শুয়ে দিব্যি নাক ডাকতে শুরু করেছেন অঘোরবাবু। বাধ্য হয়ে একাই বেরিয়ে পড়ল বিক্রম। আজকেই একটা না একটা কিছু করতে হবে। অন্তরালে থেকে যিনি এই মাকড়শার জাল বুনছে তাকে বাগে আনতে হবে।

বিক্রম যখন ফিরে এল তখন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। চা দিতে এসে ঘুরে গিয়েছে পদা। বিক্রমকে দেখেই চা জলখাবারের ট্রেন হাতে ছুটে আসে।
পদাকে দেখেই বিক্রম বলল, “কাল সকালেই চলে যাচ্ছি পদাদা, আজ রাতে জম্পেশ করে কিছু খাইয়ে দাও।”

চায়ের কাপদুটো নামাতে নামাতে পদা বলল, “ফিরিজে মটন আছে। রাইতের বেলা মটনের রুগীজুস আর আলুপনিরের পরটা করে দুব।”
এতক্ষণে উঠে পড়েছেন অঘোরবাবু। সবকিছু শুনে বললেন, “রোগনজুস, উপাদেয় । তা বাবা পদ্দ, রোগনজুস শেষকালে রুগীজুসই হয়ে যাবে না তো। ”
-“সি আমি পারি। রাইতে খাইয়েই দ্যাখবেন।” অম্লান বদনে বলল পদা।

পদার দাবি মিথ্যা নয়, রাঁধতে সে পারে। রোগনজুসও বানিয়েছে একদম হোটেলের মতো। খেতে খেতে মুগ্ধ হয়ে গেলেন অঘোরবাবু। বললেন,”তুমি যা রেঁধেছ, একদম ফার্স্টক্লাস। হোটেলের রাঁধুনিও ফেল যায়। আরেকটা রুটি দাও তো।”
হটপট হতে একটা গরম রুটি বের করে অঘোরবাবুর পাতে দিল পদা। বিক্রমের প্লেটের দিকে একটা রুটি এগিয়ে দিতেই বিক্রম বলল, “কত্তামার নিকটাত্মীয় কেউ নেই ?”

-“ছেলেন তো, এক ছেলে। কচি বয়সে কত্তামার গয়নাগাটি বিককির করে ভেগেছে সি। ”
-“হুঁ ! আর আসেনি ?”
-“না দাবাবু। ”
-“আর হ্যাঁ, খাওয়া দাওয়ার পর একটু নিশ্চিন্তে ঘুমোতে চাই। সকালে উঠেই রওনা হতে হবে।”
মাথা নেড়ে রান্নাঘরে চলে গেল পদা। খাওয়াদাওয়া শেষ করে বিক্রম আর অঘোরবাবু গেল শুতে। ভরপেট খাবার খেয়ে নড়াচড়া করতেও কষ্ট হচ্ছে অঘোরবাবুর।
রাত ঠিক এক দেড়টা নাগাদ অঘোরবাবুকে ধাক্কা দিল বিক্রম,”অঘোরবাবু…. অঘোরবাবু…. ”
-“অ্যাঁ….. হ্যাঁ…. কে….. ও বিক্রম….”
ঠোঁটের কাছে তর্জনি এনে বিক্রম বলল, “আস্তে। চলুন দানো ধরব।”
-“বলো কি ! মরার ইচ্ছা হয়েছে ?”

বিক্রম হেসে বলল, “আমার সঙ্গে এসেই দেখুন।”
অঘোরবাবু আর বিক্রম চলল মূল বিল্ডিংয়ের দিকে। এককোনে দেওয়ালের গায়ে লেগে থাকা জলনিকাশি পাইপের কাছে এসে বিক্রম বলল,”উঠতে পারবেন ?”
অঘোরবাবু মাথা নেড়ে অপারগতা জানালেন। বিক্রম তখন পাইপবেয়ে উঠে চলে গেল সড়সড় করে। তারপর দোতলার বারান্দায় গিয়ে হারিয়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই খুলে গেল ঘরের দরজা। দোতলা হতে নেমে এসে দরজা খুলে দিয়েছে বিক্রম।
ঝটপট ভেতরে ঢুকে গেলেন অঘোরবাবু। এরপর বিক্রমকে অনুসরণ করে চললেন দোতলার দিকে। দোতলার বারান্দায় মৃদু আলো জ্বলছে। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে বোধহয়। দোতলা পেরিয়ে বিক্রম চলল তিনতলার দিকে। তিনতলার একদম শেষের ঘরটা হতে আলো আসছে।

-“এই ঘরগুলো তো খোলাই হয় না !!” সবিস্ময়ে বললেন অঘোরবাবু।
বিক্রম বলল, “চুপচাপ দেখে যান। আসুন….”
বিক্রমকে অনুসরণ করলেন অঘোরবাবু। তিনতলার খোলা দরজাটার সামনে দাঁড়াল ওরা। উঁকি দিতেই দেখা গেল একটা লোক গোটা ঘরজুড়ে কিছু একটা খুঁজে বেড়াচ্ছে। লোকটার সারাদেহ বোরখায় ঢাকা। মিনিট কুড়ির মধ্যেই অধৈর্য্য হয়ে উঠল লোকটা। মেঝেতে নামানো একটা বাক্সের উপর গালে হাত দিয়ে বসে পড়ল সে।
-“এত সহজেই হতাশ হলে হবে চন্দন ?” ব্যঙ্গ করে বলে উঠল বিক্রম।

লোকটা চমকে উঠল। মূহুর্তমধ্যে নিজেকে সামলে নিয়ে লাগালে দৌড়। সোজা ছাদের দিকে। বিক্রমও অনুসরণ করল লোকটাকে। অঘোরবাবুও ধুতি সামলে নিয়ে পিছু নিলেন।
বিক্রমদের ছাদে পৌঁছনোর আগেই একটা আর্তনাদ শোনা গেল। গিয়ে দেখাগেল গোটা ছাদ জুড়ে চলছে এক ভৌতিক নৃত্য। এবার আর সেই দৈত্য নয়, তার পরিবর্তে ডজনখানেক বেঁটেখাটো কঙ্কাল নৃত্য করছে। দেখেশুনে তো ওখানেই অজ্ঞান হয়ে গেলেন অঘোরবাবু।

চলবে….

 

https://www.facebook.com/storyandarticle/posts/179386513988658

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *