Barun Mondal

বরুণ মণ্ডল

লিটিল ম্যাগাজিন

প্রয়োজনীয়তা এবং সমস্যা

বরুণ মণ্ডল

রাণাঘাট, নদীয়া

প্রতিনিয়ত কতশত লিটল ম্যাগাজিন জন্ম নিচ্ছে এবং কত শত লিটিল ম্যাগাজিন অকালে মৃত্যুবরণ করছে। তবু লিটল ম্যাগাজিনের স্রোত আবহমান কাল ধরে চলে আসছে সাহিত্যের জগতে। শত সহস্র ঝড়-ঝাপটাকে অতিক্রম করে সাহিত্যিকের বীজ বপন করে চলেছে এই সমস্ত লিটিল ম্যাগাজিন। অথচ লিটিল ম্যাগাজিনকে নিয়ে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠিত এবং প্রথিতযশা সাহিত্যিকদের দুকলম লিখতে বড় কষ্ট।
প্রায় প্রতিটি খ্যাতনামা এবং প্রথিতযশা সাত্যিকের সাহিত্যের বীজ বপন হয়েছে কোন না কোন লিটিল ম্যাগাজিনে। কিন্তু সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলে কেউ আর ফিরে তাকায় না শুরুর সিঁড়িটির পানে। এ বড় আক্ষেপের বিষয়। সাহিত্যিকের মন এত সংকীর্ণ হবে কেন! মনের এত সংকীর্ণতা নিয়ে সাহিত্য রচনা করা কি সম্ভব?

মফঃস্বল এলাকার লিটল ম্যাগাজিনকে আরো অচ্ছুৎ তো ভাবা হয়। কলকাতা কেন্দ্রিক পত্রপত্রিকা যেন নীল রক্তের অভিজাতরা! কিন্তু এমনটা কেন হবে? গ্রাম বাংলার কাহিনী যদি সাহিত্যে সাবলীল ভাবে আনাগোনা করতে পারে, তবে গ্রাম বাংলার সাহিত্যিকরা কেন অপাংতেয় থাকবে?
লিটিল ম্যাগাজিন না বাঁচলে মফসল এলাকার সাহিত্য না বাঁচলে মূল ধারার সাহিত্য একদিন ফল্গু নদীর মত অপসংস্কৃতির মরুভূমিতে মিশে যাবে। মূল ধারার সাহিত্যের শিকড় লিটিল ম্যাগাজিনেই প্রোথিত আছে। তাইপৃষ্ঠপোষক তথা মাতৃসম লিটল ম্যাগাজিনকে হৃদয় দিয়ে শ্রদ্ধা করা উচিত। লিটল ম্যাগাজিনের অপমৃত্যু রোধ করা উচিত। এর জন্য পৃষ্ঠপোষক দরকার।

লিটল ম্যাগাজিন বাঁচিয়ে রাখার ক্ষেত্রে বিশেষ সমস্যা অর্থ। অনেক আশা নিয়ে একদল নতুন সাহিত্যিক নতুন নামে, নতুন উদ্যমে, লিটল ম্যাগাজিন তৈরি করেন। দুই একটি সংখ্যা প্রকাশ করার পর সমাজের তীব্র উন্নাসিকতা, প্রথিতযশাদের অবহেলা এবং পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অপমৃত্যু ঘটে। লিটল ম্যাগাজিন কেউ কিনতে চান না। কিছু লেখক, কবি আছেন যারা বিনি পয়সায় পত্রিকা দাবি করেন। সৌজন্য সংখ্যার দাবিদার প্রচুর। কিন্তু ছোট্ট একটা পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশ করতে বর্তমান পরিস্থিতিতে কত খরচ তার হিসাব কে রাখে! ফলে পত্রিকা বেশিরভাগ গছিয়ে দিতে হয়, ফলে প্রাপক পত্রিকা নিয়ে ধন্য করেন পত্রিকা দাতাকে; মূল্য দেওয়ার কোন প্রশ্নই আসে না। তবে ব্যাতিক্রমী দুই একজন অবশ্যই আছেন।
গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও ব্যক্তিদ্বন্দ্ব লিটল ম্যাগাজিনকে স্বল্প আয়ুর করে তুলেছে। সাধারণত অখ্যাতরা লিটিল ম্যাগাজিন প্রকাশ করেন। ফলে পত্রিকা কমিটির মধ্যে ইগোর লড়াই ফল্লু ধারার মতো বয়ে চলে। যেহেতু কেউ অসাধারণ নন, সেহেতু কেউ কারুর খবরদারি মানতে চান না। ভুল বোঝাবুঝি এবং খুঁত খোঁজাখুঁজি চলতেই থাকে। ফলে ‘সাহিত্যিক পরিবার’ একান্নবর্তী বৈশিষ্ট্য ছেড়ে সম্পাদক নির্ভর হয়ে পড়ে। সাহিত্যিক মনোভাবাপন্ন ব্যক্তি হওয়ায় ঝগড়াঝাঁটির পরিবর্তে পরিবারে তৈরি হয় বিভিন্ন রকম ‘অজুহাত’। অচিরেই পত্রিকা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়।

ব্যস্ত জীবন সুকুমার প্রবৃত্তিগুলিকে ধীরে ধীরে গ্রাস করছে। আজকাল সৃষ্টিশীলতার মূল্য কম। মোটিভেশন না পেলে সৃষ্টিশীলতা বজায় রাখা বড় কঠিন। ফলে যে সামান্য সুকুমার প্রবৃত্তি বেঁচে আছে, প্রশংসা স্বরূপ মোটিভেশন না পেয়ে সেগুলোও ধ্বংসের পথে। ফলতঃ লিটিল ম্যাগাজিনের চলার পথ বড় কঠিন হয়ে উঠেছে।

লিটল ম্যাগাজিনের পাঠক সেভাবে বাড়েনি, উপরন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে লিটিল ম্যাগাজিনের ভাগ্যকাশে কালো মেঘ বিরাজ করছে। অর্থাৎ
মোবাইল নির্ভর জীবন যাপন পত্র-পত্রিকার প্রয়োজনীয়তা অনেকটা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে যেখানে বড় পত্রপত্রিকাই বর্তমানে অসম প্রতিযোগিতার সঙ্গে লড়াই করছে, সেখানে লিটিল ম্যাগাজিনের হালটা সহজে অনুমান করা যায়।

পত্রপত্রিকার প্রধান পৃষ্ঠপোষক বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংস্থার বিজ্ঞাপন। লিটল ম্যাগাজিন যেহেতু কম সংখ্যক প্রকাশিত হয়, কম ব্যক্তির কাছে ‘সার্কুলেট’ হয় সে কারণে বিজ্ঞাপন দাতারা লিটল ম্যাগাজিনের কাছে পৃষ্ঠপোষক হয়ে ওঠেন না, তারা হয়ে ওঠেন ‘অনুদান দাতা’। ফলে অর্থনৈতিক ‘ক্রাইসিস’ থেকে লিটল ম্যাগাজিন কখনোই বেরিয়ে আসতে পারেনি।

সুকুমার প্রবৃত্তিকে জাগিয়ে এবং বাঁচিয়ে তুলতে না পারলে দশ এবং দেশের কখনোই ভালো হতে পারে না। আর সাহিত্যচর্চা সুকুমার প্রবৃত্তিকে লালন পালন করার অন্যতম মাধ্যম। সাহিত্যচর্চাটা শুরু হয় ছোট ছোট পত্রিকার মাধ্যমে। প্রাথমিক ভুলভ্রান্তি কাটিয়ে উঠে ‘সাহিত্যের বীজতলা’ লিটিল ম্যাগাজিনের সাহচর্যে বড় সাহিত্যিক হওয়া যায়। তাই লিটিল ম্যাগাজিনের সার্বজনীন পৃষ্ঠপোষকতা দরকার।

বরুণ মণ্ডল
তিলডাঙ্গা
রানাঘাট
নদীয়া
ভারত

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *