নতুন রহস্য ধারাবাহিক— শেষ নেই যার // সুব্রত মজুমদার // প্রথম পর্ব

 Subrata Majumdar
জুনের শেষ হতে চলল বর্ষার দেখা নেই। দক্ষিণবঙ্গের বিয়াল্লিশ ডিগ্রী গরমে নাজেহাল হয়ে উঠেছে বিক্রম। দিন দু’য়েক হলো সিকিম হতে ফিরেছে সে। সিকিমের শীতল মনোরম আবহাওয়ায় কিছুদিন কাটানোর পর বিয়াল্লিশ ডিগ্রীর ধকল সামলানো সত্যিই খুব কষ্টকর। এরসঙ্গে যোগ হয়েছে অঘোরবাবুর অভিমান পর্ব। সবেমিলে দিন ভালো যাচ্ছে না।
অঘোরবাবু সকাল হতেই এসে বসে আছেন। বিক্রমের সঙ্গে একটাও কথা বলেননি। শুধু মাঝে মাঝে কটমট করে বিক্রমের দিকে তাকাচ্ছেন আর চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন। তিন তিনকাপ চা পান করেও যখন অঘোরবাবুর রাগ একটুও কমল না তখন বিক্রম কান ধরে মুরগি হয়ে বসলো। এতে কিছুটা কাজ হলো। অঘোরবাবু চায়ের কাপটা টেবিলে নামিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।
“না মশাই, আমি এবার আসি। কখন আবার বলে বসবেন যে পাগল বুড়োটার জন্যেই আপনাকে মুরগি হতে হল। আসলে ভুলে যাই মশাই যে আমার বয়েস হয়েছে। বুড়ো হয়েছি আমি। আর বুড়ো হলে তো মানুষ পাগল হয়ে যায় । আপনি সুস্থ্য থাকুন, ভালো থাকুন।” অঘোরবাবু যাবার জন্য উদ্যত হলেন।
বিক্রম বলল,” এবারকার মতো ক্ষমা ঘেন্না করে দেন। হাজার হলেও আমি আপনার প্রতিবেশী। নাহয় ভুলকরে মিডিয়ার সামনে ওইসব বলেই ফেলেছি, তাবলে কি ক্ষমা হয়না ? পুরী বেড়ানোর খরচ যে আপনি দিয়েছেন সেটাও তো আমি বলেছি। এজন্য তো একবারও ধন্যবাদ দিলেন না ! না, যুগটাই খারাপ। ঘোর কলিকাল।”
অঘোরবাবু বাইরের দরজা পর্যন্ত গিয়ে আবার ফিরে এলেন। তারপর চেয়ারে জমিয়ে বসে বললেন,” আরেক কাপ চা বলুন। ” মাধবদা অঘোরবাবুর স্বভাব সন্মন্ধে অবগত। তাই সে চা নিয়ে তৈরীই ছিল। বিক্রমের বলার আগেই চায়ের কাপটা এনে অঘোরবাবুর সামনে ধরল। সাথে আবার হাতে গরম কুমড়োর বেগুনি। অঘোরবাবু কুমড়োর বেগুনিতে কামড় দিতে দিতে বললেন, “এটাই কিন্তু শেষবার। ক্ষমা করে দিলাম। আর ওই যে ট্রাভেলের ছোকর, কি নাম যেন.. “
“সায়ক।” 
“হ্যাঁ, সায়ক। ছেলেটা খুবই বুদ্ধিমান। ওকে যেন আবার কোন বিপদ আপদের মধ্যে টানবেন না।” অঘোরবাবু কুমড়োর বেগুনি শেষ করে আবার উঠে দাঁড়ান।
বিক্রম কিছু বলতেই যাচ্ছিল কিন্তু তখনই কলিংবেল বেজে উঠল। মাধবদা গিয়ে দরজাটা খুলতেই একজন বছর চল্লিশের লোক হনহন করে ভেতরে ঢুকে এল। বিক্রমের মুখোমুখি হতেই বিক্রম একগাল হেসে বলল, “বসুন মিঃ নেহান রায়চৌধুরী।” 
বিস্ময়ে লোকটার চোয়াল ঝুলে পড়ল। তিনি অঘোরবাবুর সামনের চেয়ারটায় বসে পড়লেন। তারপর হাতের ব্যাগটা টেবিলে রেখে বললেন, “হ্যাঁ, আমি নেহান রায়চৌধুরী। কিন্তু তা তো আপনার জানার কথা নয়।।” 
“তা ঠিক। যিনি দীর্ঘ প্রবাসের পর এইমাত্র দেশে ফিরলেন তার সন্মন্ধে আমার খুব বেশি কিছু জানা অসম্ভব। এই যেমন ধরুন আপনি অধ্যাপক মানুষ, একসময় ড্রাগের নেশায় জীবন শেষ হতে বসেছিল ইত্যাদি ইত্যাদি। ” বিক্রমের হাসি আরো চওড়া হল।
নেহানবাবু এবার বুকের বাঁ দিকটায় হাত রাখলেন, বেশি উত্তেজনা তার সহ্য হয় না। ব্যাপার দেখে অঘোরবাবু মুখর হলেন,” এখানে টেঁশে যাবেন না যেন মশাই, বিক্রমবাবুর সাথে যারা প্রথম দেখা করতে আসে তাদের ওরকম একটু আধটু সমস্যা হয়। এই দেখুন না, সঙ্গগুনে আজকাল আমার প্রেডিকশানও ঠিকঠাক মিলে যাচ্ছে।….” অঘোরবাবু আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু নেহিন রায়চৌধুরী তাকে হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে থামিয়ে দিলেন।
রায়চৌধুরী বললেন,” আপনি একটু চুপ করবেন ! আচ্ছা বিক্রমবাবু, আপনি এইসব এলিমেন্টদের সহ্য করেন কিভাবে ? “
বিক্রমের মুখখানা হলো দেখার মতো। এত সাধ্যসাধনা করে তিনি অঘোরবাবুকে শান্ত করেছেন,…. এবার নিঘঘাৎ অঘোরবাবু বিক্রমের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করবেন। কিন্তু তা হল না। অঘোরবাবু চোখ পাকিয়ে বললেন,” এলিমেন্টের কি বোঝেন মশাই ! আমি আছি বলেই বিক্রম মুখুজ্জে আছে। টেকনিক্যাল সাপোর্ট দি’ টেকনিক্যাল !”
নেহান রায়চৌধুরী কিছুটা থতমত খেয়ে গেলেন। তারপর টেবিলের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলেন, “আমার পৈতৃক বাড়ি বাঁকুড়ার একটা গ্রামে। মোহনপুর। পড়াশোনা শেষ করে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে মহাকাশবিদ্যার অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করি। বাবার ইচ্ছা ছিল আমি নাসাতে রিসার্চ করি, ভাগ্য আমাকে সে সূযোগও দিল। সেখানে কাজ করার সময় আমার পরিচয় হয় ডাঃ রবার্টসনের সঙ্গে। ডাঃ রবার্টসন ছিলেন একাধারে চিকিৎসক ও কেমিস্ট। তার প্রভাবেই আমি Extraterrestrial Intelligence বা ইটির (ETI) ব্যাপারে উৎসাহী হয়ে পড়ি। “
” তার মানে কেসটায় এলিয়ানও আছে। ইন্টারেস্টিং ! ” বিক্রম পেছন দিকে মাথাটা হেলিয়ে দেন, চেয়ারটাও পেছন দিকে ঝুঁকে যায়। চোখ বন্ধ করেই বিক্রম বলল,” প্রসিড। “
নেহানবাবু শুরু করেন,” সমস্যা তার কয়েক মাস পর হতেই। আমার খাবারের সাথে ড্রাগ মেশানো হতে থাকে। মুড সুইং, হ্যালুসিনেশন, ডিপ্রেসন….. সত্যিকথা বলতে কি একরকম বিপর্যয় নেমে আসে আমার জীবনে। এইরকম যখন চলছিল তখন একদিন হাতেনাতে ধরে ফেলি আমার কাজের মেয়ে মিণ্ডাকে। কিন্তু পুলিশ কাস্টিডিতেই মৃত্যু হয় মিণ্ডার। কেন, ঠিক কি কারনে সে ওরকম করছিল সেটা রহস্যই থেকে যায়। আমিও ধীরে ধীরে সুস্থ্য হয়ে উঠতে থাকি। একসময় প্রায় ভুলেই যাই এই বিপর্যয়ের দিনগুলোকে। “
” তাহলে সমস্যাটা কি আপনার ? ” বিক্রম নেহানবাবুর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল। ঠিক এসময় আমি দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম। আমার দিকে তাকিয়েই একগাল হেসে বিক্রম বলল,”এই যে সায়কবাবু, তোমার ইচ্ছাপূরণ হতে চলেছে অবশেষে। “
বিক্রমের কথার তাৎপর্য বুঝতে পারলাম। নির্ঘাত কোন কেস এসেছে। সিকিম হতে আসার পর হতেই বিক্রমের সঙ্গে একটা গাঢ় বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এ হিসাবে আমারও ইচ্ছা ছিল বিক্রমের সাথে কোন কেস সলভ করার। মনে হচ্ছে সে ইচ্ছা পূর্ণ হতে চলেছে। একটা চেয়ার টেনে বসলাম।
নেহান বাবু তার ব্যাগ হতে একটা লাল রঙের স্ফটিকের তৈরি আর্টিফ্যাক্ট বের করল। আর্টিফ্যাক্টটা বিক্রমের হাতে দিতেই বিক্রম নেড়েচেড়ে দেখে বলল, “ক্রিস্টাল ড্রাগন।” 
বিক্রমের মুখে ক্রিস্টাল ড্রাগনের কথা শোনামাত্র অঘোরবাবুর মুখ হতে বেরিয়ে এল -“মোহাবেশ !”
বিক্রম বলল, “এখনই উত্তেজিত হবেন না অঘোরবাবু, গোটা দুনিয়ায় ক্রিস্টাল ড্রাগনের কমতি নেই।” এরপর নেহানবাবুকে উদ্দেশ্য করে বলল, “হ্যাঁ, আপনি কনটিনিউ করুন। “
নেহানবাবু ব্যাগের চেইন লাগাতে লাগাতে বললেন, “এই ক্রিস্টাল ড্রাগনটা আমার কাছে আসে বছর খানেক আগে। সেদিন সকালে ক্যালিফোর্নিয়ার একটা অ্যান্টিকের দোকানে ঢুকেছিলাম। দোকানের মালকিন একজন চিনা বৃদ্ধা । বয়স প্রায় আশির উপর হবে। বলিরেখাপূর্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে একটা মমতায় ভরে গেল মনটা। মায়ের কথা মনে পড়ে গেল। বৃদ্ধও আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আসুন আসুন। খুব সস্তা দামে পাবেন। যা পছন্দ করবেন তার উপর স্পেশাল ডিসকাউন্ট দেব।”
…. চলবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *