সাম্প্রতিক বাংলা কবিতায় মেটাফোর থেকে মেটাফিজিকস্ // তৈমুর খান

.

sahityakaal.com

.

সাম্প্রতিক বাংলা কবিতার একটা ধারা যে উপমাত্মক বা রূপকাত্মক পর্যায়ে বেশি চর্চিত হচ্ছে তা metaphor হিসেবে ইতিমধ্যেই পাঠকের মনোযোগ দাবি করতে শুরু করেছে। metaphor আসলে একপ্রকার রূপক অলংকার যা পরোক্ষ উপমা হিসেবেই কাব্যে কবিতায় মূল বিষয়ের প্রতি যথার্থ ইংগিত দেয়।

.

.

আমরা যা দেখতে অক্ষম বা সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারি না, উপমার দ্বারা তা এমনভাবে কবি উপস্থাপন করেন যে সেই গোপন মর্ম বা রূপ বা আলোড়ন প্রকৃত সত্যের মুখোমুখি করে। পাঠককে প্রকৃত সৌন্দর্যের চাবি খুঁজে পেতে হয়। Family Friend Poems Forums কৃত Metaphor সম্পর্কে উল্লেখ করেছে কয়েকটি কথা :

.

.

“People have used metaphors since the birth of mankind. Metaphors are a way to get around censorship as well as to help us see truths that we may not be able to face if they were stated plainly. It is a way to accentuate beauty as well as pain through this medium of the unstated comparison. When you are reading an appropriate metaphor you are immediately drawn between the truth of the comparison that is being alluded to. The ability to understand metaphoric language opens the key to poetry of tremendous beauty.”

.

.

যার অর্থ করলে দাঁড়ায়, জন্মের মুহূর্ত থেকেই মানবজাতি পরোক্ষ উপমা ব্যবহার করে আসছে। মানবজাতিকে বিবাচনের পথ বাতলে দেয় প্রকৃত সত্যের কাছে পৌঁছাবার যা নাবালভূমির মতো আড়াল থাকে, যাকে দেখা যায় না, উপমা তাকেই প্রতীয়মান করে। অদৃশ্য বা অব্যক্ত ব্যথার মতো লুকানো অনুভূতিও এই রূপকর্মে ধারণা দিতে পারে। প্রকৃত পরোক্ষ উপমার পাঠ প্রকৃত সত্যের দিক নির্ণয়। এর ভাষা বোধগম্য মানেই অদ্ভুত সৌন্দর্যের সম্মুখীন হওয়া।

.

.

          মেটাফোর কবিতার অদ্ভুত সৌন্দর্য তলিয়ে দেখার সময় আমাদের এসেছে। এত কবিতা লেখা হচ্ছে, কোনটা কী ধারার কবিতা, সেসব দেখা পণ্ডিতের কাজ। আমরা দেখতে চাই সাম্প্রতিকের কবিতাগুলিতে কতখানি মেটাফোর প্রভাব ফেলেছে। বেশ কয়েকজন কবি বাংলা কবিতায় এই রূপক অলংকারের চর্চা করে চলেছেন। এঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন গোলাম রসুল। তাঁর “অচেনা মানুষ আমি”, “বেলা দ্বিপ্রহর”, “বৃষ্টির একপাশে উড়ছে পাখিরা” এবং “দুই মাস্তুলের আকাশ” কাব্য কয়খানি মেটাফোরিক কাব্যভাষায় ঠাঁসা ।

.

.

উপমাগুলিও একই সত্যের দিক নির্দেশ করেও বহুস্বরিক এবং বহুরৈখিক হয়ে উঠেছে। সত্যটি আত্মস্ফুরণ । এক সত্তার ব্যাপ্তিতে বহুসত্তায় অনুগমন । যাকে Monism বা অদ্বৈতবাদ বলা চলে। কবি বিশ্বাস করেন, বস্তু এবং মনের কোনও ভেদ নেই। যার মূল কথা হল : Thus meterialis and idealism or spiritualism are both specious of Monism. কবির কবিতার সমূহ চিত্রকল্পই এই বোধের দ্বারা চালিত হয়েছে :

.

.

১.সোনালি চুড়ির মতো সরু হয়ে আসছে দিন

  দূর রাস্তা ঢুকে যাচ্ছে অন্ধকারের অন্দরমহলে

২.সারি সারি গাড়ি

  যেন সমুদ্র দাঁড়িয়ে আছে আর টলছে

   বিপদের দিকে তাকিয়ে

৩.অবাস্তবের ধারে

  ডাঙায়

  মাছ জমছিল

  একমুঠো ছড়ানো রুপোর জীবন্ত পয়সা

৪.স্বপ্নের জন্য রাত্রি তরল হয়ে সামান্য বিশ্রাম নেয়

৫. বৃষ্টি মিনার

   সদা একাকিত্ব

   দেখা যায় না

   একটি অনুভব যা শুধু পাঠিয়ে দিচ্ছে মানবতা

   পরিষ্কার জলে এত হাসি ছিল হয়তো কেউ জানত না

.

.

মানবতার অনুভূতিতেই বস্তুত প্রাণের চরিত্র পেয়েছে। ধারণা বা কল্পনা, অবাস্তবতা বা দিন ও রাত্রি এক একটি ব্রহ্মসত্তার রূপ, যার মধ্যে মানবীয় স্ফুরণ দেখা গেছে। তাই “দিন” পেয়েছে সোনালি চুড়ির উপমা। “দূর” পেয়েছে অন্দরমহলে প্রবেশের পথ। “সমুদ্র” মাতাল হয়ে টলেছে, তার বিপদের চেতনা জেগেছে। “অবাস্তব” কখনও চোখে দেখা যায় না, তবু তার ডাঙায় মাছের জমে ওঠা এবং “রুপোর পয়সা”র জীবন্ত হওয়া সবই পরোক্ষ উপমায় মনুষ্যবোধেরই ধারক ।

.

.

“রাত্রির” তরল হয়ে বিশ্রাম নেওয়া, “বৃষ্টির” মিনার “সাদা একাকিত্ব” সবই রূপক অলংকারের এক অদ্ভুত সৌন্দর্যের ভাষা এনে দিয়েছে। মেটাফোর কবিতায় যা প্রয়োজন অর্থাৎ এডিশন এর ভাষায় যাকে বলা হয় :“Those beautiful metaphors in scripture where life is termed a pilgrimage.”  জীবনপথিকের এই যাত্রা তো চলতেই থাকে এভাবেই।

.

.

      লক্ষ্মীকান্ত মণ্ডলের “সজনে ফুল ও নিঃশর্ত সমর্পণ”, “আঁধারের পাঁজর”, “কালো নৌকার তৃষ্ণা” প্রভৃতি কাব্যের বহু কবিতায় মেটাফোর চর্চা করেছেন। জীবনের আত্মায় লেপ্টে থাকে ঈশ্বরের বাঁশি। তাই কবির কণ্ঠস্বর ফুটে ওঠে জীবনের এই প্রত্যয় ভূমির pilgrimage :

.

.

১.হলুদ পাখির গান ছিঁড়ে সুখের উপনিষদ

  মেঠো প্রজাপতির পিছনে আমি

  পৌঁছে যাই একমুঠো নীল বিশ্রামে

২.গতরাতের জেগে থাকা ঝিঁঝির ঝিমধরা হৃদয়

  বেজে ওঠে সমুদ্রের স্বীকারোক্তি, দানপত্র

৩.পিচ রাস্তায় ঘোড়াপোকা অপেক্ষায় ভাবে রাত রং

৪.ক্ষুধাও কেমন তাকিয়ে থাকে, চুমু খায় শ্বাসকষ্টে

  দূর শুধু দূরেই সরে যায় স্বাতী নক্ষত্র

৫.এই বোধের স্পন্দনে মেঘের জোট ভাঙে বটপাতা

                              ছুঁয়ে দেয় চাঁদ

.

.

“হলুদ পাখির গান” কীভাবে “সুখের উপনিষদ” ছিঁড়ে দেয়, “মেঠো প্রজাপতির পিছনে” এসে কীভাবে “নীল বিশ্রামে” কবি পৌঁছান, ঝিঁঝির “ঝিমধরা হৃদয়”, “সমুদ্রের স্বীকারোক্তি”, “ঘোড়াপোকার” চেতনা এবং “ক্ষুধার” চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সবই রূপক অলংকারের মাধুর্যে বেজে ওঠা মনুষ্যলোকেরই অনুভূতি। প্রাণের আরোপ আছে বলেই “মেঘের” বোধ যেমন জেগেছে এবং “বটপাতা” চাঁদও ছুঁয়ে দিতে পেরেছে। কর্মপদ এবং ক্রিয়াপদে প্রায় সমাগত বোধের সাম্রাজ্য। কবির Analogy এত সূক্ষ্মতার সঙ্গে রহস্যের গভীরে প্রবেশ করেছে যে পাঠক সহজেই উদ্দেশ্য ও কর্মক্রিয়াকে অনুধাবন করতে পারবে।

.

.

      কবি সিতাংশু গোস্বামী, তপন দাস, অলক জানা প্রমুখ কবিরাও মেটাফোর চর্চায় অগ্রসর হয়েছেন। সিতাংশু গোস্বামীর “কতদূর সমুদ্র মন্থন”, “প্রিয় পরাজয়”, “অসম্ভব ধুলোবালি”, “ভ্রান্তির খড়কুটো”, “সফেদ শাঁখের কণ্ঠ” এবং “মধুমাসে বেদে নাচ” কাব্যগুলিতে ছড়িয়ে আছে মেটাফোর বার্তা। বস্তু বিদ্ধ বাস্তবের রূপের মধ্যেও মরমিয়া সাধকের রহস্যময় ব্যাপ্তি দেখতে পাই। কবি যখন লেখেন :

.

.

১.হাটে-মাঠে, পথে-ঘাটে ঘোরে যত অরসজ্ঞ কাক।

  জ্ঞানের নিমের ফল ধরা থাকে সব করতলে

  মইটানা এ জীবনে বসবাস ছলিত আদলে

২.ভুলের পইঠা বেয়ে নিত্য বাড়ে জড়ের বিকার

   হৃদয়ের গ্রন্থি বাঁধে বিষ গিঁটে অসুখী আঁধার

৩.পাঁকাল মাছের মতো উদাসীন চারণ কোথায়

   সংযমী কাছিম কই —নিজেকে যে সহজে গোটায়

   চোর সাজে মহাজন, সাধুদের সিঁধেল বানায়

.

.

     ভারতবর্ষের সারস্বত পথ চর্যা, কীর্তন, বৈষ্ণব পদাবলি, চৈতন্য চরিত এবং মঙ্গলকাব্যের পথ ধরেই কবি তাঁর মিথ্ রচনা করেছেন। রহস্য সেইখানেই রূপকের আড়ালে ভণ্ডামি ও এক অন্তঃসারশূন্যতার প্রতিলিপিকে দেখাতে চেয়েছেন। তাই “অরসজ্ঞ কাকের” আড়ালে কাব্যবোধহীন মানুষ, “জ্ঞানের নিমের ফলে”-র আড়ালে প্রকৃত রসজ্ঞানহীন বিষয়ী বিদ্যানন্দীদের বুঝিয়েছেন।

.

.

তেমনি ভুলের পইঠায় “জড়ের বিকার”, হৃদয়ের গ্রন্থির বিষগিঁটে “অসুখী আঁধার”, “সংযমী কাছিম”, “চোরের মহাজন” এবং “সাধুদের সিঁধেল” সবই মনুষ্যেতর পরিচয় যা মানুষই বহন করে চলেছে। এমনই রূপক অলংকারগুলি যা আমাদের প্রাচীন সাহিত্য থেকে সাম্প্রতিকের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সেই সত্যটি গোপন অস্ত্রের মতো প্রয়োগ করে যে রসের পরিচয় দিয়েছেন তা Metaphoric language হিসেবেই Tremendous beauty এরই চাবি বলতে হবে।

.

.

       কবি তপন দাস “রাত বারোটার আজান”, “চিতা কাহিনি”, “শব্দর ভিতরে সহজ আলো”, “একটি রাস্তার প্রতিবেদন”, “নগ্ন হয়ে যাবার আগে” প্রভৃতি কাব্যে তাঁর মেটাফোর সৃষ্টিকে তুলে ধরেছেন। বস্তুচেতনার জগৎ থেকে অন্তর্চেতনায় অথবা নিশ্চেতনায় কবি অগ্রসর হতে চেয়েছেন। তিনি লিখেছেন :

.

.

১.রাত তাকে ফেলে গেছে

  সঙ্গে তার দীর্ঘকায় ছায়া! নীল ছোঁয় তাঁতঘর

২.কারা কাঁদে নুন-চোখে?

   মুখ বুজে ছাই মাখে গায়ে। পাখি ওড়ে বাসা ছেড়ে

৩.এই মাটিতে পায়রা-কথা

  আগুন মেঘে স্বপ্ন রাখি

.

.

“রাত” শুধু মাধ্যমই নয়, একটা চরিত্রও যা সময় নির্ণয় করে দেয়, আর “দীর্ঘকায় ছায়া” আত্মসর্বস্বতার প্রতিফলন মাত্র। কবি বিস্ময় সূচক চিহ্ন ব্যবহার করে সংশয়টি গোপনে ধারণ করেছেন। “নীল ছোঁয়” কথাটি জীবনের সংরাগ প্রকাশের অভিযাপন পর্ব। “তাঁতঘরে”-র রূপকে এই সংসারে জীবনকে বোনার মর্মটিই প্রকাশ পেয়েছে। “নুন-চোখ”, “পায়রা-কথা”, “আগুন মেঘ” সবই রূপকের আড়ালে জীবনের পরিচয় বা কষ্টলালিত দীর্ঘজীবনসত্যের পর্যায়। এসবই একদিকে যেমন Accenture beauty তেমনি অন্তর্বাহ বেদনার মাধ্যমও ।

.

     কবি অলক জানা “বাঁশপাতার চিতা” এবং “চোখতীর্থের শুভেচ্ছা” কাব্যেও গ্রাম্যজীবনের মিথে এক অনাড়ম্বর চিত্রকল্পে মেটাফোর প্রয়োগ করেছেন। প্রতিটি চিত্রকল্প জীবন্ত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সমন্বিত। কবি লেখেন :

.

.

১.মেঘ ব্রা-তে ভেজা চাঁদ নিঃস্ব, আঙুলের আগায় মুখ জাগে, জাগে ঠোঁটও

২. উঠোনে শীতের ফুলমেলা, নুয়ে পড়া বাঁশবনের                                   অভিবাদন

    সরীসৃপ আলো যায় পশ্চিম যাপনে

৩.অক্ষর কংক্রিটের ছাদ সহজে ভাঙে না, সমস্ত নষ্টনদীর ওপর

  সেতু বেঁধে দাও, তোমার চিন্তাবীজ আর একটা তাজমহল হোক.

.

নিজের বোধের সাম্রাজ্যে প্রকৃতির একটা ভাষা নির্মাণ করে চলেছেন কবি। কোনও তত্ত্ব নেই, স্বপ্ন নেই, অথবা একাকিত্বের ঘোর হাহাকার নেই। বিষাদের দরবার নেই। নিজস্ব ভাঙন আর জীবনযাপনের এক সহজিয়া সাহচর্য আছে। যেখানে নিজের সঙ্গে প্রকৃতির আলাপচারিতা চলে। আবার ভালবাসায় ঘুমিয়ে পড়াও চলে। মানব চরিত্রের নানান ক্রিয়া প্রকৃতিতেও প্রতিফলিত হয়।.

.

       কবি অনুপ মণ্ডল “চাঁদ মোহনের পাথর” এবং “অন্যান্য ও শৃগাল তান্ত্রিকতা” কাব্যে মানুষের আদিম রূপকেই মেটাফোর বোঝাতে চেয়েছেন। একদিকে সভ্যতার আলোক দীপ্তি, অন্যদিকে অন্ধকার প্রবৃত্তির ঘোর বিদ্রোহ যা নঞর্থক অথবা অসামাজিক ক্রিয়াকল্পে ভরপুর। কবির কাছে মেটাফোর তখন A way to get around censorship হিসেবেই এসেছে।.

.

১.জীবনী লেখা শেষ হয়ে এলে

  সকাল পরীদের মতো

  জানি, ঘুনপোকাদের ডানাও গজাবে একদিন

২. টলোমলো পায়ে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে

   প্রত্নতাত্ত্বিক নৌকোর ভাঙাচোরা গলুই

৩.অন্ধকারের স্তন ফেটে ঝরে পড়া মধু ও দুধের

  অজৈব অজৈব গন্ধে জেগে ওঠে প্রত্নবিভীষিকা,

  ভাঙা তোরণের বছর বিয়েনে ফিরে ফিরে আসে

  দুর্গন্ধময় মৃতনারী.

.

মানবিকতার শরীরে মানুষের মৃত্যু বাহিত হয়। আত্মসুখের জন্য হিংস্র বিলাস কবি অনুভব করেন। কিন্তু প্রত্নবিভীষিকা আমাদের জহরব্রত জীবনের অগ্নিপরিধি হয়ে ঘুরে আসে। মেটাফোরের আশ্রয়ে সেই ভাষা মহিমা ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছেন কবি, বলেই “প্রত্নতাত্ত্বিক” এবং “প্রত্নবিভীষিকা” আদিম রূপতাত্ত্বিকের শেকড় সন্ধানে প্রবৃত্ত।.

.

    কবি রিমি দে “লীনতাপ, বরফকুচির দিন”, “অর্ধেক সাপ”, “মৌস্বাক্ষর”, “রাবণ” প্রভৃতি কাব্যে মেটাফোরের চূড়ান্ত পরীক্ষানিরীক্ষা করেছেন। তাঁর ব্যবহৃত শব্দগুলিই মেটাফোর হিসেবে কবিতায় আসে। চরিত্রের প্রতিরূপ হয়ে সেগুলি মহিমা পায়। আসলে উপমা পদটিই উপমেয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেন তিনি। তুলনা বাচক অব্যয়টি ব্যবহার করেন না। সেকারণে তাঁর শব্দ নির্মাণে ও চিত্র বিনির্মাণে খেলাটি ভিন্নতর রূপ পায়। মেটাফোর পাল্টে যায় এই বিনির্মাণতত্ত্বে, অথচ অন্তঃসলিলার মতো থেকে যায় মূল সত্যটি। তাকেই গোচরীভূত করেন কবি।.

.

১.তিনটি স্পেস জুড়ে রাঙারোদ্দুর

  রক্তজবা হয়ে উঠছিল রূপালি বুধবার

২.আগুনরূপী গন্ধরাজ

   নাড়িয়ে দিচ্ছে

   নাড়িয়ে দিচ্ছে ব্যক্তিগত বোধও স্রোতের ভবিষ্যৎ

৩.মুখ বুক চোখ ফেটে চাপা শিশিরের

  দ্বিধা ও বেদনার দানা.

.

স্পেস জুড়ে “রাঙারোদ্দুর” রক্তজবা হয়ে ওঠা “রূপালি বুধবার”, “আগুনরূপী গন্ধরাজ”, “চাপা শিশির” এবং “দ্বিধা ও বেদনার দানা” সবই পরোক্ষ উপমায় নিবিড় সংযোগ এনে দিয়েছে, অথচ তাৎক্ষণিকতায় বিনির্মাণে পুরাণকথিত মিথকেই (রাবণের উপমায়) কাব্যের নামকরণে কবি ব্যবহার করেছেন। সব উপমার মধ্যেই একটা Homogenized ঘটেছে ।তাই “রাবণ” কাব্যে সরাসরি মেটাফোরের ব্যবহার না থাকলেও Medium of the unstated comparison হিসেবে উল্লিখিত হয়েছে।

.

.

     বাংলা সাহিত্যে কবিরা মেটাফোরের সঙ্গে যেমন মেটাফিজিকস্-কেও মিলিয়ে দিচ্ছেন, তেমনি স্বপ্নচারিতাকেও উপেক্ষা করেন না। কবির আত্মদর্শনে অস্তিত্বের অন্বেষণ, সত্য নির্ণয় এবং প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগের বিষয়টি অধিবিদ্যায় প্রতিফলিত। B. Russell এই কারণেই বলেছেন : “Metaphysics or the attempt to conceive the word as a whole by means of thought.”এর সঙ্গে অতিলৌকিক বা পরাদৃষ্টিময় অনুভূতিও মিশে থাকতে পারে।

.

.

উপমায় সেগুলিও প্রতিফলিত হয়। সপ্তদশ শতকেই ইংরেজ কবিরা এই ধারার প্রবর্তন করেছিলেন। বর্তমানে অধিকাংশ কবিই কাব্য রচনায় এই ধারাটিতে আসক্ত হচ্ছেন। মেটাফোরের সঙ্গে মেটাফিজিকস্ এবং জীব ও জড়ের তফাত ঘুচিয়ে মানবীয় বৈশিষ্ট্যে সমন্বিত করে তুলছেন। স্বাভাবিকভাবেই কবিরা যেমন নৌকার নিঃশ্বাস শুনতে পাচ্ছেন, তেমনি গাছেদের পারস্পরিক কথাবার্তাও অনুভব করছেন। চাঁদ এসে যেমন প্রেমিক কবিকে ডেকে নিচ্ছে, তেমনি সূর্যও উটের গ্রীবার মতো তার জানালায় রোদ ছুঁড়ে দিচ্ছে ।

.

.

নক্ষত্রদের পাঠশালা, অন্ধকারের ভ্রুভঙ্গি, আকাশপরীর ডানা ঝাপ্টানো আর উড়ন্ত জাহাজের মাথায় খোলাচুলের ঝুঁটি সবই কবিরা দেখে চলেছেন। গাছেদের, পাখিদের দুঃখের কথা শুনতে শুনতে কবিরা কবিতা লিখছেন। কাগজের টুকরোগুলি চিৎকার করছে, কলম প্রতিবাদ করছে, ক্যালেন্ডারের রবীন্দ্রনাথ মানবতার মৃত্যু দেখে কাঁদছেন।

.

.

সবই মেটাফিজিকস্-এর ভেতর ঘটে চলেছে অবিরাম ক্রিয়াকল্প। মানুষ যা চিন্তা করতে পারে, উপলব্ধি করতে পারে, প্রকাশ করতে পারে —সবই তাঁর সৃষ্টির জগতে স্থান পায়। কয়েকজন মাত্র কবির নাম ও তাঁদের কবিতা উদাহরণ হিসেবে লেখা হলেও তাবৎ কবির মধ্যেই এই প্রক্রিয়া আবহমান কাল ধরেই চলে আসছে। এ কখনওই থামবে না। জন্মমুহূর্ত থেকেই সমস্ত জীবন ধরেই কবিরা তথা মানুষেরা মেটাফোরকে লালন করতে শেখে আর মেটাফিজিকস্-কে ধারণ করতে শেখে।

.

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *