মানিক বৈরাগীর পাঁচ কবিতা

না লেখা বাক্যটি তোমার

মগজে কোষে কোষে  গিজ গিজ করছে কতো রঙ বেরঙের শব্দ।কিলবিল ছোটাছুটি করছে,  ঝরছেনা একটিও কলমের ফনায়,শুধু অচেনা দীর্ঘশ্বাস ঝরে অবিরত। হু হু করে আসে অনাহুত বেদনা।
আপেল সদৃশ কষ্টরা দুমড়ে  মুচড়ে বেয়ে ওঠে, কান্ড হয়ে ঢালে শাখা-প্রশাখায় পাতার শিরায়।এই শীতে কুয়াশার মতো ধোঁয়া উড়ে আর পাক খায় ঠোঁটে, আজকাল ভুলে যাই ভেসলিনের প্রলেপ লাগাতে,বৈশাখী খাঁখাঁ মাঠের মতো চৌচির, হা করে আছে ঢেলার মতো।

কতোদিন তোমার সাথে বাদাম চিবুতে চিবুতে ঘাস ছিড়িনা,সবুজ ঘাসের প্রতি মায়া জন্মেছে। অথচ কতোজনে বাল ছিড়ে ছাপায়, দৈনিকের সাপ্তাহিক সাহিত্য পাতায়।

আমি শুধু শ্রাবণের মেঘাচ্ছন্ন জ্যোৎস্নার মতো, একা তোমাদের পাড়ার রাস্তা দিয়ে হেটে যাই।শ্রাবণ সন্ধ্যায় তোমাদের ঝুলবারান্দায়, তুমি আয়েস করে চা খেতে বসো কি-না, আড়চোখে দেখি।
তোমাদের পেইংগেস্ট  বুঝি এখনো বাসা পায়নি!ইদানীং সেও  ঝুলবারান্দায় বসে তোমার সাথে চা খায়,সিগারেট জ্বালে,ধোঁয়ার কুন্ডলী পাকিয়ে উদার বাতাসে ছেড়ে দেয়।এসব দেখতে দেখতে দেখবে দীর্ঘ একটি কবিতা সত্যিই লেখা হবে!!

তুমি হয়তো জানোনা , জানালার কার্নিশের টবে ফুটেছে গোলাপ। মিষ্টি মিষ্টি কালো গোলাপ। উঠোনের ছাতিম ফুলের সৌরভে মৌ মৌ করছে বাতাস। তোমাদের বাড়ি টি যদি আমাদের দক্ষিণে হতো নিশ্চয়ই তুমি সুরভি পেতে।পেছনের বাঁশঝাড়ে বাঁশফুল ফুটেছে। তুমি বাঁশফুল, ফল দেখতে চেয়েছিলে।আসোনি অতিথি নারায়ণ রাগবে বলে। অথচ মৌসুম টি ফুলের, তুমি  থোকা থোকা  সেগুন ফুল চেয়েছিলে, বেমালুম ভুলে গেলে বলে ফল হয়ে গেলো।

আসছে শ্রাবণে কদম গাছ কাউকে বাইতে দিবোনা,এমোন কি আমাদের সদর দরোজায় লাগোয়া চাঁপা গাছে ও তখোন ফুল আসে,তুমি বোতলে ভরা চাঁপা চেয়েছিলে,পড়ার টেবিলে রাখবে বোলে।বুক রে-কে বাঁধানো চে’র ছবি টা নিশ্চয়ই যত্নে রেখেছো।

এভাবেই প্যাপিরাসের বাকলের সাথে ফুলের মন্ড হবো,তোমার গুছানো শব্দের কাগজ হয়ে যাবো। আমার না লেখা শব্দ গুলো সেই কাগজে তুমি লিখো। না বলা বাক্য গুলো হয়তো তোমার জন্যে প্রতিক্ষায় আছে।

২২জানুয়ারী ২০২০।
  


হীরক পদ্ম

কুহকি পান করো প্রস্ফুটিত বেদনার যারক রস।নীলাভ স্রোতে বয়ে যায় কুহেলিয়া,সেই স্রোতের উজ্জল পদ্মটি, ছল ও ছলের জালে ভাসে আর জ্বলে।
রইলোনা তার স্বাধীন স্বকীয়তা রুপ ও রূপের রুশ্নাই তার কাল হলো।জাল ও জলে জ্বলতে জ্বলতে পিঙ্গল রুপটি তাকে আর জলে থাকথে দিলোনা।
একদিন চারদিকে বড় বড় রশির জাল ও লোহার খাচা ফেলা হলো অথৈ জলে। বিস্তির্ণ জলরাশি কে ভাগ ভাগ করে ঘেরা হলো। পদ্মটি পানকৌড়ির মতো ডুব দিলো অতলে।
একদিন কুহেলিয়ার মোহনায় মাছযন্ত্র নেমে এলো সমুদ্র তলে।ওরা তন্নতন্ন করে তীব্র টর্সের আলো ফেলে শামুক ঝিনুক কোরাল সবখানে খোড়াখুড়ি শুরু করলো।
সমুদ্র তলের বুকচিরে তোলা হলো  উজ্জ্বল পোড়া কলিজা। কলিজার আলোকরঞ্জন বেদনায় মানুষের কি বিভৎস উৎসব।

মানুষ বুঝলো না পদ্মরুশ্নির আলোয়, তারা সমুদ্র পারাপার করে।


  সংশোধন
১৮নভেম্বর ০১৯
২৫সেপ্টেম্বর০১৮







 
জ্বলে বুকের স্বদেশ

সম্মোহন বিদ্যায় তাদের পারদর্শীতায়, তুমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পান করেছো খ্যাতির শরাব।ঝলকের ঝিলিকে বাসনার জলে ও জালে, জ্বলে রূপের নহর। ক্লান্তির অবসাদে টলে পা,ঝাঁজালো টক টক লোবানে মুখোরিত বাতাসে শ্বাস নিই বিষাদের।

   মাকড়সার ইন্দ্রজালে পোকা মাকড় আটকে গেলে  যেমন করে, তোমাদের মগজেও কিলবিল করছে বিশ্বায়নের মোহান্ধ আকাঙ্খা। তাই
তুমিও ইউরোপ আমেরিকার ইন্দ্রতান্ত্রিক আশক্তিতে উন্মাদ।বাংলাদেশের ধড়িবাজ ফটকাবাজ দুর্নীতিবাজেরা এখন কানাডায় সুশীল সোসাইটির পৌরহিত্যের আসনে বসার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। ঠিক ঠিক তোমার  চারণ ক্ষেত্র, মদ মাদুলির  মাদুরে।মোহ মোহরের ইন্দ্রজালিক বাসনায় কোন কোন জল জলসায় রূপের রুশ্নাই জ্বেলে জ্বালাও বুকের স্বদেশ।
 
শোধন
২৪জানুয়ারি ২০২০



ফেরারি স্মৃতি

ভাত ও  ফল রসের যারণ বিযারণে যে যারক সুধা স্বাদ দিয়েছো পানে,চাইনা তো আর স্বর্গের শরাব তহুরা। চুমুকে চুমুকে তোমার রূপ সৌকর্যে উপচে উঠে সুরার নহর। ঢেউ খেলে মায়াবী চাঁদোয়া,ডুবে থাকি ঝিলিক লাগা জোসনায়।

আকাশের দিকে তাকাই, অবিরাম ছুটছে রূপবতী কন্যার মতো তারারা।আমি তাকিয়ে থাকি বলেই ক্রমাগত নীলাভ হতে থাকে।কারণ আকাশের দুঃখ ঠিক আমার মতো।
আকাশ বলতে পারেনা তারারা দাপিয়ে বেড়ায়,আর নিরবে হজম করছে নিজে নিজেই।

মাঘ নিশিতে বাসি তারির সাথে নবীন রসের যৌগদ্রবণ। মাঘীপূর্ণিমার আলোয় চুক চুক পান করি,  আকাশীর মতো একা।লাল কাকড়া,কাচালংকার ঝোলে একরাশ হতাশা চুবিয়ে খাই। নেশার বিভোরে বেঘোরে  ডাকি তারে।  চিলমারীর চাঁদরাতে হিমসাগরে যে আমাকে বুকের  উষ্ণতা দিয়ে বাঁচিয়ে দিলো প্রাণ।

হা ই  ফেরারি জীবন —-


অভিমান


পিচ্ছিল মেজেতে পা ফেলা দুস্কর।চিকা, ইদুর, তেলা পোকার দখলে রান্নাঘর,শৌচালায়ে যায় না ঢুকা,রি রি করে গা।দরোজা জানালা,  আলনা ও ছাটে মাকড়শা’র রশি ঝুলছে।  টিক টিকি, তক্ষকের বিস্টা হুটহাট গায়ে পড়ছে। এ ক’দিন বইয়ের মলাটে জমেছে ধুলো,হাত ফস্কে ভেঙ্গেছে চশমাটি।

এক বেলা খাই ক্ষুধার জ্বলায়, দু’বেলা অবহেলায় যায় বেলা। কেমন যেন মন মরা,দিন চলে না,রাত কাটে’না,কতোদিন আয়নার সামনে দাঁড়াই না।

একটা মৃত বাড়ির পাহারাদারের যেমন দাড়ি গোঁফে জংলী মানুষ গোমরা মুখে বসে থাকে দাওয়ায়,ঠিক আমি ও তাই।

চলে এসো রাধা হয়ে দুষ্ট কানুর পাশে, জমে উঠুক হই হুল্লোড়।
বেজে উঠুক শ্যামের বাঁশি।

২৭ডিসেম্বর০১৭
শোধন
২৪জানুয়ারী ২০২০।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *