চড়াই ও চড়াই প্রেমী মহম্মদ দিলওয়ার – সিদ্ধার্থ সিংহ

প্রতি বছর ২০ই মার্চ পালিত হচ্ছে বিশ্ব চড়াই দিবস। ২০০৯ সাল থেকে। ভারতীয় ডাকঘর প্রকাশ করেছে ৫ টাকার একটি স্ট্যাম্পও। কিন্তু কয়েক বছর আগেও চড়াই পাখি নিয়ে কেউ কোনও মাথা ঘামাতেন না। এমনকী তাদের সংখ্যা গত ১০ বছরে যে ৬০ শতাংশ কমে গেছে, সেটাও জানতেন না কেউ। সেটা জানতে হয়েছিল আমেরিকার এক গবেষণাপত্র থেকে।

বেঙ্গালুরুর মহম্মদ দিলওয়ার একদিন একটা পত্রিকায় পড়েছিলেন শকুনের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। শকুনের সংখ্যা কতটা কমেছে দেখার জন্য, ছোটবেলায় যেখানে তিনি প্রচুর শকুন দেখতে পেতেন, নাসিকের সেই মিউনিসিপ্যাল ক্লক টাওয়ার সিটি সেন্টারের কাছে গিয়ে দেখলেন, সেখানে একটাও শকুন নেই।

শুধু শকুন নয়, শকুনের পাশাপাশি যেন চড়াই পাখিও উধাও। যে ছোট্ট পাখিটি ঘরে ঢুকলে তাঁর ঠাকুমা বলতেন, পাখা বন্ধ কর। ওদের লাগবে।

অথচ কয়েক দশক আগেও প্রচুর চড়াই পাখি দেখা যেত। ওরা বাড়ির উঠোনে ঘুরে বেড়াত। খুঁটে খুঁটে খাবার খেত। আর সারাক্ষণই কিচিরমিচির করত।

এখন আর ওদের সে ভাবে দেখা যায় না। বিশেষ করে শহরের দিকে। তাই পক্ষীবিশেষজ্ঞেরা সন্দেহ করছেন, এদের অবস্থাও হয়তো হাড়গিলেদের মতো হবে।

এক সময় এই কলকাতাতেও প্রচুর হাড়গিলেদের দেখা যেত। এখন আর তারা নেই। পাখি প্রেমীদের ধারণা, এই ভাবে চলতে থাকলে আর ক’দিন পরে চড়াই পাখিরাও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তখন শুধু বইয়ের পাতাতেই তাদের দেখা যাবে।

সারা পৃথিবী থেকেই বিভিন্ন জাতের পাখিদের সংখ্যা এখন খুব দ্রুত হারে কমছে। বিভিন্ন দেশের গণনা থেকে জানা গেছে, গত ১২ বছরে চড়াইয়ের সংখ্যা প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। এ নিয়ে গোটা পৃথিবী জুড়েই তোলপাড় হচ্ছে। আলোচনা হচ্ছে। উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। কিন্তু তাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য সে রকম জোরদার কোনও উদ্যোগ এখনও পর্যন্ত চোখে পড়ছে না।

ওদের এই বিলুপ্ত হওয়ার পিছনে রয়েছে অনেকগুলো কারণ। তবে মূল কারণ হল, আমাদের প্রতিনিয়ত বদলে যাওয়া এই আধুনিক জীবনযাত্রা।

গত ষাট-সত্তর বছর আগেও শহর বা শহরতলিতে এ রকম ফ্ল্যাট-কালচার ছিল না। আগেকার বাড়িগুলোতে থাকত নানা ধরনের ফাঁক-ফোকর, ঘুলঘুলি, কড়িবরগা, চিলেকোঠা, এমনকী জিনিস রাখার জন্য ঘরের মধ্যে দেওয়ালের গায়ে লাগানো হত ছোট বড় নানান মাপের কাঠের তাক। সেই জায়গাগুলিই চড়াই পাখিরা বেছে নিত বাসা করার জন্য। সেখানে ডিম পাড়ত। ছানারা বড় হত। এবং উড়তে পারলেই তারা ছড়িয়ে পড়ত চারিদিকে। এই দৃশ্য বছরভর দেখা যেত।

শুধু বাসা বানানোর জায়গার অভাবই নয়, এখন খাবারেও টান পড়ছে প্রতিনিয়ত। মানুষের যেখানে প্রতি মিনিটে হার্ট ধুকপুক করে ৬০ থেকে ১০০ বার, সেখানে চড়াই ছানাদের হার্ট ধুকপুক করে ৪০০ থেকে ৬০০ বার। ফলে চড়াই ছানাদের বেড়ে ওঠার সময় প্রচুর প্রোটিনের দরকার হয়। আর তা আসে নানা পোকামাকড় থেকে। যে পোকাগুলো মূলত গাছেই জন্মায়। কিন্তু গাছই যেখানে নেই, সেখানে পোকা আসবে কোত্থেকে! ফলে চারটে বাচ্চা জন্মালেও প্রোটিনের অভাবে খুব বেশি হলে আলোর মুখ দেখে একটি কি দু’টি।

এ ছাড়াও, মোবাইল ফোনের সূক্ষ্ণ তরঙ্গও চড়াই পাখিদের বিলুপ্ত হওয়ার আর একটি অন্যতম কারণ। এই তরঙ্গ প্রতি মুহূর্তে হাজার হাজার চড়াইকে নিঃশব্দে হত্যা করে চলেছে। বিশেষজ্ঞেরা দাবি করেছেন, যে হারে মোবাইলের ব্যবহার প্রতিদিন বাড়ছে, তাতে এই ছোট্ট নিরীহ পাখিটি অচিরেই পৃথিবী থেকে  নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

তাই মহম্মদ দিলওয়ার ঠিক করলেন, যে ভাবেই হোক তিনি চড়াই পাখিদের টিকিয়ে রাখার জন্য লড়াই চালিয়ে যাবেন। কিন্তু চড়াই সংরক্ষণ করার জন্য বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করতে গিয়ে দেখলেন তাবড় তাবড় সংগঠনগুলো শুধু বাঘ, হাতি, গন্ডারের মতো বড় বড় রাজসিক প্রাণীদের নিয়েই ব্যস্ত। চড়াই, শালিক, ফিঙের মতো ছোটখাটো প্রাণীদের নিয়ে তাঁরা সামান্যতম কথা বলতে রাজি নন। তাই তিনি একাই গড়ে তুললেন— নেচার ফরএভার সোসাইটি। স্লোগান তুললেন, আই লাভ প্যারো, সেভ অ্যাজ প্যারো।

দেখতে দেখতে দশ লক্ষ লোকের কাছে পৌঁছে গেল এই আবেদন। তাতে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে সাড়া দিয়ে নেচার ফরএভার সোসাইটির সক্রিয় সদস্য হয়ে গেলেন গোটা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। তাঁর কর্মযজ্ঞে শামিল হল ৫০টি দেশও।

এই কাজের জন্যই ১৯৮০ সালের ২৩শে মার্চ জন্ম গ্রহণ করা মহম্মদ দিলওয়ারকে টাইম ম্যাগাজিনের তরফ থেকে ২০০৮ সালে দেওয়া হয় হিরো’স অফ দ্য এনভায়রনমেন্ট অ্যাওয়ার্ড। নাম উঠে যায় লিমকা বুক অব রেকর্ডে। এমনকী, গিনেস বুক অব রেকর্ডেও।

কারণ, তাঁরই একক প্রচেষ্টায় সবাই নড়েচড়ে বসেছেন। ২০০৯ সালে ঘোষিত হয়েছে বিশ্ব চড়াই দিবস। যেটা এখন পৃথিবীর প্রায় ৩০টি দেশে মহাসমারোহে পালন করা হচ্ছে। তাঁরই উদ্যোগে চড়াই পাখিকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ভারত সরকারের ডাক ও তার বিভাগ প্রকাশ করেছে একটি স্ট্যাম্প। তাঁরই ডাকে সাড়া দিয়ে এক জায়গায় জড়ো হয়েছেন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের লক্ষ লক্ষ মানুষ। শুধুমাত্র চড়াই পাখিকে ভালবেসে।

চড়াই পাখিকে এতটাই ভালবেসে ফেলেছেন গাড়োয়াল হিমালয়ের উখিমঠের যশপাল সিং নেগি যে, তিনি ঠিকই  করে ফেলেছেন, তাঁর সঞ্চিত সমস্ত টাকা দিয়ে শুধুমাত্র চড়াই পাখিদের জন্যই একটা বিশাল বাড়ি বানাবেন। পাথরের তৈরি সেই বাড়িতে থাকবে চড়াই পাখিদের বাসা বানানোর উপযোগী অসংখ্য ফাঁক-ফোকর এবং ঘুলঘুলি। সেই বাড়িটির নামও তিনি ঠিক করে ফেলেছেন— চড়াই ভবন।

শুধু চড়াই প্রেমীরাই নন, তাঁদের দেখাদেখি এখন অনেকে সাধারণ মানুষও নিজেদের বাড়ির কার্নিশের এখানে সেখানে ছোট ছোট হাড়ি লাগাচ্ছেন। তাতে খড়কুটো ভরে দিচ্ছেন। যাতে চড়াই পাখিরা সেখানে বাসা বাঁধতে পারে। আর ছাদের টবে লাগাচ্ছেন ফুলগাছের চারা। যাতে সেখানে পোকামাকড় জন্মাতে পারে। চড়াই ছানাদের খাবার জন্য। যত্রতত্র রাখছেন বাটিতে করে জল। যাতে চড়াই ছাড়াও অন্যান্য পাখিরাও সেখান থেকে জল খেতে পারে।

পক্ষীবিশেষজ্ঞদের ধারণা, সত্যিই যদি সবাই এই ভাবে এগিয়ে আসেন, তা হলে আর পিছন ফিরে দেখতে হবে না। ২০ই মার্চের বিশ্ব চড়াই দিবস সত্যি সত্যিই সার্থক হয়ে উঠবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *