Anup – Prakash

দুটি কাব্য : মৃত্যুবোধ থেকে সন্তাপ ও সমর্পণ

তৈমুর খান

সন্তাপ ও সমর্পণ : প্রকাশ রায়

শূন্য দশকের পরবর্তী সময়ে যে কবিগণ কবিতা লিখতে আসছেন তাঁরা নিজের মতোই কবিতা লেখার চেষ্টা করছেন। আর সেই কারণেই বাংলা কবিতায় যে বৈচিত্র্যময়তা তা আর অন্যকোনো শিল্পে ততটা ফুটে উঠছে না। পোস্টমর্ডানিজম ধারার কবিতা যেমন এই সময়ে লেখা হচ্ছে, তেমনি নাথিংনেস্ এম্পটিনেস্ ভাবনার কবিতাও উঠে আসছে। কবিরা কেউ কেউ ছন্দে ফিরছেন, কেউ কেউ নিছক গদ্যে। আবার কেউ কেউ বিষয় কেন্দ্রিক একমুখী ভাবের কবিতাতেই ফিরে যাচ্ছেন। কবিদের নিজস্ব জীবনের যে ভাঙচুর ও শূন্যতা, হতাশা ও স্বপ্নহীনতা দেখা দিয়েছে তাকে তাঁরা অস্বীকার করতে পারছেন না। একান্ত অন্তর্মুখীন গদ্যে তা সাবলীলভাবেই লিখে চলেছেন। কবিতার কলাকৌশল, বিনির্মাণ, অথবা সিদ্ধিতে তাঁদের যেন নজর দেবার প্রয়োজন নেই। তাই বর্ণনা ও বিবৃতির প্রয়োগ যেমন বেশি, তেমনি একঘেয়েমি বক্তব্যের ভেতর প্রবেশ করাও তাঁদের কাছে বিরক্তিকর হয়ে ওঠেনি। শৈল্পিক বাতাবরণ থেকে, বিষয়কেই তাঁরা বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন এমন কবিতাও খুব বিরল নয়। এই ধরারই কবিতার দুটি কাব্য আমার হাতে এসে পৌঁছেছে। এগুলি হল: অনুপ বন্দোপাধ্যায়ের ‘দু’হাতে অমৃত রেখেও মরে গেছি আমি'(প্রথম প্রকাশ আগস্ট ২০২২) এবং প্রকাশ রায়ের ‘সন্তাপ ও সমর্পণ'(প্রথম প্রকাশ কলকাতা বইমেলা ২০২২)। উল্লেখ্য এই দুজনের কবিতা-ই আমি পূর্বে পড়িনি, সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই একটা কৌতূহল আমাকে চালিত করল।

কবিতা আনন্দে লেখা হয় না, তার প্রমাণ আমরা বাল্মীকির শ্লোক রচনায় পেয়েছি। ব্যাধের মিথুন অবস্থায় ক্রৌঞ্চ হত্যা দেখে ক্রৌঞ্চীর শোকে কাতর হয়ে বাল্মীকির মুখ নিঃসৃত বাণীই প্রথম কবিতা। সুতরাং সেখানে মূল বিভাব ‘শোক’। এই শোকের বহুমুখী প্রকাশ আছে: কখনো তা দুঃখ-কষ্ট, কখনো হতাশা, কখনো ব্যর্থতা, কখনো জীবন সংগ্রামে পরাজিত হওয়া। কবির ব্যক্তিজীবনের সেইসব অন্তরায়কেই শব্দ ও ধ্বনির প্রয়োগে প্রকাশ করা-ই কবিতা। আমেরিকান কবি, ঔপন্যাসিক এবং ছোটগল্প লেখক চার্লস বুকভস্কি(১৯২০-৯৪) বলেছেন :

“It takes a lot of desperation, dissatisfaction and disillusion to write a few good poems.”

অর্থাৎ কয়েকটি ভালো কবিতা লিখতে অনেক হতাশা, অসন্তোষ এবং মোহ লাগে। এই দুটি কাব্যের কবিতাগুলির ক্ষেত্রেও একথারই সত্যতা খুঁজে পেলাম।

প্রথম কাব্য ‘দু’হাতে অমৃত রেখেও মরে গেছি আমি’-তে অনুপ বন্দ্যোপাধ্যায় জীবনের শেষ পর্যায়ে পৌঁছানো মৃত্যুর জন্য প্রতীক্ষারত উপলব্ধিকেই কবিতায় রূপ দিয়েছেন। বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য যখন অসহায় অবস্থায় পৌঁছান, অন্যদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠেন, তখন তার অন্তঃক্ষরণের যে করুণ আর্তনাদ তা প্রায় আমাদের কাছে অশ্রুতই থেকে যায়। সেই অশ্রুত ভাষাগুলি মোট ২৬টি কবিতায় লিপিবদ্ধ করেছেন। প্রত্যেকটি কবিতাতেই অন্তরিক্ষের হাহাকার, দীর্ঘশ্বাস, অভিমান কষ্টের বিপন্ন মুহূর্তগুলি উঠে এসেছে। কাব্যের প্রথম কবিতা ‘এ বিপন্নতায়’ মৃত্যুমুহূর্তের যাপনকে ধারণ করেই ঈশ্বরের প্রতি অভিযোগ শুনতে পাই:

“তোমার দেওয়া শরীর তুমিই ফেরত চাইছ ঈশ্বর?

তাই শ্বাসকষ্ট? অস্থিরতা?

—তাহলে কেন এত দিলে অবেলা পর্যন্ত?”

জীবন যদি ঈশ্বরই দিয়ে থাকেন, তাহলে তা ফিরিয়ে নেবার সময় এত কষ্ট কেন? মৃত্যুযন্ত্রণা কতখানি মারাত্মক এবং অনাকাঙ্ক্ষিত সেই উপলব্ধির কথাতেই কাব্যের সূচনা। তারপর একে একে কত স্মৃতিচারণা, কত ইতিহাস, আত্মীয়স্বজনদের কত প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা সবই এসে ভিড় করেছে। কত যন্ত্রণা এসে আশ্রয় নিয়েছে শরীরে ও মনে। মৃত্যুর পর তারা কেউ থাকবে না। আত্মীয়-স্বজন প্রতিবেশীরা কিছুটা কান্নাকাটি করে সবাই ভুলে যাবে। মৃত্যু যাত্রীটি তার পাওয়া-না-পাওয়া, আনন্দ-বেদনা, স্মৃতিময় অতীত জীবনের কথা ভাবতেই থাকবেন। মৃত্যুর সাথে আলাপ করতে করতে, চাবির গোছাটাও ভারী লাগবে। বিষয় আসক্তির ভার আর বহন করতে চান না। সমবয়সীদের মুখ মনে করে নিজেকে আশ্বস্ত করতে চাইবেন। ভালোবাসার মৃত্যু ঘটেছে তার টের পাবেন। যে বন্ধুরা, আত্মীয়রা ফুল আনবে, ধূপ জ্বালাবে, জীবিত অবস্থায় তাদের কাছে কোনো মূল্য পাননি; ওরা মৃত্যুর পর গুণগান গাইবে। হঠাৎ চোখের সামনে দেখতে পাবেন আলোয় একটা পতঙ্গ এসে নাচানাচি করছে। তখন ভাবতে থাকবেন:

“পতঙ্গটা নাচানাচি করছে আলোর সামনে

মৃত্যু কি আলোর মতোই?

আমার আরাধনায় যদি বিরূপ হয় মৃত্যু

আজ রাতে স্বপ্ন দেখব খানিক…”

মৃত্যুর মুহূর্তেও স্বপ্ন দেখার আকাঙ্ক্ষা মানবচরিত্রেরই একটা বৈশিষ্ট্য। কিন্তু শূন্য হয়ে যাওয়ার পরও কিছু মায়া থেকে যায়। তাই পরক্ষণেই প্রশ্ন জাগে “কেন এত বস্তু কাঙাল? কেন পাওয়ার স্বপ্ন?”

একদিকে পার্থিব আসক্তি, অন্যদিকে দার্শনিক প্রশ্ন দুই-ই ক্ষত-বিক্ষত করে চলে। মৃত্যুর কাছে পরাজিত সৈনিক হয়েও পরাজয় মানতে চান না। এই জীবনের টানাপোড়েন থেকেই শেষ অস্থিরতা। সবাই একটু একটু করে দুধ-গঙ্গাজল খাইয়ে দিয়েছে। ছেলে, বৌমা, নাতি, স্ত্রী শনিবার সবাই বাড়ি ফিরে আসে সন্দেশ আর আপেল নিয়ে। কথায় কথায় রাজারহাটের ফ্ল্যাটটার প্রসঙ্গ ওঠে। মৃত্যুর পর কে পাবে তা নিয়ে শুরু হয় জল্পনা। শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারেন “ব্যক্তিগত খেদ আজ মূল্যহীন”। অমৃত পান করেও বাঁচা যায় না। দেবতারাও নিঃশেষ। জন্মদিনের পায়েস, কেক, দুই চাকার সাইকেল এরা মৃত্যুর কেউ নয়। ‘কেন মৃত্যু’ এ নিয়ে ঈশ্বরের সঙ্গে আইনি লড়াই করার ইচ্ছা জাগে। মনে মনে অমর হওয়ার ইচ্ছা নিয়েই অনন্ত আয়ুর ঠিকানা খোঁজ করেন:

“নির্যাতনকারী ঈশ্বরের দেওয়া এ মৃত্যু

আমি ছুঁড়ে দেব পৃথিবীতে।”

সমগ্র কাব্য জুড়ে যেন একটাই কবিতা, একমুখী ভাবের বিন্যাস, উপলব্ধির একাঘ্নি কথকতা। বক্তব্য জুড়ে জুড়ে এগিয়ে যাওয়া। তবু ভালো লাগে কবিপুত্র অষ্টম শ্রেণির পড়ুয়া অগ্নিভ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রচ্ছদ আগুন ও অমৃতভাণ্ডের মাঝে মানবহৃদয়ের অবস্থান দেখে।

দু'হাতে অমৃত রেখেও মরে গেছি আমি

দ্বিতীয় কাব্য ‘সন্তাপ ও সমর্পণ’-এ কবি প্রকাশ রায় সেই অভিমানকেই স্পর্শ করেছেন, যে অভিমান সম্পর্ককে অস্বীকার করেছে। বন্ধুত্ব ও সম্পর্ক বনসাইয়ের মতো, পরিচর্যা না করলে একসময় শুকিয়ে যায়। কবির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তাই “কবিতার আসরে একাকিত্বের উদযাপন” হিসেবেই শুরু হয়েছে এই কাব্য। স্বাভাবিকভাবেই কবি সেই কথাটিই বলতে চেয়েছেন:

“প্রিয় মানুষের থেকে

  দাঁড়িয়ে থাকি একটা নরম দূরত্বে

এই ব্যবধানটুকু রাখতেই হয়”

কিন্তু এই ব্যবধান মানসিক দূরত্বকেও বাড়িয়ে দেয়। এই দূরত্বের মাঝখানে অনেক ভুল-ত্রুটি সত্য-মিথ্যার জন্ম হয়। এসব নিয়েই জীবন গড়ে ওঠে। সেই জীবনকেই দেখতে চেয়েছেন কবি। উপলব্ধি করেছেন:

“জীবন তো অন্যরকম

ছন্দহীন,ভুল হিসাবের খাতা

ইচ্ছে নদীর বুকে

নৌকা সেজে ভাসা”

এই নৌকা যখন লক্ষ্যহীন হয়ে যায়, তখন দিশেহারার মতোই এলোমেলো তার চলন। স্মৃতি-বিস্মৃতির ঘোর লেগে পাক খায়। এরকম মুহূর্তও সৃষ্টি হয়েছে। তখন পার্থিব জীবন খেলাঘরের মতোই। জীবনকে তখন নদী হিসেবেই অনুভব করতে চেয়েছেন:

“যাকে জীবন ভাবি

  সে তো আসলে নদী, খরস্রোতা

হাবুডুবু খাই, প্রায়শ ডুবেই থাকি

                   সলিল অন্ধকারে

মাঝে মাঝে উঠে আসি বালুচরে

                    ঘর বাঁধি

                        খেলাঘর"

প্রথম কাব্যের এইসব কবিতাতে জীবনকে বোঝার মধ্যে যে দার্শনিক চেতনা উঠে এসেছে তা হয়তো পরবর্তীতে আরও পরিপূর্ণতা পাবে। কবি এই সামান্য বয়সেই যে ‘নির্মাণ’ জেনেছেন তা অনেকেই বহু দেরি করে পান:

“সহস্ত্র কান্না দিয়ে এক একটা হাসির নির্মাণ”

একি সহজ কথা? ইংরেজি ভাষার বিখ্যাত কবি পার্সি বিশি শেলি তাঁর টু এ স্কাইলার্ক কবিতায় লিখেছিলেন:

“Our sweetest songs are those that tell of saddest thought”

অর্থাৎ আমাদের সবচেয়ে মধুর গানগুলিই দুঃখজনক চিন্তার কথা বলে।

এই হাসি তখন দার্শনিকের হাসি হয়ে যায়। সম্পর্ক ম্লান হলেও, অভিমান তীব্র হলেও, নির্বাসিত নিজের জীবনের মুখোমুখি হয়ে কবি আত্মসমর্পণ করেন; যে সমর্পণে কার্পণ্য থাকে না, ছলনা থাকে না। নির্মোহ দার্শনিকের মতোই কাব্যের শেষ কবিতায় উল্লেখ করেন:

“যতবার অপমান করবে,ফুল দেব দুহাত ভরে

যতবার আঘাত করবে,উদাত্ত কণ্ঠে শোনাব কবিতা

যতবার হত্যা করবে,আলো হয়ে মুছে দেব

                           তোমার সমস্ত অন্ধকার"

এই সেই কবি যিনি সন্তাপ ও সমর্পণের পর পূতপবিত্র সন্ন্যাসীর মতো জীবনকে গরীয়ান করে তুললেন। সম্পর্ককে সহিষ্ণুতায়,ত্যাগে, আসক্তির প্রাচুর্যের বাহিরে এনে দাঁড় করালেন। নির্মেদ কবিতাগুলি আত্মস্ফুরণের মুকুল হয়ে ফুটে উঠল।

১,দু’হাতে অমৃত রেখেও মরে গেছি আমি : অনুপ

বন্দ্যোপাধ্যায়, বার্ণিক প্রকাশন, কৈয়ড়, পূর্ব

বর্ধমান-৭১৩৪২৩, প্রচ্ছদ:অগ্নিভ বন্দ্যোপাধ্যায়,

মূল্য ৫০ টাকা।

কবির সঙ্গে কথা:৮৬৩৭০৫০৪৩১

🍂

২,সন্তাপ ও সমর্পণ : প্রকাশ রায়, বার্ণিক প্রকাশন, কৈয়ড়,

পূর্ব বর্ধমান-৭১৩৪২৩, প্রচ্ছদ : অমিত মণ্ডল,

মূল্য ৬০ টাকা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *