Baridbaran Gupta

Baridbaran Gupta

সাবেকীয়ানা এবং ঐতিহ্য ভরা শতাব্দী প্রাচীন মহামায়া আরাধনা।
বারিদ বরন গুপ্ত

পূর্ব বর্ধমান জেলার মন্তেশ্বর ব্লকের এক অতি প্রাচীন জনপদ মামুদপুর ! প্রাচীন এবং মধ্য ভারতের ইতিহাসের অনেক প্রাচীন অধ্যায় লুকিয়ে আছে এইসব জনপদে। একসময় নদীকেন্দ্রিক সভ্যতা পত্তনের একেবারে শুরুতে এই জনপদ গুলি গড়ে উঠেছিল! পাল যুগের শেষ এবং সেনযুগের শুরু থেকে এই অঞ্চলগুলি পাদ প্রদীপের তলায় আসতে থাকে, স্থানীয় হাতিপোতা ডাঙ্গার খননকার্য এবং পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন এর ভিত্তিতে এই অঞ্চলগুলির ইতিহাসের প্রাচীনত্ম নিয়ে কোন দ্বিমত থাকা উচিত নয়! পাল, শূর এবং সেন যুগের বহু ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রয়েছে এই মামুদপুর জনপদ!

উল্লেখ করা যায় যে একসময় এই অঞ্চল গুলি প্রাচীন ইন্দ্রানী পরগনার অন্তত আলমপুরের প্রখ্যাত সেন বংশীয় জমিদারদের অধীন ছিল। এই সেন বংশের কৃতি সন্তান অমরেন্দ্রনাথ সেন এক সময় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ছিলেন, তাছাড়া আর এক সন্তান দ্বৈপায়ন সেন একসময় প্রাচীন কাটোয়া লোকসভার সংসদ ছিলেন ! আরো উল্লেখ করা যায় যে মামুদপুরের রায় পরিবার সেনদের কাছারিতে খাজাঞ্চীদার হিসেবে নিযুক্ত হন এবং এই অঞ্চলের বসবাস গড়ে তোলেন, ধর্মচর্চার অঙ্গ হিসেবে একটা শিব মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন, যদিও তা বর্তমানে ভগ্নস্তূপে পরিণত হয়েছে, আকাশের দিকে মুখ চেয়ে আছে অনাদি লিঙ্গ সর্বেশ্বর! তারপর বঙ্গের জমিদার এবং সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলি যখন মহামায়া আরাধনায় লিপ্ত হয় তখন সম্ভবত এই রায় পরিবার শক্তিদায়িনী, অভয়দায়িনী মহামায়ার আরাধনায় লিপ্ত হন, এবং শিব মন্দির সংলগ্ন বকুলতলায় মা বুড়িমার মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন, তখন মন্দির ছিল মাটির এবং খড়ের ছাউনির, উল্লেখ্য যে এই রায় বংশের পূর্বপুরুষরা, মনোরঞ্জন রায় ভবতোষ রায় অভয়পদ রায়রা‌ নিরবিচ্ছিন্ন দেবী মা বুড়িমার আরাধনা চালাতে থাকেন । তখন তারা এই দেবীর জন্য বেশ কিছু জমি বন্দোবস্ত করেন! তারপর ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে নবাব মীর কাশেম এর কাছ থেকে ব্রিটিশ কোম্পানি বর্ধমানের রাজস্ব আদায়ের অধিকার পায়! ঠিক এই সময় পর্বে জমি জমাসংক্রান্ত বিবাদের জেরে পূজা বেশ কয়েক বছর বন্ধ থাকে! এরপরেই রায়দের দৌহিত্র সূত্রে আসে মামুদপুরের মুখার্জি পরিবার!

এই পরিবারে বয়স্ক সদস্য বিমল কান্তি মুখার্জি এই প্রতিবেদককে জানালেন উনবিংশ ‌‌শতকের প্রথমার্ধে তারা এই অঞ্চলের পত্তনীদার হিসেবে নিযুক্ত হন! তারপর আবার দেবীর বুড়িমার আরাধনায় লিপ্ত হন! তিনি জানালেন যে এই পরিবারের জনৈক পূর্বপুরুষ সুবোধ মুখার্জী কর্মসূত্রে ছিলেন আসামে, তিনি মায়ের কাছে পূজা শুরু করার নির্দেশ পান, তাছাড়া মা একই সাথে মুখার্জি বংশোদ্ভূতা আমলা বালা দৈবা, রাজলক্ষী দৈবা নান্মী দুই সাত্ত্বিক মহিলাকে পূজা উদযাপন করার নির্দেশ দান করেন, এরপর আবার শুরু হয় মায়ের আরাধনা! তবে সুবোধ মুখার্জী মারা যাওয়ার পর পারিবারিক অসন্তোষের কারণে আবার মায়ের পূজা বন্ধ হয়ে যায়। এর কিছুদিন পরে আবার মুখার্জি বংশোদ্ভূত কালিদাস মুখার্জি এই পূজা আবার শুরু করেন! সেই থেকে কমলাকান্ত মুখার্জি এবং বিমলাকান্ত মুখার্জি মায়ের সেবায় নিযুক্ত আছেন!

এই পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের সদস্য গৌতম মুখার্জী এবং অনুব্রত মুখার্জি এই প্রতিবেদককে জানালেন যে পঞ্চমী থেকে এই দেবীর পূজা শুরু হয়, আজকে যখন মুখার্জী বাড়ির পূজা মন্ডপে উপস্থিত হলাম তখন দেখলাম পূজা প্রায় শেষ পর্বে! তারা এই প্রতিবেদককে জানান যে পুরোপুরি শাক্ত মতে দেবীর পূজা হয়, চারদিন দেবীর কাছে বলি প্রদত্ত হয়, ষষ্ঠীর দিন চাল কুমড়ো, সপ্তমী এবং অষ্টমীতে ছাগ বলি হয়, কিন্তু নববীতে আঁখ, চাল কুমড়ো এবং ছাগ তিন বলি প্রাচীন রীতি অনুসারে হয়।

এই মুখার্জি পরিবার এখনো প্রাচীন রীতি এবং ঐতিহ্য মেনে পূজা চালিয়ে যাচ্ছেন, এই পরিবারের বর্ষীয়ান সদস্য বিমলাকান্তা মুখার্জি চা জল পানের জন্য বাড়ির অন্দরমহলে যাবার জন্য অনুরোধ করলেন, দেখলাম এখনো রীতিমতো মুখার্জি পরিবার প্রাচীন রীতি নীতি অনুসারে সেই ব্রাহ্মণ দিয়ে পূজার সমস্ত জোগাড় এমন কি দেবী ভোগেরও আয়োজন করা হচ্ছে। মামুদপুরের এই মুখার্জি পরিবার এখন প্রাচীনের ছায়া তবুও পূজার বনেদীয়ানা ধরে রেখেছে ষোল আনা! মুখার্জি পরিবারের সকল সদস্যদের শুভেচ্ছা জানিয়ে আবার চললাম এক প্রাচীন জমিদার বাড়ির দিকে, ডান দিকে পড়ে রয়েছে আমার খড়ি নদী, পরম আদরে পার করে দিল আমায়! চললাম রায় দুগাছার দিকে, আপনারাও চলুন আমার সাথে! কালকে আবার দেখা হচ্ছে।

Mode!! Field study 26, on 30 the September 2022.

Source:: Bimla kanta Mukherjee, Kamal Kanto Mukherjee, Gautam Mukherjee and Anibrata Mukherjee, Mamudpur purva Bardhaman,

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *