পুরানো সাথী —- শর্মিষ্ঠা গুহ রায় (মজুমদার)

sahityakaal.com
উফ্,কী জোরে জোরে হাঁটা দেখ!আমার কথা কেউ চিন্তাই করেনা।যত পেরেছেন সবজি কিনছেন আর ভরছেন।এক দোকান থেকে এক দোকান ঘুরছেন,দরদাম করছেন,মাঝে চেনাজানা কারোর সাথে দেখা হলে বকরবকর শুরু করছেন।আর আমাকে দোলাতে দোলাতে নিয়ে যাচ্ছেন।একটুও দয়ামায়া নেই এই মানুষ টার মনে।

    আমি আগে ঐ ভদ্রলোকটির পরিচয় দিই,উনি হলেন পটলার বাবা।যেমন নাম ছেলের দিয়েছেন তাতেই বুঝতে পারছেন কী ধরনের সবজিরসিক ব্যক্তি উনি! আর আমার সাথে তাই ওনার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়।

এবার আমার পরিচয় টা দিই।আমি হলাম ওনার সাধের বাজারের থলে,বলতে পারেন অত্যাচারে অতিষ্ঠ থলে।ছেঁড়াফাটা রংচটা দশ বছরের পুরানো থলে।রোজ সকালে চা টা খেয়ে বেশ ফ্রেস ফ্রেস মন নিয়ে পুরানো জুতোয় পা গলিয়ে যেই পটলার মাকে হাঁকেন-‘কইগো,কোথায় গেলে গো,আমার বাজারের থলে টা কোথায়?’ ব্যা—-স,আমার হয়ে গেল,আর কী!একটা দিন শান্তিতে থাকতে দিলেন নাগো!

  আজ আমি প্রতিজ্ঞা করেছি,কিছুতেই যাবনা!যাবনা!আরতো কত থলে আছে,নাও না তাদের!রোজ আর ভারী বোঝা টানতে পারিনা।কিন্তু কপাল আমার বড়ই খারাপ।আবার আমিই সিলেক্ট হলাম।রাগে গজ্ গজ্ করে পটলার বাবার হাত ধরে চললাম বাজারে।

  বাজারে গিয়েই চেনা দোকানে গিয়ে কিনলেন একটা এইয়া বড় লাউ।যাঃ—-এর ভারে তো এবার মরেই যাব!আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে…পট্ পট্ পট্ ফটাস্…..আমার শরীর গেল ছিঁড়ে।সাধের লাউ  রাস্তায় পড়ল ধপাস্ করে।

   পটলার বাবা প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন।বুঝলাম কী দুঃখুই না পেয়ে তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন।লাউটাকে বগলদাবা করে তিনি আমাকে ভাল করে দেখতে লাগলেন।তাঁর দীর্ঘনিশ্বাস পড়ল।আমিও ভাল করে দেখলাম তাঁর মোচযুগল যেন আরও ঝুলে পড়েছে।কান লাল হয়ে উঠছে।

    তিনি আর কিছু কিনলেন না।আমায় আর লাউকে নিয়ে সো—জা বাড়ি ফিরে এলেন।এসেই লাউকে গিন্নি র হাতে ধরিয়ে সূচসূতোর বাক্সো নিয়ে বসে আমার ছেঁড়াফাটা অংশগুলোকে ভাল করে সেলাই করতে লাগলেন।সেলাইয়ের পরে নিজেকে বেশ শক্তসমর্থ ও সুস্থবোধ করতে লাগলাম।

   এরপর বেশ কয়েকদিন আমি বাড়িতে বলতে পারো বেডরেস্টে আছি।অন্য নতুন থলে রোজ বাজারে যাচ্ছে।দশ দিন হয়ে গেল পটলার বাবা আমায় আর নেন না।মনে হচ্ছে আমি আজ বাতিলের দলে!বড্ড  একা একা লাগে জানেন! চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে—-‘আমি আবার কাজে নিযুক্ত হতে চা——ই।’ কিন্তু,হায়,আমার কথা কী তাঁর কানে যাবে?

    তো এইভাবেই আমার দিন কাটছিল।একদিন সকালে গুটিগুটি পায়ে পটলার বাবা আমার দিকে এলেন।আমাকে সযত্নে ধরে হাঁটা শুরু করলেন।আমি তো বেজায় খুশী।আজ আবার কাজে জয়েন করব।ওমা একি!উনি নতুন থলেকেও সঙ্গে নিলেন।আমি প্রায় কেঁদেই ফেলছিলাম আর কী!ওর কী যাওয়ার দরকার?আমি কী ফেলনা?

   যথারীতি বাজারে এলাম।উনি অনেক সবজি কিনলেন।অর্ধেক আমাকে দিলেন আর বাকি সবজি ভরলেন নতুন থলেতে।আমার আর অসুবিধা হচ্ছিল না।সবজিওয়ালা দাদা হেসে বললেন –‘কী ব্যাপার?আজ আবার পুরানো থলে কেন?’পটলার বাবা হেসে বললেন-‘দশ বছরের পুরানো সাথী,সহজে কী ফেলতে পারি?’ জানেন,শুধু ঐ একটি কথা,তাতেই আমি বুঝতে পারলাম আমার স্থান টা কোথায়।কেনই বা তিনি আর একটি থলে সঙ্গে এনেছেন।শুধুমাত্র আমার ভার কমানোর উদ্দেশ্যেই তো এই কাজ করেছেন।আমার চোখ নেই,নইলে সবাই দেখতে পেত থলেরও চোখ দিয়ে জল পড়ছে,তবে সে দুঃখের নয়,আনন্দের—ভালবাসার।

 
 
 
 
 
 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *