স্নেহছায়া // শ্যামল কুমার রায়

স্নেহছায়া // শ্যামল কুমার রায়

.

.

প্রথম অধ্যায়

.

.

ইছামতীর তীরে দাঁড়িয়ে, জীবন থেকে পালিয়ে আসা সমরেশ,পড়ন্ত বিকেলে রামধনু রঙা নীল আকাশের দিকে চেয়ে উদাস হয়ে ভাবছিল – তার জীবনটা একটা দারুণ গল্প হতে পারত ; যা হয়ত প্রকাশ ঝা এর ফিল্মের চেয়েও মশালাদার, আবার মহাভারতের চেয়েও বৈচিত্র্যময়। এক লপ্তে সমরেশ ফিরে গেল আজ থেকে আঠাশ বছর আগের জীবনে। তখন সমরেশ বছর দশকের। নিশ্চিন্তপুর গ্রামে ক্লাস ফোর এ পড়ে।

.

.

জীবন কত নিষ্ঠুর তা দশ বছর বয়সে , পিতৃহারা হওয়া সমরেশ বেশ বুঝেছিল। পেশায় ছোট্ট একটা মুদিখানার মালিক ছিলেন সমরেশ এর বাবা,পৃথ্বীরাজবাবু । সেভাবে, জীবনে গুছিয়ে কিছু করে উঠতে পারেননি, পৃথ্বীরাজবাবু। বরঞ্চ, ঐ স্বল্প আয়ের মধ্যেই বিধবা বোন, বেকার ভায়ের ভরণপোষণ ও শয্যাশায়ী মায়ের চিকিৎসা করিয়েছেন। কিন্তু, একটা হার্ট অ্যাটাক্ – সমরেশের আর ওর মায়ের জীবন তছনছ করে দিল। যারা এতদিন পৃথ্বীরাজবাবুর ছত্রছায়ায় সযত্নে লালিত হয়েছেন , তাঁরাই ভাগাভাগি শুরু করে দিলেন ।

.

.

গত বারো বছরের স্বামীর পাঁচ ভূতের সংসারে কলুর বলদের মতো শুধু খেটে মরেছে সমরেশের মা। আজ অন্য রূপ দেখে তাজ্জব বনে গেছেন । তবুও সেই অবস্থায় সমরেশ আর ওর মা, সদ্য বিধবা, শ্যামশ্রী পাইকার রক্ষা করেছে স্বামীর শেষ চিহ্ন ‘ তারা মা ভাণ্ডার ‘ কে। বেশ লড়াই করে ভাগ বাটোয়ারা এর সময় প্রতিষ্ঠিত করেছে নিজেদের অধিকার। এক হাতে দোকান আর এক হাতে ছেলে মানুষ করার গুরু দায়িত্ব সামলেছেন।

.

.

অকাল বৈধব্যের জীবনে কোনো পর পুরুষের সঙ্গ কামনা করা তো দূরের কথা, মনের মধ্যেও ভাবনাটা আসেনি বছর একত্রিশ এর শ্যামশ্রীর। আজ এক সেলাই করা সংসারের মালকিন সে। শিকারী চোখের লোলুপ দৃষ্টির মানুষজনের থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে যথেষ্ট শালীনতার সাথে হালকা কালারের শাড়ি পরে ও। তাও দোকানে মাল নিতে এসে কিছু খদ্দের এর চোখ যেন ওর গোটা শরীর মেপে দেখে। বড় অস্বস্তি লাগে, শ্যামশ্রীর। ছেলে, সমরেশের চোখের আড়ালে চোখের জল ফ্যালে ও।

.

.

.

.

টানাটানির সংসারে আশার আলো বলতে তো ঐ টুকাই। টুকাই – সমরেশের ডাক নাম। টুকাই যখন সিক্স এ পড়ে, তখন একদিন মাকে লুকিয়ে চোখের জল ফেলতে দেখে ভ্যা করে কেঁদে উঠেছিল সে। মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে নিষ্পাপ শিশু সেদিন বলে উঠেছিল, মা! যদি বড় হতে পারি, তাহলে আর আমাদের দুঃখ থাকবে না। ছেলের গালে হামি খেয়ে, বুকের জ্বালা বুকে লুকিয়ে শ্যামশ্রী বলে উঠল, তুই থাকতে দুঃখ কিসের সোনা? খুব সন্তর্পণে পা ফেলে এসে নিয়তি দূর থেকে হেসেছিল। আসলে, সেদিন জন্ম নিয়েছিল এক মেগ্যালোমোনিয়াক ভাবী শাশুড়ির।

.

.

বরাবরের মেধাবী সমরেশ স্কুল, কলেজের গন্ডি পেরিয়ে ম্যাট টেস্ট দিয়ে কম খরচে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করছে। কিন্তু, চব্বিশ পরগনা জেলার নিশ্চিন্তপুর থেকে আসা সমরেশ পাইকার কখনও প্রেম করার সাহস দেখায়নি। অথচ ইউনিভর্সিটি প্রফেসর এর মেয়ে রাজলক্ষ্মী ভান্ডারী ওকে ক্যাম্পাসে ফুল দিয়েছিল।

.

.

চরম বাস্তববাদী সমরেশ পাইকার মৃদু হেসে বলেছিল, চরম দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করতে হয়, রাজলক্ষ্মী। একটা টিমটিমে মুদিখানার দোকান আর পৈতৃক একচালা দুটো ঘর – এই নিয়েই মা- ব্যাটার সংসার। তবে তুই ভালো বন্ধু হতে পারিস।

.

.

স্বভাব লাজুক মুখচোরা সমরেশের মুখে জীবন সম্পর্কে এত স্পষ্ট কথা শুনে পরীর মতো বেড়ে ওঠা রাজলক্ষ্মী একটু আঘাত তো পেয়েছিলই। যাইহোক, এম বি এ পাশ করে ইউরেকা ফোর্বস এ বেশ মোটা বেতনের চাকরি পায় সমরেশ। আস্তে আস্তে বাড়ির ভোল বদলাতে শুরু করে সমরেশদের। পাছে ধার চায়, এই ভয়ে সমরেশ ও তার মা শ্যামশ্রী কে আত্মীয়- স্বজন সবাই এড়িয়ে চলত।

.

.

অথচ চাকরি পাওয়ার পর সমরেশ কে ডেকে নেমন্তন্ন করল বছর তেত্রিশ এর মিতু কাকিমা। কাকিমা আর ওনার বছর দশকের মেয়ে শর্বরী একাই থাকে নিশ্চিন্তপুরে। বছর সাতচল্লিশ এর সনাতন ঢালি মিতু কাকিমার স্বামী। ওদের সাথে সমরেশদের পারিবারিক সম্পর্ক বেশ ভালো।

.

.

আসলে সনাতন কাকা প্রায় সারা বছরই বেসরকারি জাহাজে কাজের জন্য বাইরে থাকেন। বছরে বড় জোর পনেরো দিন করে মোট ত্রিশ দিন বাড়িতে আসেন। সনাতন কাকাই মিতু কাকিমা কে এই তারা মা ভাণ্ডার মুদিখানা নিতে বলে গেছিল।পরে ছেলের পড়ার খরচ জোগাতে শ্যামশ্রী দোকানের দাওয়াতে কাঁচা আনাজের ও তেলেভাজার কারবার শুরু করেছিল।

.

.

মিতু কাকিমা মেয়ের হাত ধরে এসে ওদের দোকান থেকে মালপত্র নিয়ে যেত। শর্বরীও দাদার কাছে গ্রীষ্মের ও পুজোর ছুটিতে পড়তে আসত। সব সম্পর্কই এখানে বানিজ্যিক ছিল না।

.

.

মিতু কাকিমা যেদিন সমরেশকে খেতে নেমন্তন্ন করেছিলেন, সেদিন সকালেই শ্যামশ্রী ওর বাপের বাড়ির পৈতৃক ভিটে ভায়েদের লিখে দেবার জন্য বাপের বাড়ি গেল। বহুবছর পর বলে ভাজেরা আটকে দিল। শুধু বলল , টুকাই এল না? তিন সন্ধ্যে বেলায় সমরেশ বাড়িতে চাবি দিয়ে মিতু কাকিমাদের বাড়ি চলে গেল। সমরেশের কাছে বরাবরের খোলামেলা মিতু কাকিমা।

.

.

  দ্বিতীয় অধ্যায়

.

.

     বেশ মন খুলে কথা বলে, প্রয়োজনে বন্ধুর মতো পরামর্শ দেয়। সমরেশও সন্ধ্যেবেলায় বাড়িতে চাবি দিয়ে মিতু কাকিমাদের বাড়ি চলে গেল। ওদিকে শর্বরীও দাদার সাথে খেলা করতে লাগল। ওদিকে মিতু কাকিমা সন্ধ্যের টিফিনে লুচি ঘুগনি করল; ঠাট্টা করে বলল, তুই তো এখন বড়ো কোম্পানির বাবু; কাকিমার রান্না পছন্দ হবে কিনা কে জানে? শুনে সমরেশ একটা প্রাণ খোলা হাসি দিয়ে বলল, এই ক’দিন আগেও যাদের আজ খেতে কাল ছিল না, তাদের আবার নবাবী!

.

.

শর্বরী কাকিমার কোলে অনেক পরেই এসেছে, সনাতন কাকা আসেও কম, আবার কাকিমার সাথে বয়সের ব্যবধানও যথেষ্ট। খেলতে খেলতে শর্বরী বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। কাকিমা ঘুমন্ত মেয়েকে খাইয়ে শুইয়ে দিল। তোর খবর কি বল? কাউকে দেখে রেখেছিস? আমতা আমতা না করে স্পষ্ট করে বল। দরকারে,আমিই তোর মাকে বলব।

.

.

না ইউনিভর্সিটিতে রাজলক্ষ্মী একবার প্রপোজ্ করেছিল;ওকে খুব স্পষ্ট করে ‘না’ বলে দিয়েছিলাম। টুকাই, তুই কি ওকে মনে মনে ভালোবাসিস? না, তবে ও আমার ভালো বন্ধু। সামনের মাসে ও ওর বরের সাথে কানাডা চলে যাচ্ছে। বেজায় গরম কিন্তু, কাকিমা। তা যা বলেছিস। পাশের ঘরে মেঝেতে বসে টুকাই আর তনু কাকিমা গল্পে মশগুল। আসলে, মুখ বুজে থাকতে থাকতে, তনুর ভেতরে অনেক কথা জমে ছিল।

.

.

তনুর চেয়ে বছর আষ্টেকের ছোট হলেও বন্ধু হতে দোষ ছিল না। ঝুপ করে লোডশেডিং হলে, তনু বলে উঠল, টুকাই, তুই হাত পাখা নিয়ে বস; আমি একটু কলতলায় গা ধুয়ে আসি। বেশ। অন্ধকারের মধ্যেই তনু সাবান মেখে চান করে নিল।

.

.

হঠাৎই, কারেন্ট এসে যেতে টুকাই এর চোখে যেন ঘোর লেগে গেল। তনুর শরীরী আকর্ষণের তীব্রতা থেকে চোখ ফেরানো কঠিন ছিল। টুকাই এর মধ্যে যেন হঠাৎই একটা বয়সোচিত পৌরষ জেগে উঠল, যা ন্যায় নীতি সংস্কার মানতে অস্বীকার করছিল। ওদিকে স্বামী সোহাগ থেকে বঞ্চিত তনুও নিমরাজি ছিল না।

.

.

কখন যে চার হাত এক হয়ে গেল, তা ওরাও ঠিক বলতে পারবে না। নিজেকে সমর্পণ করে তনু বলে উঠল, তোর সনাতন কাকা, বিভিন্ন ডকে নারীসঙ্গ করে। শর্বরীর জন্যও ওর আর মন কাঁদে না রে , তনু।

.

.

                         তবে তোর সঙ্গসুখ আমি উপভোগ করলাম, তুই পুরুষ। এই সম্পর্ক কিন্তু তোর বৈবাহিক জীবনে কোনো বাধা হবে না। তুই আমায় লোকচোখে কাকিমা হিসেবেই পাশে পাবি। আর আড়ালে? , টুকাই জিজ্ঞেস করলে, তনু গালে চুমু খেয়ে বলল, জানি না যা। আসলে নির্জনে ঘর কাঁপল, খাট কাঁপল, দেওয়াল ঘড়ি থমকে দাঁড়িয়ে লিখে নিল সব।

.

.

জনবিরল নিশ্চিন্তপুর গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে সনাতন কাকার বাড়ি থেকে সকালে শর্বরীকে পড়িয়ে টিফিন খেয়ে টুকাই বাড়ি চলে এল। নিজের কাকা , কাকিমা, বিধবা পিসির সঙ্গে সম্পর্ক তলানিতে ঠেকায় , কেউ ওর গতিবিধির খবরও পেল না। ইছামতী দিয়ে অনেক জলই গড়াল।

.

.

মোটা বেতনের চাকুরে দেখে অনেকেই মেয়ে দিতে চাইল। শ্যামশ্রী পাইকারকে তখন পায় কে। দীর্ঘদিনর অবহেলিত , পদদলিত , সমাজের কাছে উপেক্ষিত শ্যামশ্রী পাইকার আজ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, নিজের শ্রম, দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ও টুকাই এর নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে।

.

.

               কিন্তু, এর অর্থ কি এই, ওদের কথাতেই বাতাস বইবে, পাতা নড়বে? তাই কি? এর উত্তর লুকিয়ে আছে, সমরেশের বিয়ে পর্যন্ত।মিতু কাকিমার সাথে ঘটা ঘটনাটা নেহাতই তপ্ত মরুভূমিতে কাঙ্খিত মুষলধারে বৃষ্টির মতো।

.

.

তার ন্যায়,নীতি, মূল্যবোধের পর্যালোচনা সমাজের তথাকথিত মূল্যবোধের ঠিকাদারদের উপরই থাক। মা অন্ত প্রাণ, টুকাই শুধু একটাই কথা বলল, মায়ের পছন্দই আমার পছন্দ ; আমার আলাদা করে কোনও পছন্দ অপছন্দ নেই।

.

.

যারপরনাই খুশি হল শ্যামশ্রী পাইকার, ছেলের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দেখে। অনেক দেখেশুনে নিশ্চিন্তপুর থেকে ত্রিশ কিলোমিটার দূরে ঋজুদহ গ্রামের ধীরাজ সামন্তের মেয়ে মল্লিকা সামন্তকে বৌমা নির্বাচন করল শ্যামশ্রী পাইকার। মল্লিকা সেই বছরই উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে কলেজে ভর্তি হয়েছিল।

.

.

সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণা মল্লিকাকে দেখে পাড়ার ডক্টরেট শাশুড়িরা যেচে পরামর্শ দিল, অল্প বয়সী মেয়ে বৌমা পেয়েছো, নিজের মতো করে গড়েপিঠে নিও। জীবন যুদ্ধে ভালো মতন পুড়ে পোক্ত হওয়া শ্যামশ্রী অনেক ভেবেচিন্তে ঘটি বাড়িতে ছেলের বিয়ে দিল।

.

.

একে ঘটি, তার উপর আবার উগ্র ক্ষত্রিয়। আসলে ধীরাজ সামন্তের রেশনের ডিলারশিপ, পয়সার অইগই নেই। কিছু না চাইতেই সমরেশদের সদ্য বানানো দোতলা বাড়ি পুরো সাজিয়ে দিল। বেমানান বলতে শুধু রয়ে গেল ঈশ্বর পৃথ্বীরাজ পাইকার প্রতিষ্ঠিত ‘তারা মা ভাণ্ডার’; শ্যামশ্রীর দীর্ঘ ষোলো বছরের সংসার সংগ্রামের এক নির্ভরযোগ্য সঙ্গী।

.

.

                         আর মল্লিকা? ওর দু’চোখে শুধু স্বপ্ন আর স্বপ্ন; স্বামী সোহাগের স্বপ্ন, উদ্দাম প্রেমের স্বপ্ন; নতুন সংসারের স্বপ্ন; পড়াশোনা থেকে মুক্তির স্বপ্ন। মল্লিকা আসলে ধীরাজ সামন্তের আদরের বাগানে স্নেহের প্রজাপতি। বাপের বাড়িতে আত্মীয় স্বজন কত বলেছে , মল্লিকা আমাদের রাজনন্দিনী; ছোট নির্ঝঞ্ঝাট সংসার; স্বামী সকালে অফিস বেরিয়ে যায়; শাশুড়ির আর বৌমার তখন সারাদিন রাজত্ব।

     .

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *