ভেঙ্গেছ দুয়ার // পর্ব – ৩ // সুব্রত মজুমদার

সুব্রত মজুমদার
পুরোহিতের প্রবেশ ]
পুরোহিত : কিন্তু ভাত তো তিনি যোগান না। ভাতের যোগান যিনি দেন সেই শরীরে তো চাবুকের বাড়ি ছাড়া অন্য ভালোমন্দ তেমন জোটে না।
গোয়ালা : তা যা বলেছেন ঠাকুরমশাই। আমরা খাটি, কিন্তু ভালোমন্দ জোটে মহান্তজী আর তার হুলোর দলের। আমাদের পথ বন্ধ হয়ে যায় যখন মহান্তজী পথে বের হন। রাজা দেখেও অন্ধ, ন্যায়ের দেবি চোখ তখনই খোলেন যখন মহান্তজীর ইচ্ছা হয়। 
পুরোহিত : একটু সাবধানে ভায়া, কিজানি কোথায় কোন আবডালে হুলোরা কান পেতে আছে ! ওরা তো আবার মহান্তজীরও অপেক্ষা করেনা, সঙ্গে সঙ্গে ন্যায়বিচার।
গোয়ালা : হুঁ, ন্যায়ই বটে ! ধম্মের ষাঁড় ! কই গো দিদিমণিরা, আমি এখন আসি। বিদায় গো ঠাকুরমশাই। সবাই সাবধানে থাকবেন। [ বাঁক কাঁধে তুলে গোয়ালার প্রস্থান। ]মাধবী : তোমার এবার পাট উঠল ঠাকুর। আমাকে মুখরা বলো আর যাই বলো কথা আমি মন্দ বলি না। কাল মহান্তজী এসেছিলেন এপাড়ায়। তিনি তো স্পষ্ট করেই বলে দিলেন আপনাকে একঘরে করতে হবে। 
পুরোহিত : আমাকে একঘরে করতে হবে সেটা নাহয় বুঝলাম, কিন্তু সেই কাজটা তিনি নিজে করছেন না কেন ? তিনি তো সর্বশক্তিমান।
[ কবির প্রবেশ ]কবি : হাত দিয়ে কেউ কি কাঁটা তোলে ঠাকুর ! কাঁটা তুলতে হয় কাঁটা দিয়েই। আমরা সবাই যে তার দোরের কাঁটা। আমারও সমন এসেছে।
এসেছে সমন শমন সম, – তৈরি হও।
উচ্চ-নীচে সুরুপে-কুরুপে নারী ও পুরুষে তফাৎ যাও।
দিয়ে নিষেধের বেড়াজাল ওরা হল আজ বড় বেসামাল,
ওদের সাথে একত্রেতে বল – ‘সব তফাৎ যাও।’
সব তফাৎ যাও, সব তফাৎ যাও।
কূর্চি : তাহলে কবি, তুমিও একঘরে হলে বল। 
কবি : উপাই কি বল, পরমদয়ালের দয়া বলে কথা। চক্রান্ত তো তার জলভাত। আমরা হলাম কাঠির টুকরোর মতো, আলাদা থাকলেই সুবিধা। দশটা কাঠি মিলে যখন বোঝা তৈরি হয় তখন হয়ে উঠি অপরাজেয়, সেটাই তো ওদের সমস্যা।
মাধবী : ওদেরকে জিততে দিলে হবে না কবি, ওদের ষড়যন্ত্র নিস্ফল করে দিতে হবে।
পুরোহিত : তুমি ঠিক বলেছ মেয়ে, এবার আমাদের জাগার পালা।
[ মোহক ও মোহান্ত স্থবিরকের প্রবেশ।] 
স্থবিরক : জাগবে বৈকি পুরোহিত, অবশ্যই জাগবে। আরে তোমরা না জাগলে সভ্যতা এগোবে কিভাবে ? তাই না কবি ? অবশ্য শুধু তোমাদের জাগলেই তো হবে না, এই গরীব অসহায় খেটেখাওয়া মানুষদের কথাও তো ভাবতে হবে। ভরা পেটে যে জাগরণের গান গাও সেই গান খালিপেটে থাকা মানুষের ভালো লাগবে কি ?
মোহক : প্রভুর আমার দয়ার শরীর। কারোর দুঃখ তিনি দেখতে পারেন না।
স্থবিরক : অমন করে বলো না মোহক, ওরা আমার সন্তান, সন্তানের ভালোমন্দ পিতা ছাড়া ভালো কে বুঝবে বলো। [একটু থেমে কবির দিকে তাকিয়ে ] কি হে কবি বাকবন্ধ হয়ে গেল নাকি ?
কবি : চাবুকের ঘায়ে আওয়াজ কমে যায় না, বরং বেশি সুরে বাজে।
মোরা চঞ্চল মোরা উচ্ছ্বল মোরা বাণীর বীণার ঝঙ্কার
নাচি উদ্দাম হাসি খলখল, বাজে কালের ধনুকে টঙ্কার।
বাণী বরদা শুভ সারদা বসি জিহ্বায় তোলে লহরী
সেই সুরে সুরপুরে জাগে নিদ্রিত যত প্রহরী।
যত বাধাভয় যত সংশয় সব ঘুচিয়ে করি চিৎকার, –
মোরা চঞ্চল মোরা উচ্ছ্বল মোরা বাণীর বীণার ঝঙ্কার।
তবু নির্বাক যত ভণ্ড যত কুৎসিত ও পাষণ্ড,
বিষ রক্তে, অমানক্তে জাগে কিম্ভূত অহিতুণ্ড ।
ওহে দুর্জন হও সাবধান ! নয় সত্ত্বর হবে ছারখার;
ওহে ধৃষ্ট ওহে দুষ্ট মনে রেখো তুমি বারবার –
মোরা চঞ্চল মোরা উচ্ছ্বল মোরা বাণীর বীণার ঝঙ্কার ।
মাধবী : খুব সুন্দর গেয়েছ তো কবি, তোমার স্পর্ধা আছে বটে।
কূর্চি : হ্যাঁ কবি, তোমার গানে একটা শক্তি আছে, সে শক্তি ভয়কে জয় করার শক্তি।
স্থবিরক : চল হে মোহক, এদের ওপারের ডাক এসেছে। অযথা সময় নষ্টের প্রয়োজনই কি ! [ ধূর্ত হাসি ] 
মোহক : চলুন গুরুদেব । [উভয়ের প্রস্থান ]পুরোহিত : কি বুঝলে কবি ?
কবি : বাইরে যে ভাবই দেখাক না কেন ভেতরে ভয়ের একটা সাপ কুণ্ডলি পাকিয়ে আছে। বেশি ভয় পায় আলোকে। অন্ধকারের জীব কিনা, আলো দেখলে চোখ ঝলসে যায়।
পুরোহিত : চলো চলো, উৎসব শুরু করি। এই মেয়েরা গান ধর।
মেয়েরা : এলো শাওন বরষন মুখর বেলা,
কুঞ্জপথে সই কুঞ্জপথে, দেখ ঝরা বকুলের মেলা।
উন্মনা মন আজ পুবালি বায়ে, দিল উড়ায়ে যত গোপন ব্যাথা;
মন অকারণ আজি হল উচাটন সই হলো উচাটন, ভেবে কাহার কথা ?
চঞ্চল পবনে আনমনে মত্ত এ মন মোর করে খেলা।
এলো শাওন বরষন মুখর বেলা।
আজি শাওন উৎসবে কি হবে কাঁদি ? – চিতচোর নাহি এল হায় রে !
আমরা বসি বসি কাজরি গাহি, ঝরে ঝরঝর ওই বাইরে।
ঘনশ্যাম বুকে রাধা সৌদামিনী, করে খেলা সই করে খেলা,
এলো শাওন বরষন মুখর বেলা।
মল্লারে তোলে সুর মৃদঙ্গখানি, ঝরে সুর নির্ঝর কেন কি জানি,
কদম্ব বনে বাজে বাঁশী বাজে অবেলা।
এলো শাওন বরষন মুখর বেলা।
… চলবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *