শিল্পীর সম্মান — কলমে:উমা ভট্টাচার্য

sahityakaal.com
অনুষ্ঠান মঞ্চে উঠে ও টিনা গান গাইতে পারলো না।
অনুষ্ঠান পরিচালক মন্ডলীর একজন সদস্য বললেন, সময় কম এরপর অনেক বড় বড় শিল্পীরা আছেন ,তাই অনেককেই আমাদের বাদ দিতে হলো। অনুষ্ঠান পরিচালন মন্ডলীর এরূপ সিদ্ধান্তে অনেকে ই ক্ষোভে ফেটে পরলো।
এক ব্যক্তি কে উত্তেজিত হয়ে বলতে শোনা গেল, এটা কি কোন অনুষ্ঠান হচ্ছে ,না কি মিউজিকাল চেয়ার গেম হচ্ছে? যে হঠাৎ হঠাৎ করে মিউজিক বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে?
টিনা মঞ্চ থেকে নেমে মাকে জড়িয়ে কেঁদে ফেলল, তার জীবনে এরকম কোনদিন হয়নি।
টিনার মা পর্নারও খুব খারাপ লাগছিল কিন্তু কিছু তো করার নেই, এত বড় অনুষ্ঠান কত বড় বড় নামী নামী শিল্পী এসছেন, জ্ঞানী গুনী মানুষেরা তাদের বক্তব্য রাখবেন। তাই পরিচালক মন্ডলী যা ভালো বুঝেছেন তাই করলেন। 
পর্ণা, টিনার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল ,কাঁদিস না মা, চল বাড়ি চল। এরপর তোর তো আরও  অন্য জায়গায় প্রোগ্রাম আছে, তার জন্য তো প্র্যাকটিস করতে হবে, চল বাড়ি চল।
এদিকে মঞ্চে তখন পরবর্তী অনুষ্ঠানের ঘোষণা চলছে।
 
ঘোষক দিবাকর বাবুর ঘোষণা অনুযায়ী, স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তথা বিখ্যাত বাচিকশিল্পী শ্যামল সরকার মহাশয় বক্তব্য রাখতে মঞ্চে উঠলেন। মঞ্চে উঠে তিনি দর্শকদের শুভ সন্ধ্যা জানিয়ে বললেন, খুব ভালো লাগছে আমার, আজও অনুষ্ঠানে থাকতে পেরে। 
তবে আমি আমার বক্তব্য একদম ই দীর্ঘ করবো না আর আমার আবৃত্তি, সে তো গতকালও আপনারা শুনেছেন। আজ না হয় নাই শুনলেন। আমার স্ত্রীরও একই মত, তিনিও আজ আর মঞ্চে উঠবেন না।
 তার চেয়ে আপনারা এখানে আমন্ত্রিত কচিকাচাদের পারফর্ম দেখুন, যারা অনেক আশা নিয়ে অপেক্ষা করছে বা করছিল নাচ গান আবৃত্তি করবে বলে। তাদের পারফর্ম দেখে হাততালি দিয়ে উৎসাহিত করুন ,তারাই তো আমাদের গর্ব ,আর এটুকু বলেই আমি আমার বক্তব্য শেষ করছি ,নমস্কার।
 
মঞ্চ থেকে নামার সময় শ্যামল বাবু, ঘোষক দিবাকর বাবু কে যেন কিছু একটা বলে নামলেন।
তখনই দিবাকর বাবু মঞ্চে এসে ঘোষণা করলেন কয়েকজন শিল্পীর নাম, যারা বাদ পড়ে গিয়েছিল। সেইসাথে টিনার নামও।
টিনা নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না, টিনার চোখে জল এল কিছু ভেবে।
পর্ণা টিনা কে বলল, কেঁদোনা।আর হ্যাঁ , ওই যে মঞ্চের পাশে বসে আছেন ভদ্রলোক, একটু আগে যিনি মঞ্চে ছিলেন, শ্যামল বাবু। মঞ্চে ওঠার আগে ,ওই বড় মনের মানুষটির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে, মঞ্চে উঠ কেমন।
টিনা মাকে বলল, মা আমি ওনাকে প্রণাম করব নিশ্চয়ই তবে অনুষ্ঠান মঞ্চে উঠে আমি আর গান গাইব না।
 পর্ণা টিনা কে বুঝিয়ে বলল, জানি তুমি অপমানিত হয়েছ, তবুও বলছি ,ওই মানুষটা কে সম্মান জানানোর উদ্দেশ্যে তুমি গাইবে।
কেন জানো, উনি বড় নামী শিল্পীদের পাশাপাশি তোমাদেরও সমান গুরুত্ব দিলেন, সম্মান দিলেন। নিজের আবৃত্তি পাঠ বন্ধ রেখে, নিজের বক্তব্য সংক্ষেপ করে তোমাদের সুযোগ করে দিলেন ,তাই ওনাকে সম্মান জানানো কর্তব্য তোমার এবং তোমাদের সবার।
 পরের বার না হয় গেওনা।
 
টিনা শ্যামল বাবু এবং তার স্ত্রীকে প্রণাম করতে গেলে, ওনারা খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কে মা তুমি, প্রণাম করলে হঠাৎ? অনেক বড় হও মা।
আপনারা আমাকে চিনবেন না, আমি টিনা, অনুষ্ঠানে গান গাইতে এসেছিলাম কিন্তু বাদ পড়ে গেছিলাম, আপনারা আমাকে আবার সুযোগ করে দিলেন গাইবার। আপনাদের আশীর্বাদ আমার খুব দরকার জীবনের চলার পথে।
 
শ্যামল বাবু খুব শান্ত গলায় বললেন, তোমাদের ছোটদের জন্য সব সময় আমাদের বড়দের আশীর্বাদ থাকবে মা।আর সুযোগ করে দেওয়ার কোন ব্যাপার না , তোমার মত আমাদেরও একটি সন্তান আছে। সেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান করে, তার সাথে যদি এমন হতো, আমাদের কি ভালো লাগতো? তোমরা ছোটরা খুশি হলেই আমরা বড়রা খুশি। তুমি এবং তোমরা ছোটরা আমার সন্তানের মত। অভিভাবক হিসেবে এটা আমার ভালবাসা,কর্তব্য।
ইতিমধ্যে মঞ্চে টিনার নাম ঘোষণা করা হলে, টিনা মঞ্চে গিয়ে উঠলো।
সবাইকে নমস্কার জানিয়ে টিনা গান শুরু করলো।
পর্ণা অবাক হয়ে গেল টিনার গান শুনে, এ গানটা তো তার মেয়ের গাওয়ার কথা ছিল না।
টিনা গাইছে,”আমরা সবাই রাজা আমাদেরই রাজার রাজত্বে…………………. রাজা সবারে দেন মান, সে মান আপনি ফিরে পান………
পর্নার চোখ জলে ভরে  এল।।
 
 
 
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *