বার্মুদা রহস্য — পর্ব – ১৯ — সিদ্ধার্থ সিংহ

sahityakaal.com

 

বার্মুদা রহস্য –  পর্ব – ১৯  —  সিদ্ধার্থ সিংহ

 

ওই বই থেকেই জানা গিয়েছিল, উনিশশো ছেচল্লিশ সালের অক্টোবর মাসে অ্যাডাম স্কি প্রথম উড়ন্ত চাকি দেখেছিলেন। ওটা তখন মাউন্ট প্যালোমারের অবজারভেটরির ওপর ঘুরছিল। সঙ্গে সঙ্গে উনি ছুটে যান দূরবীনের কাছে। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দূরবীন তখন ওখানেই বসানো ছিল। তার মাধ্যমেই তিনি প্রথম দেখেছিলেন, সেই সময় সব থেকে বেশি আলোচিত হত যেটা নিয়ে, সেই ফ্লাইং সসারকে। পরের বছর আগস্ট মাসে ওই একই জায়গায়, এ বার আর একটা নয়, একসঙ্গে এক ঝাঁক ফ্লাইং সসারকে তিনি ঘুরপাক খেতে দেখেছিলেন।
কিন্তু অতগুলো ফ্লাইং সসার ওখানে কী করছিল? তারও একটি সন্তোষজনক উত্তর তাঁর বইটিতে তিনি দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, যেহেতু মস্ত বড় দূরবীন ওখানে বসানো আছে এবং ওখান থেকেই তাদের গতিবিধি লক্ষ্য করা হচ্ছে, আর তা যদি একনাগাড়ে চলতেই থাকে, তা হলে তাদের আসল পরিচয় জানতে পৃথিবীবাসীদের আর বেশি দিন সময় লাগবে না।
তাই হয়তো একজনের ওপর ভরসা না করে, এক দল শুক্র গ্রহবাসীকে ওখানে পাঠানো হয়েছিল, যাতে একবারেই ওই দূরবীনটাকে ধ্বংস কিংবা অকেজো করে দিয়ে আসতে পারে। তার পাশাপাশি আরও একটি আশঙ্কার কথা তিনি শুনিয়েছিলেন, আর তা হল, আকাশের একটি অদৃশ্য চুম্বক রেখাকে অবলম্বন করেই ফ্লায়িং সসারগুলো চলাফেরা করে। আর যেহেতু ক্যালিফোর্নিয়ার আকাশের উপরেই ও রকম একটি অদৃশ্য চুম্বক ক্ষেত্র আছে, তাই বেশি সংখ্যাক ফ্লাইং সসার ওখানেই ঘোরাফেরা করে।
এই বইয়ের অন্য লেখক রেমন্ড লেসলি অ্যাডাম স্কি-র পক্ষ নিয়ে লিখেছিলেন, উনি বাষট্টি বছর বয়সী এক লেখক। তার চেয়েও বড় কথা তিনি একজন স্বনামধন্য দার্শনিক। ক্যালিফোর্নিয়ার প্যালোমার অঞ্চলের এই বাসিন্দা গত প্রায় কুড়ি বছর ধরে নানা প্রতিকুলতার মধ্যেই উড়ন্ত চাকি নিয়ে কাজ করছেন। শুক্র গ্রহ থেকে যে আরোহীরা পৃথিবীতে আসেন, তার প্রমাণ স্বরূপ তিনি তাদের পায়ের পাতার ছাপ প্লাস্টার অব প্যারিসে ধরে রেখেছেন। ওটা পরীক্ষা করলেই জানা যাবে, ওই পায়ের ছাপ এই পৃথিবীর কোনও প্রাণীর নয়।
 সেই বইয়ে জন অ্যাডাম স্কি দাবি করেছিলেন, ক্যালিফোর্নিয়ার মরুভূমিতে অ্যারিজোনা পার্কার নামে একটি শহর আছে। দুজন বন্ধুর সঙ্গে অ্যাডাম স্কি সেখানে বেড়াতে গিয়েছিলেন। বেড়াতে বেড়াতে বেলা তখন অনেক গড়িয়ে গেছে। বারোটা-সাড়ে বারোটা বাজে। আকাশ একেবারে পরিষ্কার। কিন্তু নীল পাহাড়ের চূড়ায় মেঘের অমন নৈসর্গিক খেলা মন ভরে দেখেও তাঁর আশ মিটছিল না। তাই বাড়ি ফেরার নামই করছিলেন না তিনি। তাঁর দুই বন্ধুও তাই।
ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ আকাশের দিকে তাকিয়েই তাঁরা একেবারে অবাক। দেখলেন, বর্মা চুরুটের আদলে একটি রুপোলি বিমান হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে। তবে এই বিমানটি আমাদের দেখা বিমানের সঙ্গে কিছুতেই মিলছে না। কারণ, এই বিমানে কোনও প্রপেলার বা ডানা নেই। দেখতেও ভারী অদ্ভুত। তাদের মনে হল, চালক বুঝি বিমানটিকে থামাবার চেষ্টা করছে। কিন্তু কোথায় নামবে ঠিক বুঝতে পারছে না।
নিজের সঙ্গে না থাকলেও বাকি দুই বন্ধুর কাছে শক্তিশালী বায়নোকুলার ছিল। সেটা দিয়ে তাঁরা স্পষ্ট দেখতে পেলেন সব কিছু। দুই বন্ধুর একজন ছিলেন দক্ষ পাইলট এবং খুব সাহসী। তিনি দীর্ঘ দিন সামরিক বাহিনীতে ছিলেন। তিনি শ্যেন দৃষ্টিতে দেখতে দেখতে ওই আকাশ-যানের গায়ে একটি কালো দাগ লক্ষ্য করলেন। এই জাতীয় দাগ পৃথিবীর কোনও বিমানে সাধারণত দেখা যায় না।
একটু পরেই আকাশের ভিতরে উজ্জ্বল আলোর ছটা ছড়িয়ে পড়ল। তার পর ওই বিমানটি অপেক্ষাকৃত নিচু দুটি পাহাড়ের মাঝখানে নেমে এল। অ্যাডাম স্কি সঙ্গে সঙ্গে দূরবীন দিয়ে ক্যামেরার সাহায্যে ঝপাঝপ সাতটি ছবি তুলে ফেললেন। হঠাৎ মনে হল, ওদের মধ্যে থেকে কেউ বুঝি তাকে ইশারা করে কাছে ডাকছেন। অ্যাডাম স্কি আর এক মুহূর্ত ভাবলেন না। তাঁর সেই বন্ধুকে বললেন, দ্রুত গাড়ি চালিয়ে আমাকে একটু ওদের কাছে নিয়ে যাবে? আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, ওরা আমাদের সঙ্গে কথা বলতে চাইছে।
বন্ধুটা ফুল স্পিডে গাড়ি চালিয়ে সেখানে পৌঁছে দিলেন তাঁকে। কাছে যেতেই দুজনে হাত মেলালেন। তবে আমাদের মতো করে নয়। অ্যাডাম স্ক-র হাতের ওপর তার হাত উপুর করে স্পর্শ করলেন সেই আরোহী। আরোহীটিকে খুব ভাল করে দেখতে লাগলেন তিনি। লম্বায় পাঁচ ফুট ছ’ইঞ্চির মতো। ওজন খুব বেশি হলে একশো পঁয়ত্রিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ পাউন্ডের মধ্যে। তিরিশের বেশি বয়স কিছুতেই নয়। গোল কপাল। চওড়া চোখ। চোখের উজ্জ্বল তারার রং ধূসর সবুজ।
গালের ভাঁজ সুস্পষ্ট। খাঁড়ার মতো নখ। গায়ের রং বাদামি। মাথার চুল বালির মতো হলদেটে। পরনে বাদামি রঙের একটুকরো কাপড়। কোথাও কোনও সেলাইয়ের বা বোতাম দিয়ে আটকানোর যায়, এ রকম কোনও চিহ্ন দেখা গেল না। জুতোর রংটা ভারী অদ্ভুত। আমাদের চেনা রঙের বাইরে। আর জুতো জোড়া যে চামড়া দিয়ে তৈরি নয়, তা স্পষ্ট বুঝতে পারা যাচ্ছিল। অ্যাডাম স্কি তার কাছে জানতে চাইলেন, ফ্রম হোয়ার ইউ আর কামিং?
আরোহীর এ দিক ও দিক তাকানো দেখেই বোঝা গেল, ও তাঁর প্রশ্ন বুঝতে পারেনি। তাই তার পর থেকে বোবাদের মতো আকার-ইঙ্গিতে সাংকেতিক ভাষায় কথার আদান-প্রদান চলতে লাগল। বালির উপরে একটি সূর্য আর তার চারিধারে সৌরমণ্ডলের ছবি এঁকে, সেই গ্রহগুলোর একটি কাল্পনিক কক্ষপথ চিহ্নিত করলেন। দু’-চার বার বোঝাতেই আরোহী সেই রেখাচিত্রে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, সে শুক্র গ্রহের অধিবাসী।
তার কাছ থেকেই জানা গেল, মহাশূন্যের অনেক গ্রহেই পৃথিবীর মতো জীবেরা বাস করে। তাদের অনেকেই পৃথিবীর লোকেদের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত। তারাও ওদের মতো মহাশূন্যের বিভিন্ন গ্রহে মাঝে মাঝেই যায়। দেখে আসে কারা কতটা উন্নতি করল। তার পর তা তাদের পরবর্তী প্রজন্মদের জন্য লিপিবদ্ধ করে রাখে। যাতে তারা মহাশূন্যের অন্যান্য গ্রহবাসীদের সম্পর্কে সচেতন থাকতে পারে। এর আগেও তারা বহু বার বিশাল আকাশযানে করে পৃথিবীর কাছাকাছি এসে, ছোট ছোট উড়ন্ত চাকির সওয়ার হয়ে পৃথিবীতে নেমেছে। ভবিষ্যতেও নামবে।
আগে নাকি তারা এই পৃথিবী সম্পর্কে কিছুই জানত না। কিন্তু প্রথম যে বার অ্যাটোম বোমা ফাটল, তারই বিকট শব্দ ইথারে ভেসে ভেসে তাদের কাছে পৌঁছতেই তারা নড়েচড়ে বসেছিল। শব্দ বিশ্লেষণ করেই তারা নাকি বুঝতে পেরেছিল, এমন ভয়ানক শব্দ যারা তৈরি করতে পারে, তারা তো অবুঝ। বোকা। তারা জানেই না, এ রকম কয়েকটা ফাটালেই তারা যে গ্রহতে বসবাস করছে, সেটাই তো দূষণে দূষণে বাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে। এমনকী, ধ্বংসও হয়ে যেতে পারে। তখন তারা থাকবে কোথায়! এ তো পুরো কালীদাস মার্কা বুদ্ধি। যে ডালে বসে আছে, সেই ডালই কাটছে। কারা ওরা? তখনই স্পেসশিপ নিয়ে বেরিয়ে খুঁজতে খুঁজতে আমরা পেয়ে যাই এই গ্রহটার সন্ধান।
তার কাছ থেকে আরও জানা গেল, তারা সাধারণত নির্জন জায়গাতে অবতরণ করতে পছন্দ করে। কোনও কোনও সময় তাদের আকাশযান বিকল হয়ে যায়। তখন তার যাত্রীরা হয় অনাহারে, আর তা না হলে তাদের পক্ষে অনুপযুক্ত এই আবহাওয়ায় বেশিক্ষণ টিকে থাকতে না পেরে মৃত্যুর কালে ঢলে পড়ে। তবে সুযোগ-সুবিধে পেলে তারা যখন যে গ্রহে যায়, সেখানকার দু’-চারটে প্রাণীকে তুলে নিয়ে যায়। পৃথিবী থেকেও বেশ কয়েক জন নারী-পুরুষকে তারা তুলে নিয়ে গেছে। তবে তারা কোথায় আছে, কেমন আছে, এটা সে জানে না। এটা নাকি তাদের শুক্র গ্রহের টপ সিক্রেট ব্যাপার।
কথা বলতে বলতে অ্যাডাম স্কি ক্যামেরা বার করে তার ছবি তুলতে যাচ্ছিলেন। সে বারণ করে দিল। অনুরোধ নয়, যেন আদেশ। উনি বললেন, ঠিক আছে ছবি তুলব না। ফ্লায়িং সসারটা একবার কাছে গিয়ে দেখে আসতে পারি? আরোহী এ বার আর কোনও আপত্তি করল না। অ্যাডাম স্কি গুটিগুটি পায়ে কাছে গিয়ে দেখলেন, সসারটি দেখতে খানিকটা চ্যাপ্টা ঘণ্টার মতো। মাথার উপরে সবুজ গম্বুজের মতো কী যেন একটা। তার চার দিকে সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম অসংখ্য তারের জাল। মাঝে মাঝেই বিদ্যুতের মতো স্পার্ক করছে।
বাইরে থেকে যা দেখার দেখলেন। ভিতরে ঢোকার জন্য পীড়াপীড়ি করলেও তার অনুমতি পেলেন না তিনি। কথা শেষ করে আরোহীটি সসারের পেছন দিকে চলে যাবার আগে অ্যাডাম স্কি-র কাছ থেকে ফোটো তোলার ফিল্মের একটা রিল চেয়ে নিল। তার পর মাত্র কয়েক মুহূর্ত। সসারে উঠতে না-উঠতেই মাথার উপরের গম্বুজ থেকে তিনটি অ্যান্টেনা বেরিয়ে এল। প্রথম দুটি যে দিকে ঘুরতে লাগল, তৃতীয়টি তার উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করল। তার পর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই হুস করে আকাশে মিলিয়ে গেল সসারটি। এত স্প্রিড পৃথিবীতে ভাবাই যায় না!
তার কিছু দিন পর উনিশশো বাহান্ন সালের তেরো ডিসেম্বর দূরবীন দিয়ে আকাশ দেখছিলেন অ্যাডাম স্কি। আচমকা তাঁর সামনে ভেসে উঠল একটা স্বচ্ছ ফ্লাইং সসার। মনে হল, মাত্র কয়েক শো ফুট দূরে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওই সসার থেকে একটি হাত বেরিয়ে এসে কী যেন তাঁর বাড়ির ছাদের ওপরে ফেলে দিয়েই ফের উড়ে গেল আকাশে। কী ওটা!
হাতে তুলে দেখেন ফিল্মের একটা রোল। সেটা ডার্করুমে ডেভলপ করে দেখা গেল, তাতে কোনও ছবি-টবি নেই। শুধু কয়েকটি আঁকিবুকি।  উনি বুঝতে পারলেন, ওদের ভাষায় ও কিছু লিখে পাঠিয়েছে। কিন্তু সেটা তাঁর কাছে এতই দুর্বোধ্য যে, হাজার চেষ্টা করেও তিনি কিছুতেই সেই লেখার পাঠোদ্ধার করতে পারলেন না।
অ্যাডাম স্কি তাঁর বইটির শেষে লিখেছেন, এখানে যা লিখেছি, সবই আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা। আমার কাছে আরও অনেক কিছু আছে, যা যে কোনও মানুষকে চমকে দেওয়া পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু নিরাপত্তার কারণে আমি সেগুলে মন খুলে লিখতে পারলাম না। বলতে পারেন, প্রাণ সংশয়ের ভয়েই আমি এড়িয়ে গেলাম। তবে একটা কথা বলি, ফ্লাইং সসার দেখে একদম ভয় পাবেন না। ওরা আমাদের শত্রু নয়। আমার বারবার মনে হয়েছে, গ্রহান্তরের উন্নত বাসিন্দারা আমাদের সঙ্গে ভাব জমাতে চায়। আসুন, পুরনো ধ্যান-ধারণাকে ঝেড়ে ফেলে, কুসংস্কারকে তুড়ি মরে উড়িয়ে, সমস্ত ভয়কে দু’হাতে ঠেলে সরিয়ে আমরা মহাবিশ্বের অন্যান্য গ্রহের বাসিন্দাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাই।
অ্যাডাম স্কি-র এই বার্তা তারা জানতে পেরেছিল কি না জানি না। তবে তার পর থেকেই কিন্তু তাদের আনাগোনা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। উনিশশো চুয়ান্ন সালের বারো অক্টোবর প্যারিসের আকাশে উড়ন্ত চাকির ঘোরাফেরা লক্ষ্য করা গেল। এর ঠিক দু’দিন পরে চোদ্দো অক্টোবর বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ফলাও করে ছাপা হল ফ্লাইং সসারের কথা।
তাতে বলা হল, দুই অপরূপ সুন্দরী মঙ্গল গ্রহ থেকে পৃথিবীতে এসেছে। এক স্কুল শিক্ষক দাবি করলেন, অতলান্তিক উপকূলের কাছে লেরন দ্বীপে মঙ্গল গ্রহের ওই দুই মহিলার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছে। তাদের দুজনের উচ্চতা মোটামুটি একই। ফিতে দিয়ে তো মাপিনি। তবু মনে হয়, পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চির মতো হবে। সামান্য কম বেশিও হতে পারে। তবে একবার তাকালে চোখ ফেরানো যায় না এমন রূপসী। তাদের হাতে ছিল দস্তানা। পায়ে প্রায় হাঁটু অবধি নকশা করা বুট জুতো। মাথায় শিরস্ত্রাণ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *