Baridbaran Gupta

Baridbaran Gupta

কোজাগরী

চাঁদ চলে সারা

সারা রাত

বারিদ বরন গুপ্ত

কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে ঠাকুমার মুখে শোনা সেই গল্প-“কোজাগরী চাঁদ চলে সারা সারা রাত !”কোজাগরী চাঁদ জানো গ্রাম বাংলার আকাশকে ঢেকে দিত, তার মাধুর্য ছড়িয়ে পড়তো গ্রাম বাংলার সুখী গৃহকোণে, স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম সমাজ যেন জেগে উঠতো কোজাগরী আরাধনায়! কোথায় গেল? কোথায় গেল? প্রশ্নই শুধু থেকে গেল, স্বয়ংসম্পূর্ণতা আজ উড়ে গেছে যান্ত্রিক সভ্যতার আড়ালে!

আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম সমাজ দেখিনি, দেখেছি স্বয়ং সম্পূর্ণ গ্রাম সমাজের ছায়া ! বাঙালির যত পূজা পার্বণ,আচার অনুষ্ঠান, সবই স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম সমাজকেই ঘিরে গড়ে উঠেছিল। গ্রামীণ অর্থনৈতিক বিকাশে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিল কৃষি, আর এই কৃষিকে ঘিরেই বেঁচে ছিল সম্পূর্ণ গ্রাম সমাজ। কৃষির উৎপাদন ব্যবস্থা কে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল শিল্প, গ্রামীণ কুটির শিল্প। উদ্দেশ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা কে রক্ষা করা, মানুষের জীবনযাত্রাকে নিরাপদ এবং অর্থবহ করে গড়ে তোলা, এক কথায় কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি হল স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম সমাজের অন্যতম চাবিকাঠি, আর এই কৃষি কে ঘিরেই নানান আচার-আচরণে বেধে ফেলেছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম সমাজ।

একে একে চলে গেল পাল-সেন, মুঘল জমানা! এলো বিটিশ! ব্রিটিশ শিল্প বাণিজ্য নীতির ঢেউ এসে তছনছ করে দিল স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম সমাজকে, গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থায় যে বাঁধন তা আলগা হয়ে গেল, জাতিভিত্তিক, পেশাভিত্তিক অর্থনীতি অচল হয়ে পড়ল, গ্রামীণ সমাজ জীবনে একটা টানাপোড়েন শুরু হলো ,এভাবেই চলতে থাকলো ব্রিটিশ ভারতের গ্রাম সমাজ।

স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত স্বয়ংসম্পূর্ণতা যে একেবারে মুছে গিয়েছিল তা কিন্তু বলা যাবেনা, তখনো ধিকি ধিকি করে চলছিল। স্বাধীনতার পরবর্তীকালেও স্বয়ংসম্পূর্ণতা সামান্য হলেও অবশিষ্ট ছিল, আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণতা দেখিনি, কিন্তু দেখেছি তার ছায়া! আমি আমার গ্রামের সম্পূর্ণতার ধ্বংস চিন্হ পরিষ্কার অনুভব করেছি। তাঁতি, কামার, কুমোর, সাকড়া ইত্যাদি জাতিগুলোকে দেখিনি, কিন্তু তাদের ভগ্ন বাড়ি ঘর, পুকুর এখনো পড়ে আছে । সেই হিসেবে পেশাগত পরিবর্তনশীলতার দিকে দৃষ্টিপাত করা যেতে পারে ! এই পরিপ্রেক্ষিতে উঠে আসে গ্রামীন সমাজ জীবনের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের দিকগুলি, বিভিন্ন লোকাচার যা গ্রামীণ জীবনকে বেঁধে রেখেছিল, তারমধ্যে অন্যতম হলো কোজাগরি পূর্ণিমা।

কোজাগরি হল জাগরণ, রাত্রি জাগরণ, পূর্ণিমার শোভায় মাখামাখি এক আলোকিত গ্রামীন জীবন! সত্যিই পূর্ণিমার চাঁদ এক সময় আলোকিত করত স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম সমাজকে! দেখেছি পূর্ণিমার দিন গোটা বাড়ির উঠোন গোবর দিয়ে শুদ্ধ করা হতো, শুদ্ধাচার হলো লক্ষীচার, বাড়ির দরজা থেকে লক্ষী ঘর পর্যন্ত আলপনায় রঙিন করা হতো! দেখেছি চালের গুড়ি বেঁটে কত সুন্দর রকমারি আলপনার কাজ! আজ শুধু চোখে ভাসে বারবার!

সকাল থেকেই শুরু হতো নানা আয়োজন, নাড়ু যে কত রকমের হতো, তিলের নাড়ু চালের নাড়ু নারকেলের নাড়ু, মুড়ি মুড়কির নাড়ু, লুচি,আরো কতো কি! শুদ্ধাচারের জন্য আলাদা রন্ধনশালা ছিল! সত্যি কথা বলতে কি এই কোজাগরি পূর্ণিমা উপলক্ষে গ্রাম বাংলার প্রতিটি গৃহে গৃহে একটা সাবেকী ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় ব্যবস্থাপনা বিরাজ করতো! এ সবই এসেছে সেই স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম সমাজের প্রাথমিক পর্ব থেকে, যার মূল ভিত্তি ছিল কৃষি!

কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে আমরা মেতে উঠতাম ঠাকুরদা ঠাকুমার সাথে, শুনতাম নানান গল্প-“কোজাগরী চাঁদ চলে সারা সারা রাত!” বলতেন এই চাঁদ দেখলে ঘরে লক্ষী লাভ হয়, এই কোজাগরী চাঁদ দেখেই এক রাজার লক্ষী লাভ হয়েছিল! রাজার লক্ষী লাভ হয়েছিল কিনা , তা অবশ্যই বিতর্কের বিষয়, তবে এইসব গল্প কাহিনী যে স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম সমাজকে প্রভাবিত করেছিল সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই!
পাল বা সেন পর্বে গ্রামবাংলায় দুর্গোৎসব শুরু হয়নি, বিভিন্ন ধর্মীয় আচরণের মতো কিন্তু কোজাগরী ছিল! আমরা সাত এর দশক পর্যন্ত গ্রামবাংলায় বিভিন্ন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান, ব্রতকথা পালিত হতে দেখেছি, আজকে তার অনেকটাই লুপ্ত হয়ে গেছে, কিংবা ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়েছে বা মাধুর্য হারিয়ে গেছে! এখনো গ্রামবাংলায় ধুম ধুম করে কোজাগরী পূর্ণিমা পালিত হয়, অনেক বাড়িতে লক্ষীর মৃন্ময়ী মূর্তি আসে। তবে একটা কথা সত্যি কি খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি! অর্থাৎ আচার-আচরণের মধ্যে অনেক পরিবর্তনশীলতা এসেছে কোজাগরীর মূল সুর হারিয়ে গেছে!

পরিবর্তনশীল সমাজের প্রেক্ষাপটে লক্ষী লাভের নানান পন্থা মানুষ আজ অর্জন করেছে! যার ফলে সাবেকি ধান ধারণা বা সুর পাল্টে গেছে! এখনো কোজাগরী পূর্ণিমা, বাছালক্ষী, পাতালক্ষী, পোষ,চোত, ভাদ্র মাসে গৃহে গৃহে লক্ষী আরাধনা হয়, প্রত্যেক বাড়িতেই কিছু না থাক, লক্ষ্মীর আটন আছেই! এ সবই স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম সমাজ থেকে পাওনা। তাই সবশেষে বলতে হয় স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম সমাজ থেকে উত্তরাধিকারী সূত্রে পাওনা হয়তো অনেক কিছুই আছে, তবুও হারিয়ে গেছে সেই রূপ, সেই সুর, কোথায় গেল? কোথায় গেল? উত্তর আর হয়তো মিলবে না কোনোকালে, শুধু কোজাগরীর রাতে ঠাকুমার কাছে শোনা সেই গল্পই কানে বাজেবে -“কোজাগরী চাঁদ চলে সারা সারা রাত!”

লেখক পরিচিতি:: বারিদ বরন গুপ্ত, মন্তেশ্বর পূর্ব বর্ধমান, কবি সাহিত্যিক প্রাবন্ধিক গবেষক সমাজ সংস্কৃতি বিষয়ক লেখালেখিতে যুক্ত আছেন।

https://bangla-sahitya.com/post/

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *