বৃন্দাবনের পথে পথে — ৩ — বিশ্বনাথ পাল

sahityalok.com
এবার আমরা তাজ মহলের উদ্দেশ্যে চললাম। বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের অন্যতম হল এই  তাজ মহল। তাজমহল দেখার জন্য টিকিট কাটার হুড়োহুড়ি। পঞ্চাশ টাকা আর আড়াই শ টাকার দু রকমের টিকিট। পঞ্চাশ টাকায় বাইরে বাইরে ঘোরা। আড়াই শ টাকার টিকিটে তাজমহল এর ভিতরে ঢোকা যাবে। 
ঢোকার আগে হাল্কা আচ্ছাদনে পা ঢাকার ব্যবস্থা করছেন কর্তৃপক্ষ। শ্বেতপাথরের মর্মরে পর্যটকের পায়ের ছাপ যাতে না পড়ে সেজন্যই এই বিশেষ ব্যবস্থা। তাজমহলের দুপাশে ঝাউ গাছ গুলি আবহমানকালের শিশু উদ্ভিদ হিসাবে চিহ্নিত। 
যমুনার পাশে এই তাজমহল যে বিশহাজার মানুষের বিশবছরের চেষ্টার ফল    তা বাড়াবাড়ি বলে মনে হয় না। বিদেশীদের ক্ষেত্রে এই দর্শনী ব্যয় অনেকটাই বেশী সাড়ে সাতশ এবং সাড়ে এগার শ টাকা। মমতাজের এই স্মৃতির মহলে দর্শকদের  উৎসাহে কখনই মনে হয় না এটি স্মৃতি স্মারক।
 মনে হয় প্রেমের নৈবেদ্য। ধর্মশালায় এসে দুপুরে ডালভাত তরকারী খেয়ে আমাদের গাড়ী ছাড়ল  ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্ম স্হান মথুরার উদ্দেশ্যে। কদিন একসাথে থাকার পর আমার সামনে থাকা বীরভূমের বাউল ঘোষ, কীর্তনের মাস্টার তার সঙ্গে ভাব হয়েছে, লাউদহের ছেলে শুভম পাল, ইসি এলের কর্মী উমাপদ রায় মিলে একটি নাম গানের টিম বানানো হয়েছে। আমরা মথুরাতে নেমে উচ্চৈস্বরে নাম গান করতে করতে এগিয়ে চলেছি।
 
ভগবান কংসের যে কারাগারে জন্মনিয়েছিলেন সেখানে শ্রীকৃষ্ণের মন্দির। তুলসী পাতা আর জগৎকর্তা শ্রীকৃষ্ণ কথা বইটি মূলমন্দিরের প্রধান পুরোহিতের হাতে দিলাম। পূজারী প্রচ্ছদে বংশীধারী শ্রীকৃষ্ণের ছবি দেখে আনন্দিত হয়ে আমাকে প্রসাদ দিলেন। ভগবান যেখানে অবর্তীণ হয়েছিলেন সেখানে শুধু প্রণাম নয়, আমরা সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে গড়াগড়ি দিলাম। সেখান থেকে দোতলা মন্দিরে অন্যান্য দেব দেবীর মূর্তি দেখলাম প্রণাম করলাম প্রসাদ নিলাম। শ্রীকৃষ্ণের জীবনের উপর একটি গুহার মধ্যে প্রদর্শনী দেখলাম।
 
 
 
অপূর্ব সুন্দর এই প্রদর্শনী দেখতে পাবো জন্মেও ভাবি নি। এখানে একটি বিরাট মঞ্চ রয়েছে ঘন্টাখানেকের মধ্যে কীর্তন হবে তাই মন চাইছিল একটু নাম গান শুনি। কিন্তু দলের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হবার ভয়ে তাড়াতাড়ি বাসের কাছে আসা মাত্রই আমাদের এজেন্ট কৃপানাথ চ্যাটার্জি জিঞ্জাসা করলেন মাস্টার তোমাদের সঙ্গে সাধু আসে নাই?  আমাদের সঙ্গে একজন লালশালুপরা সাধু ছিল বাসের পিছনের  সিটে। 
বীরভূমের এই সাধু হরিনামে মুহূর্তের জন্যও গলা মেলায় নাই। খাবার সময় আগেভাগে বসা এবং আড়ালে আবডালে ধূমপানে আসক্ত সাধুবাবাকে হারিয়ে সকলেই বেশ খাপ্পা। ও ব্যাটা সাধুর জন্য আমাদের তীর্থ নষ্ট হল বলে বাঁকুড়া সোনামুখির এক প্রাক্তন শিক্ষক রাগে রি রি করছেন।
 
 
আমি সামনের চায়ের দোকানে কয়েকজন  বাঙালি লোককে দেখে জিঞ্জাসা করলাম। লাল শালু পরা একজন সাধুকে আপনারা দেখেছেন কি? লেখাপড়া জানে না এইসাধুর জন্য ইতিমধ্যেই মাইকে ঘোষনা করা হয়েছে। এক ভদ্রলোক বললেন দু নম্বর গেটের কাছে ঐ রকম সাধুকে দেখেছেন। 
অনেকে ছুটলদুর্গাপুরের নবদা সাধুকে পাগড়াও করল। অচেনা অজানা জায়গায়  সাধুকে পেয়ে আমরা তৃপ্ত। ছেলে ছোকরার দল বাঁচাও সাধু বাবা বলে চিৎকার করতে করতে আমরা বৃন্দাবনের দিকে যাত্রা করলাম। সাধু হারানোর জেরে সে রাত্রে আমাদের ধর্মশালায় থাকতে হল। লটবহর তো সঙ্গে ছিল।
 
 
 
এখান কার মাটি অতি পবিত্র। বৃন্দাবন না তুলসী বন  তা দেখার জন্য ভোরথেকে স্নান সেরে কাপড় জামা পরে রেডি। পাণ্ডা এসে আমাদের নিয়ে চললেন। বৃন্দাবন প্রকৃত অর্থে শ্রীমতি রাধারাণীর। চূরাশি ক্রোশের এই বৃন্দাবনে সাড়ে পাঁচ হাজার মন্দির আছে। এখানে কেউ মারা গেলে তার পিন্ড দিতে হয় না। বাউল ঘোয রাধারাণীর গুণকীতন  শুরু করলেন। রাধে রাধে ধ্বনি দিয়ে আমরা সারি বদ্ধ ভাবে এগিয়ে চলেছি। 
অষ্টসখির শিরোমণি রাধে রাধে।শ্যামসায়রের মরালিনী রাধেরাধে করতে করতে  প্রথমে গেলাম ৬৪মোহন্তের সমাধি স্থল দেখতে। সেখান থেকে গেলাম বিধবাদের হরিনাম ক্ষেত্রে। এখানে বিধবারা সকালে চার ঘন্টা আর সন্ধ্যায় চার ঘন্টা হরিনাম করেন। বিধবা মহিলারা এখানকার নাম গানকে যুগযুগ ধরে নিয়ে চলেছেন।
 
 
 
এর পর গেলাম সোনার তালগাছ দেখতে। রাধাগোবিন্দের মন্দিরের পিছনে রয়েছে সোনার বাহনদের সমাহার। যমুনা পুলিনে বসনচুরির ঘাটটিও দেখলাম।এরপর আমরা সেই খানে গেলাম যেখানে ভগবান কৃষ্ণ গোপিদের সঙ্গে শারদ পূর্ণিমায় রাস করেছিলেন। চিরবসন্ত বিরাজিত এই স্থানে যোগবলে সাধকেরা এখন ভগবান কৃষ্ণের মূরলী শুনতে পান। আজও মধুর বৃন্দাবনের বাঁশি বাজে রে। রাত্রে এখানে কেউ থাকতে  পারেন না। নুপুরের ধ্বনিও নাকি স্পষ্ট শোনা যায়। মন্ডলাকারে ঘুরতে গিয়েদেখলাম মহাপ্রভুর মূর্তি রয়েছে।
 
 
 
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুই বর্তমান ব্রজের আবিস্কারকর্তা তাই পূজারীর হাতে ‘চৈতন্য চিন্তন’ বই নিবেদন করলাম। পূজারী খুশী হয়ে ময়ূর পাখার গুচ্ছ করে আলতোভাবে একটা বারী মারলেন। আমরা বৃন্দাবনেশ্বরীর জয়ধ্বনি দিতে দিতে শ্রীমতির সিন্দুর নিয়ে দেখলাম একজায়গায়-রাধা গোবিন্দের নাম হচ্ছে। আমরা ওদের দলে মিশে নেচে কুঁদে মাতোয়ারা হয়ে উঠলাম। বের হবার সময় মন খারাপ হলনা এই কারণে আবার আসবো বলে ভেবে নিয়েছি যে। এর পর গেলাম নিধুবন।
 
 
 
নিধু বনের মহানিধি  ভগবান কৃষ্ণকে পেয়ে গোপীদের গলায়  বেরিয়ে ছিল হোলির গান। আজকে হৈলি খেলব হে শ্যাম তোমার সনে। /একলা পেয়েছি তোমায় নিধুবনে। ‘পরমানন্দ গোবিন্দের এখানের মন্দিরে চৈতন্যচিন্তন দিলাম। রাধা গোবিন্দের প্রাচীন মন্দিরে পূজা দিলাম। আর দিলাম চৈতন্যচিন্তন।
দুপুরে ধর্মশালায় ফিরে  খাওয়া দাওয়ার পর সামান্য বিশ্রাম নিয়ে কাঁচ মন্দির, প্রেম মন্দির, জয় মাতাদির  মন্দির দেখলাম। প্রেম মন্দিরের আলোর প্রক্ষেপনে রাধা কৃষ্ণের লীলা প্রদর্শন খুবই জীবন্ত। রাত্রে খেয়ে দেয়ে শয্যানিলাম।
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *