Ataullah Mahmood

মোঃআতাউল্লাহ আল মাহমুদ

ধারণা, কু’ধারণা

সমাজ ও আমরা

মোঃআতাউল্লাহ আল মাহমুদ

“ধারণা “একটি শব্দ মাত্র। কিন্তু সমাজ,ব্যক্তি জীবন,রাষ্ট্র কিংবা আন্তর্জাতিক প্রতিটি ক্ষেত্রে ধারণার একটা ব্যাপক প্রভাব দেখতে পাই। জ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রতিটি বিষয়ে ধারণা থাকা বাঞ্চনীয়।
কিন্তু এই ধারণা শব্দের সাথে যখন কু,প্রত্যয় যোগহয়ে কুধারণার জন্ম হয় তখনই, তখনই ব্যক্তিজিবন,সমাজ, রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক অঙ্গন সবই বিষময় হয়ে উঠে।

কথায় আছে “অল্পবিদ্যা ভয়ংকর”।ধারনাটাই মুলত বিদ্যা যা রপ্তকরতে হলে পূর্ণভাবে করা উচিৎ। অনুমান নির্ভর বা সন্ধেহের বসবতী হয়ে কোনকিছু সম্পর্কে কুধারণা নেওয়া বা প্রকাশ করা গুরুতর অপরাধ।


আপনার একটুখানি ভ্রান্ত ধারনা বা সন্ধেহের বলীহয়ে ধ্বংস হয়েযেতে পারে একটি জীবন পরিবার সমাজ, বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।
হাদিসের বানী “ধারনা নির্ভর হয়ে কোনোকথা বলা বা কাজ করা কল্যাণকর নয়, কেননা কোন বিষয়ে মানুষের প্রতি কুধারণা করা জঘন্য মিথ্যাচার।


রাসুলুল্লাহ (সাঃ)বলেছেন “উত্তম ইবাদত হচ্ছে মানুষের প্রতি ভালো ধারনা রাখা।”
আল্লাহ তাআলা মানুষের কল্যাণে কুরআন পাকে ইরশাদ করেছেন “”হে ইমানদারগন, তোমরা অধিক ধারণা থেকে দূরে থাকো।কারন কোন কোন ধারনা পাপ।আর তোমরা একজন অন্যজনের গোপনীয় বিষয়ে তালাশ করা থেকে বিরত থাক।আর একজন অন্যজনের গিবত থেকেও বিরত থাক””(সুরা আল হুজরাত আয়াত ১২)


কুরআন ও হাদিসে কারো প্রতি কুধারণা থেকে বিরত থাকার কথা স্পষ্ট ভাবে বলা হলেও আমরা নিজেরাই কতটুক মানি বা আমরা নিজেরাই অন্যজনের কুধারণা থেকে বাঁচতে পেরেছি।
চেহারা দেখে কারো প্রতি কোন ধারনা নেওয়ার কোন সুত্র এখন পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি।
মানুষের অন্তর দেখারমত কোন এক্সরেমেশিন আবিষ্কার হয়নি।তাইতো মসজিদে কোনটা মুসল্লি আর কোনটা জুতা চোর তা সনাক্ত করা যায়না।


তবে অন্যজনের কুধারণা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা সহজ কাজ নয়।ধারণাটা আসে ধারনাকারির ব্যাক্তিগত চরিত্র,প্রজ্ঞা, বংশগত ঐতিহ্য ও মানষিকতার উপর।উন্নত মানষিকতার ব্যক্তি অন্যজনের বিষয়ে ধারনা করতে গেলে অনেককিছু ভাবেন।সন্ধেহের বসে তিঁনি কোন ধারনা করেননা।একজন নিশি চুর রাতের আঁধারে অন্যকোন তির্থযাত্রীকে দেখলেও চুরই ভেবে থাকেন।আবার একজন তির্থযাত্রী একজন নিশি চুরকে দেখলে তিঁনি তির্থযাত্রী ভাবতে পারেন। ভাবনাটা পুরাটা আসে ব্যক্তিচরিত্র থেকে।

তাই কে কি ভাবলো বা ধারনা করলো সে দিকে না তাকিয়ে আমাদে উচিৎ নিজেকে পবিত্র রেখে সঠিক কাজটা করে যাওয়া অন্যের দূষ অন্বেষণ না করা। কবি বলেছেন “”পাপকে ঘৃণা কর পাপিকে নয়””।কিন্তু সমাজ বা আমরা পুরাটাই উল্টো। আমরা ছিঁচকা চোর পেলে পিটিয়ে তার হাড়মাংশ থেঁতলে দেই আর যারা বড়বড় চেয়ারে বসে পুকুরচুরি করছে তাদেরকে আমরা সালামদেই ও মাখামাখি ও তোষামোদ করে সুবিধা আদায় বা পুকুরচুরির অংশপেতে চেষ্টা করি।কিন্তু একবারও খবর নেইনা যেই ছিঁচকা চোরের হাড় ভেংগেদিলাম
সেই চোরের গৃহে অবুঝ শিশুরা না খেয়ে আছে,।একরারো কেউ ভাবলোনা, হয়তো সে পরিস্থিতির শিকার বা তার আর কিছুই করার ছিলোনা। আমরা চোরমেরে নিজেকে বাহবা দিচ্ছি বা পুণ্যবান মনেকরছি।আসলে এটা কোন ধর্মেরই কাজ নয়,এর পুরাটাই অধর্ম।।
তবে,ব্যাক্তিগত ভাবে অন্যের ধারনাকে কোনকিছু মনেও করিনাই, অন্যের সন্ধেহজনক ধারনা থেকে বাঁচতেও পারিনাই।
★এখন প্রশ্ন হচ্ছে অন্যের কুধারণা থেকে বাঁচার কি কোন পথ আছে? না নাই। বাঁচবার প্রয়োজনটাই কি?আপনি বা আমি যদি নিজেকে পবিত্র রাখতে পারি তবে সমালোচকরা কি ধারণা করল তাতে কিচ্ছু আসে যায়না।সাময়িক ভাবে একটু হেনস্থার স্বীকার হতে পারেন।তবে মনে রাখবেন আল্লাহ সবকিছু দেখছেন। তাই নিজে অন্যজনের প্রতি কোন কুধারণা করবেননা, এবং নিজেকে সবাই পবিত্র রাখবেন।
আবারো বলছি, আল্লাহ সবকিছু দেখছেন,তিঁনিই প্রকৃত বিচারক।


★বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করার সময় একবার দায়িত্ব পড়েছিল এইচ,আই,ভি প্রোগ্রামে। সে সময় আমার আমার দায়িত্ব ছিল বিভিন্ন নিষিদ্ধপল্লীর পতিতা ও খদ্দেরদের এইডস এর ভয়াবহতা ও প্রতিকার সম্পর্কে সতর্ক করা ও বিভিন্ন প্রতিকার সামগ্রী বিতরণ করা।এই দায়িত্ব পালন করার সময় কতপ্রকার কুধারণার সম্মুখীন হয়েছি তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।যখন এইচ,আই,ভি সম্পর্কে আমাদের প্রশিক্ষণ দেওয়াহয় তখনই প্রশিক্ষক স্যারগন ইঙ্গিতদিয়ে বলতেন ” নিজেরাই এইচ,আই,ভি,তে আক্রান্ত হইয়েন না””।কথাটি একটি সতর্ক বার্তা হলেও এরমধ্যেও একটা কুধারণা বা সন্ধেহের গন্ধপেতাম।
যখন দায়িত্ব পালনকালে এইসব নিষিদ্ধপল্লীতে যেতাম তখন আশেপাশের লোকজন অনেকেই হয়ত খদ্দের ভেবেনিত।


তারপর যখন target person নের মুখোমুখি হতাম তখনো সে প্রথমবার খদ্দের ভেবে ভুল করত।
এই সব স্বাস্থ্যসচেতনতামুলক আলোচনা কেউ পাত্তাদিতে চাইতোনা। সবাই এড়িয়ে যেতে চাইতো তাই তাদেরকে বশে আনার জন্য প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত উপহার সামগ্রী দিতে হতো। এই ভাবে বিভিন্ন কৌশলে দায়িত্ব শেষ করে মেসে গেলে সহকর্মীগনও অন্যদৃষ্টিতে তাকাত।ঠাট্টাতামাশার ছলে অনেক কথা বলত।
এক বার কয়েকজন মিলে নামাজে দাড়ালে এক জন বলেছিল আমাকে নামাজ পড়াতে কিন্তু তিনজন প্রকাশ্যে আপত্তি করলো। তাৎক্ষণিক একটু কষ্টপেলেও নিজেকে সামলে নিলাম ও একজন সুদের হিসাবকারির পিছনে নামজ আদায় করলাম।নিজেকে বুঝালাম এসব হজম করাও আমার দায়িত্বের অংশ।


এভাবেই আমার মত শত শত কর্মির হাজারে অবমাননা সহ্যকরণের ফলে দেশটাযে আজ এইচ,আই,ভি’র ভয়ানক থাবাথেকে মুক্ত এটাই আমাদের শান্তনা।
তবে বাহ্যিক চেহারা দেখে মানুষ কিভাবে চিনবেন?
দায়িত্ব পালনকালে অনেক সুন্দর ধর্মীয় লেবাসধারি ও ভদ্রলেবাসধারিকে দেখেছি খদ্দেরের সারিতে।
আবার এক target person এর রোমে জায়নামাজ,সেলফে পবিত্র কোরআন,আর তজবিহ দেখে কৌতুহলের বসে জানতে চাইলাম, “”নামাজ পড়ে কে?””


সে নির্ধিদায় জানালো যে সে নিজেই।তখন একটু ইতস্তত করে বললাম “আপনার পেশাটা যে ধর্মিয় ভাবে নিষিদ্ধ তা কি জানেন??
সে এক নিঃশ্বাসে বেশকিছু কথা বলে দিল। “”সবার জন্য নিষিদ্ধ হলেও আমার জন্য নয়।ছুট্ট বেলায় বাপ, মা সবাইকে হাড়িয়েছি, ভাইএর সংসারে বড় হয়েছি, পদ্মার পাড়ে বাড়ি আছিলো, নদির ভাংগনে একদিন বাড়িটা নিশ্চিহ্ন হয়েগেল, কিছুদিনের জন্য ঠাঁইনিলাম রাস্তার উপর চুপড়ি ঘরে, সেখান থেকে এক প্রতারক এসে আমাকে বিয়ে করে মাসখানেক রেখে বেড়াতে যাবার ছলকরে আমাকে এখানে বিক্রিকরে চলে যায় এক বছর আগে।তার পরথেকে এটাই আমার ঠিকানা।


মনযোগ দিয়ে শুনলাম দীর্ঘশ্বাস নিলাম,তার পর আবার প্রশ্ন করলাম, “”এখান থেকে মুক্তি চাননা?
সে আবার বলতে শুরু করলো “”মুক্তি,কি চাইলেই পাওয়া যায়?এখানে আসতে হবে কে যানত?ছুটবেলায় গ্রামে স্কুলে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়েছি, মক্তবে পড়েছি কোরআন পরেছি, নামাজ শিখেছি, তা কি এখানে আসার জন্য??তবে কোন মানুষের কাছে আর মুক্তি চাইনা,মুক্তি পাইলেই আমার ঠিকানা কি?
প্রতি রাত্রে নামাজের পর আল্লাহর কাছে মোনাজাত করি, “”আল্লাহ তুমি যাহা অপছন্দ কর তা আমি করতে চাইনা, আমাকে তুমি মুক্তি দাও,তুমি ছাড়া আর কারোকাছে সাহায্য
চাইনা,মানুষকে আমি ভালোকরেই চিনতে পেরেছি আর রুজ রুজ ছিনতেছি,আমি মুক্তি চাই তুমি আমাকে মুক্তি দাও।”


তার পর আমার নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ায় বিদায় নিতে হল, তারপর থেকে অন্যের প্রতি আমার পক্ষথেকে কু’ধারণা চীরকালর জন্য বন্ধ হয়ে গেল।
তারপর সংস্থা কতৃক অন্যপ্রোগ্রামে অন্যত্র বদলী হওয়ায় এই সকল ব্যাপারে আর খবর রাখতে পারিনাই।


তবে উক্ত parson কে আল্লাহ কবে মুক্তি দিয়েছন বা আদৌ দিয়েছেেন কিনা জানিনা , তবে দৃশ্যমান জগতের অনেক ধর্মিয় ও ভদ্র লেবাছধারী অপেক্ষা নিষিদ্ধ জগতের ভাঙ্গা ঘরের উক্ত মহিলার ঈমান অনেক মজবুত এবং শ্রষ্টার কাছে অনেকের চেয়ে বেশি প্রিয় হবেন তা আমার বিশ্বাস, আর এটাও আমার বিশ্বাস আল্লাহ নিশ্চয় তাকে মুক্তিদিয়ে ভালো কোন জায়গায় স্থান দিয়েছেন।।

(সমাপ্ত)

https://bangla-sahitya.com/post/
                                  

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *